৩২৬ ছোট্ট মিতুনের প্রার্থনা - ৪ঠা পর্ব

 ৩২৬  ছোট্ট মিতুনের প্রার্থনা - ৪র্থ    পর্ব  এবং শেষ পর্ব 

  

এখানে শেষ হলেও এই শিক্ষার অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে আসার সংগ্রাম অন্তরে ও বাইরে চলতেই থাকবে ঠিক ততদিন, যতদিন চালকদের মনোজগতের পরিবর্তন না হবে। 

 তৃতীয়  পর্বের পর .........................

পারিবারিক শোষণের প্রথম পদক্ষেপ -

কিছুই আর গোপন থাকলো না।  শিক্ষার স্ফুলিঙ্গ বাতাসে ভাসতে ভাসতে পাপিয়ার বাবার কানের দরজায় এসে কড়া নাড়লো। মেয়ে যে অক্ষর চিনতে শিখে গেছে, এটা তাকে ভীষণ আঘাত দিল। আঘাত প্রত্যুত্তরে আক্রোশ হয়ে মেয়ের উপুড় বর্ষাতে লাগলো। তিনি গর্জে উঠলেন -

- "কে শেখাচ্ছে এসব? মেয়েদের শুধু একমাত্র ঘরের যাবতীয় কাজ জানাই তাদের  দরকার। বইয়ে মন দিলে ঘরের কাজ তো আর করতে চাইবেনা। "
বাবার তীক্ষ্ণ আক্রমণে পাপিয়া কেঁপে উঠলো। 
মিতুনের কানে পাপিয়ার প্রতি তার বাবার অবিচারের সংবাদ পৌঁছালে তারও অন্তরাত্মা   কেঁদে উঠল।  
যখনই তার মানবাত্মা কেঁদে ওঠে, তখনিই ঠিক সেখান থেকে একটা স্বর উঠে-
" মিতুন , জীবনের লড়াইটা কখন একতরফা হয় না , কখন জিৎ হয় কখনো হারও হতে পারে আর যাঁরা অন্তরের শক্তিশালী, ভয় না পেয়ে এগিয়ে যায় আর তারাই কিন্তু ইতিহাসে গড়ে। "
অন্তরের  সঞ্চিত বিশ্বাসকে সঙ্গে নিয়ে সে সযত্নে  সাহসকে সবার মধ্যে ভাগ করে নিলো।  
মিতুন বলল - " দেখো ভাই, ভয় যেমন একটা ছোয়াচে রোগ, ঠিক তেমনি সাহসও  একটা ভীষণ সাহসী রোগ। পথ যদি ঠিক থাকে তবে এই দ্বিতীয় রোগটিতে আমরা  বার বার অসুস্থ হতে চাই। "

সবাই সমস্বরে বলে উঠলো - " আমাদের 'জ্ঞানের আলো' স্কুল গড়ার  জন্য আমরা সর্বস্য পণ  করতে প্রস্তুত।"

গোপন কথাটি রবে না গোপনে -

শিশুদের গোপন মন মন্দিরে যে বটবৃক্ষের চারাটি রোপন করা হয়েছিল, সে কলেবরে না বাড়লেও তার সম্ভাব্য বিরাটত্ব নিয়ে কিছু পরিবারের মধ্যে আত্মতৃপ্তির গুঞ্জনটা একটু একটু করে ঝড়ের আকার ধারণ করলো। 

যে গ্রামে কুসংস্কারকে যত্ন করে লালিত হতো , পুস্তক প্রবেশের দ্বার যেখানে রুদ্ধ  ছিল সেখানে গুটিগুটি পায়ে অক্ষরের প্রবেশ তো গ্রামের জনমানসে এক অস্বস্তির  কারণ হবে, সেটা তো বলা বাহুল্য।  

ঘটনার সূত্রপাত, রতনের বাবার মুখ থেকেই  তার সূচনাটা হয়েছিল। আড্ডা বড় পরম  বস্তু, সে কোন নিয়ম রীতির ধার ধারেনা। গ্রামের হাটে চায়ের দোকানের জটলায় সেই যে বলল - "আমার ছেলে তো অক্ষর শিখে ফেলেছে, শুধু কি তাই, সে তো এখন নিজের নাম ফটাফট লিখে ফেলতে পারে। "

ব্যাস, আর যায় কোথায়, পাশের লোকেরা বোধহয় ভূত দেখলে এতো চমকাতো না, যতনা এই কথাটি শুনে চমকে গেলো। 

- " কি বলছো ভায়া! যেখানে এখন ছেলে-মেয়েদের কাজে লাগানোর বয়স আর  সেখানে কিনা এই বয়সে বই হাতে তুলে দিয়েছো ? আরে, একটি বার কি ভেবেছো , বলি, তোমার বয়স তো হচ্ছে, সংসারের হাল তো তোমার ছেলেকেই ধরতে হবে, পরে খাবে কি ?"

গ্রামে খবর ছড়াতে বেশি সময় লাগেনা, বিশেষ করে এ যে ভূতের আবির্ভাব থেকেও কঠিন  খবর। 

পাপিয়ার বাবা তো বাড়ি গিয়ে পাপিয়াকে এমন ধমকানি দিলো যে, পরের দিন পাপিয়া  এসে মিতুনকে বলল - " আমি আর আসতে পারবো নারে  মিতুন।"

মিতুন কথাটি শুনে খানিকক্ষণ চুপ করে রইলো। কিন্তু তার ভিতরে তখন জ্বলছে প্রতিবাদের আগুন। 

পরের দিন সকালে উঠেই মিতুন পায়ে পায়ে হাজির হলো পাপিয়াদের বাড়িতে। কি অদ্ভুত তার সাহস, পরিষ্কার ভাবে পাপিয়ার বাবার কাছে জানতে চাইলো -

- " কাকাবাবু, আপনি যদি পাপিয়াকে পড়তে দেন, একদিন সে আপনার দোকান সামলাতে  পারবে।  হিসাব রাখতে পারবে। কাজের গতিও বাড়বে।  আপনি কি  চান না যে আপনার মেয়ে আপনাকে সাহায্য করুক ?"
 আশেপাশের লোকজন একটু হেসে উঠলো -
- আরে ! একটা ছোট্ট ছেলে জ্ঞান দিতে শিখে গেছে। "

এসব কথা কি মিতুনকে দমাতে পারে, তার চোখ মুখে কোনো বিরক্তির চিহ্ন নেই, ঈশ্বর যেন তার ভিতর থেকে কথাগুলি বলছে। 

ঠিক তার পরের দিন, 'জ্ঞানের আলো'তে এসে মিতুন বেশ বক্তার মতো সবার সামনে  দাঁড়িয়ে বলল -

-" আজ আমরা সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করবো, সাহসী হতে শিখবো, যদি কেউ আমাদের  খাতা কেড়ে নেয়, তবে এই বিরাট মাঠের মাটি আমাদের খাতার জায়গা নেবে , সেখানেই আমরা লিখবো। মনে রাখতে হবে, এসবই কিন্তু শিক্ষার  একটা দিক। "

রতন তার হাতের মুষ্টি উঁচু করে বলে -
-" আমরা শিখবোই। "
পাপিয়ার সাথে অন্যান্য সবাই একই সাথে বলে উঠে -
- " আমরা সব বাধাকে টপকে গিয়ে শিখবো। "

গ্রামে কিছু হলেই পঞ্চায়েত ডাকার রেওয়াজ আছে। এখানে ঠিক পঞ্চায়েতের মতোই  গাছ তলায় সবাই এসে জমায়েত হলো। এদের বক্তব্য হলো একটা বাচ্চা ছেলের জন্য গোটা গ্রামটা উচ্ছন্নে যেতে বসেছে। আগামী দিনে ঘর ও  বাইরের কাজ করার জন্য ছেলে মেয়েদের আর পাওয়া যাবেনা - এই জিনিস আর চলতে দেওয়া যায়না। আর মেয়েদের শিক্ষা - সে তো একেবারেই বন্ধ করে দেওয়া উচিত। 

এই কথায় অনেকেই সায় দিল -

- কেউ আবার বলে উঠলো মেয়েদের হাতে কলম মানায় না, খুন্তিটাই বিশেষ মানানসই। 

গ্রামের এক প্রাচীন বৃদ্ধ, যিনি দীর্ঘ দিন গ্রামের বাইরে ছিলেন, বর্তমানে গ্রামে এসেছেন।  তিনি এতক্ষণ ধরে সবার কথা শুনছিলেন, এবার তিনি উপস্থিত গ্রামের মানুষের সামনে বলতে শুরু করলেন ----

-- " তোমরা কি জানো, তোমাদের ঘরে এতো অন্ধকার কেন; যা তোমরা বহু দিন ধরে ভোগ করে আসছো ? সেটা একমাত্র শিক্ষার আলো তোমাদের ঘরে না ঢোকার কারণে। গ্রামের এই গরীব মানুষদের দুঃখ-দুর্দশা সেদিনই কমবে, যেদিন তোমাদের ছেলে-মেয়েরা প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হবে এবং তোমাদের এই গরিবিয়ানা দূর করবে। গরিবদের ঠকানোর সব থেকে বড় অস্ত্র হচ্ছে তাদের শিক্ষিত না করা।  শিক্ষিত হলে যে, অন্যায় অনাচার যুগ যুগ ধরে তোমাদের উপর চলে আসছে, সেটা খুব সহজেই তোমরা বুঝতে পেরে যাবে। "

বৃদ্ধের কথায় যেন ঔষধ ধরলো, সবাই কেমন যেন চুপচাপ হয়ে এর-তার মুখের দিকে চাওয়াচায়ি করতে লাগলো। 

গ্রামের লোকজনদের গুঞ্জনে মিতুন বিন্দুমাত্র ভয় পেলো না। পরের দিন সবাইকে নিয়ে গ্রামের মাঠে দাঁড়িয়ে সে বন্ধুদের বলল -

- " যদি আমাদের বড়রা বিরোধ করে, তবে আমরা কোন বিরোধ করবো না, তার পরিবর্তে আমরা প্রমান করবো যে, পড়াশুনার প্রয়োজনীয়তা কি ? আমাদের পড়াশুনার সাথে গান, কবিতা পাঠ, হিসাব রাখার শিক্ষা চালু থাকবে।  একদিন তাঁরা বুঝতেই পারবে।"
রতন একটু আতঙ্কিত হয়ে বলল - 
- " যদি তারা আমাদের স্কুলটা ভেঙে দেয় ?"
মিতুন মাটিতে একটা কাঠি দিয়ে আঁকলো - " অ , আ। "

" মাটি যদি কেড়ে নেয় তবে আমরা আকাশে বাতাসে লিখবো।  আমাদের লেখাকে  কেউ আটকাতে পারবে না। "

দিব্যি একদিন বেশ মনোযোগ সহকারে সবাই অঙ্ক  করছে। এমন সময় গ্রামের বেশ কিছু মানুষ এসে 'জ্ঞানের আলো' স্কুলে ঢুকে পড়লো।  আসলে তারা দেখতে চাইছে, কি হচ্ছে সেখানে।  

মিতুন তখন রতনদের অঙ্ক শিখাচ্ছিলো। প্রশ্ন করলো--
--- " পাঁচটা পাতি লেবু বিক্রি করলে যদি দশ টাকা আসে, তবে একটা পাতিলেবুর দাম কত ? "
--- ক্ষনিকের মধ্যে রতন বলে উঠলো -
- "দুই টাকা। "
বড়োরা বেশ চমকে গেলো। পরস্পর মুখ চাওয়াচায়ি করতে লাগলো। 
একজন অপরজনকে বলল -
- "বিভাসের বেটা রতন তো বেশ বুদ্ধিমান হয়ে উঠেছে । "

কিন্তু সবাই তো এক নয়। 

পরীর বাবা চেঁচিয়ে বলে উঠলেন

--- " এসব জিনিস চলতে দিলে, মেয়েরা বিয়ে করবেনা, ছেলেরা কাজকর্ম ছেড়ে দিলে, আমরা খাবো কি ?"

এতে আবার কেউ সায়ও দিলো। একটু কোলাহল হলো বৈকি।  কিন্তু কর্তব্যে অবিচল, ঈশ্বরের প্রতি অগাধ আস্থাবান মিতুন, এক কোনে দাঁড়িয়ে, এই দৃশ্য দেখছিল  আর মনে মনে আগামী দিনের পরিকল্পনা সাজাচ্ছিলো। 

বহু তর্ক-বিতর্কের  অবসানের জন্য সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হলো, আগামী হাটবারের দিনে মিতুন ও তার বন্ধুরা সবার সামনে তাদের এতদিনের শিক্ষার পরীক্ষা দেবে।  আর সেই পরীক্ষায় পাশ করলে স্কুল চলবে আর তা না হলে স্কুল বন্ধ। 

এ যেন হাটে মেলা বসার মস্ত আয়োজন।  বাঁশ দিয়ে মঞ্চ তৈরি হয়েছে , নিচে দর্শকদের  জন্য শতরঞ্চি বিছানো হয়েছে।  পুকুরপাড় থেকে গ্রামের মহিলারা নিত্য দিনের  কাজকে বন্ধ রেখে গ্রাম সভায় ভিড় করেছে। আবার ভ্রাম্যমান ব্যাপারীরা  কাঁধে গামছা আর কেউবা মাথায় ঝুড়ি নিয়ে কৌতূহল সামলাতে না  পেরে দাঁড়িয়ে দেখছে। 

এইসব দেখে মিতুন বাহিনীর চোখেমুখে পরীক্ষা নামক অনুষ্ঠানের কোন ভয় ভীতি চোখে পড়লো না, বরং একটা আত্মবিশ্বাসের ছবি দেখা গেলো। 

 এবার এলো সেই পরীক্ষার অন্তিম পর্ব -

প্রথম প্রশ্নটা উড়ে এলো এক মুদি দোকানদারের কাছ থেকে -

- " আমার দোকানে যদি বারো কেজি চাল থাকে আর আমি প্রতি কেজি চাল দশ  টাকা কিলো দরে বিক্রি করি তবে সব চাল বিক্রি করলে কত টাকা পাব ?"
রতন কালবিলম্ব না করে হাত তুলল এবং উত্তর দিল -
- " একশো কুড়ি টাকা।"
ভিড় থেকে একটা রব উঠলো - " রতন , ঠিক বলেছে। "
এর পর এক কৃষকের প্রশ্ন করার পালা -
- " মনে কর আমার মাঠে যদি তিন সারি ধান থাকে, প্রতি সারিতে পাঁচটা গাছ আছে , তবে মোট গাছ কত হলো ?"
পাপিয়া বেশ হাসিতে হাসিতে বলল -
- " পনেরোটি গাছ। "
মহিলারা সব হাততালি দিয়ে উঠলো। 
মিতুন বেশ উৎসাহিত হয়ে বলল-
- " অঙ্ক ছাড়াও এখানে অনেক ধরণের অভ্যাস করা হয়- যেমন আমরা গান,কবিতা ও গল্প পড়ি এবং সময়ে সময়ে বানিয়ে বানিয়ে কবিতা ও গল্প বলার অভ্যাস করি। "
মিতুন তার বন্ধুদের নিয়ে গান গাইলো -
" আলো আমার আলো ওগো আলোয় ভুবন ভরা "-
গানের সুরের ঝংকারে যেন মুছে গেলো দীর্ঘ দিনের সংস্কার , সমবেত মানুষ প্রানভরে গান শুনলো। 
মঞ্চের নিচে বসে থাকা সেই বৃদ্ধ মানুষটি হাততালি দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। তিনি বললেন - " আমি সেই দিনই বলেছিলাম, এই বাচ্ছারা সবে বাতি জ্বালিয়েছে তাদের অন্তরে আর সেই আলোতে আগামীদিনে আলোকিত হবে সমগ্র গ্রাম, তারপরে তার পাশের গ্রাম, তারপর তারপর ... এইভাবেই একদিন এই গ্রামের বাচ্ছারা সেই আলোর পথযাত্রী হয়ে উঠবে। "
সেই দিন অজস্র হাততালির বন্যা বইছিলো। আর সেই বানে ভেসে গিয়েছিলো সব  বাধা আর ব্যবধান। বিরোধী বলে আর কেউই রইলো না সেই গ্রামে। 
আলোর পথ যাত্রী -
খুব অল্প সময়ের মধ্যে মিতুনদের 'জ্ঞানের আলো' যেন আলোকবর্তিকা হয়ে গ্রামের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে এক নব চেতনার জন্ম দিলো। স্কুল ভাঙার গল্প অতীত হয়ে গেছে। সেখানে জায়গা নিয়েছে, এক সহযোগিতার বাতাবরণ। যে যার সামর্থ অনুযায়ী এই শিশুদের খাতা-বই- পেন্সিল দিয়ে সাহায্য করছেন। 
আসে পাশের গ্রামে মিতুনদের স্কুল তৈরির খবর ছড়িয়ে পড়লো,শুধু ই তাই, অন্যান্য গ্রামের  বয়জেষ্ঠ্যদের সেটা আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়াল। 
সব থেকে আশ্চর্য লাগলো সেই দিন, যে দিন পাশের গ্রামের এক ছোট্ট ছেলে মাঠে গরু চড়াচ্ছিলো, হঠাৎ মিঠুনকে  দেখে দৌড়ে এসে বলল -
- "শোন ভাই , শুনলাম তোমাদের গ্রামে একটা স্কুল খুলেছে, সেই স্কুলে আমাকে পড়তে  নেবে?"
আবার সংকট 

কাজের অগ্রগতির সাথে যেন সংকটের মেঘও যেন পাশে পাশে ঘনীভূত হতে থাকে।  এবার সমস্যটা এলো অন্য দিক থেকে। 
ছেলে মেয়েদের মা-বাবারা  বলল -
- "সারাদিন খেটে আমাদের মুখের ভাত জোগাড় করতে হয়।  বাচ্ছারা যদি একটু  সহযোগিতা করতো তাহলে, একটু হলেও আমাদের কষ্ট কমতো। শুধু পড়াশুনায়  কি পেট ভরবে ?
মিতুন এই প্রশ্নের উত্তর তখনিই দিতে পারলো না। 
সেই প্রশ্ন নিয়ে আবার রাতে আকাশের পানে চেয়ে প্রার্থনায় বসলো -
বলল - " হে ঈশ্বর আমাদের পথ দেখাও, কি করে আমরা কাজ ও পড়াশুনা একসাথে  চালাতে পারি। "
পরের দিন সে বন্ধুদের সাথে এই নিয়ে আলোচনা করল। 
রতন বলল -
- " আমরা সারাদিনের মধ্যে সকালে যতটুকু কাজ করার দরকার করে দিলাম, তারপর  সারাটা বিকাল পরে আছে। সেই বিকালটা আমরা অবশ্যিই পড়তে পারি। "
সবাই একই রকমভাবে রতনের এই ভাবনার সাথে একমত হলো। 
সবাই মিলে ঠিক করলো - 
-" পড়াশুনা কোন অবস্থায় বন্ধ করা যাবেনা। কাজ এবং পড়া একই সাথে চলবে।" 
যেমনটি ভাবনা তেমনটি কাজ। 
মিতুনরা গেল সেই কৃষিজীবী কাকাদের কাছে। 
সে বলল -
-" আমরা যে যার মতো সকালে আপনাদের সাথে মাঠে কাজ করে দেব , কিন্তু বিকালে  আমাদের পড়ার সময়টা ডাকবেন না। "
কাজ আর পড়াশুনাকে পাশাপাশি নিয়ে চলার প্রস্তাবটিকে  সবাই সমর্থন করলো।  আর এই বার্তাটি আশেপাশে গ্রামেও ছড়িয়ে পড়লো।  এবার পাশাপাশি গ্রামের বাচ্চারা দলে দলে স্কুলে এসে পড়তে লাগলো। 
মিতুন বুঝতে পারলো - 'জ্ঞানের আলো' নামকরণের সার্থকতা। 
শরতের শুরুতেই একদিন হঠাৎ করে একটা খবর এসে পৌছালো মিতুনদের কানে। যা শুনে তারা অগাধ জলে পড়ল। ঘটনাটা হলো, গ্রামে যে স্থানে তারা চালাঘর করে স্কুল চালাচ্ছিল,  তার মালিক সেই জমিটাই বিক্রি করে দিচ্ছে। সুতরাং  স্কুলকে বন্ধ করতেই হবে। 
এই খবর শুনে বাচ্চাদের মন বেজায় খারাপ হয়ে গেলো।  তাদের পড়াশুনা কি এবার  থেমে যাবে ?
রতন, পাপিয়া,শিবু ও অন্যরা প্রায় একসাথে বলল -
-" আমরা কি আবার আমাদের সেই পুরোনো জায়গায় ফিরে যাব ?"
মিতুন চুপ করে, এক কোনে কান্না ভরা চোখে বসে আছে। 
মনে মনে প্রার্থনা করলো - " আমার মনে শক্তি দাও, হে ঈশ্বর, আমি যেন এবারও  এই সংকট থেকে মুক্তির রাস্তা খুঁজে পাই। "
ঠিক পরের দিন সকাল বেলা, মিতুন তার কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে হাটে এসে উপস্থিত হলো  এবং গ্রামের সব বড়দের একত্রিত করল। 
সে বলল -
-" এই স্কুল শুধু আমাদের নয়, এই স্কুলটি আপনাদের সন্তানদেরও  স্বপ্ন।  যদি এই  জমি চলে যায়, তাহলে সব কিছুই নিভে যাবে। আমরা কি সবাই মিলে একটা নতুন জায়গায় নতুনভাবে আবার স্কুল শুরু করতে পারিনা ?"
মিতুনের এই প্রস্তাবে সবাই একটু চুপচাপ হয়ে গেলো। 
কিন্তু মিতুনের চোখেমুখে  এক গভীর আত্মবিশ্বাস দেখে গ্রামের বড়দের মধ্যে কিছু  কৃষক প্রায় একইসুরে বলে উঠলো -
-" আমরা জমি দেব তোদের স্কুলের জন্য, তুই সাহস করে স্কুলটা চালিয়ে যা। "

ইতিমধ্যে ঝড় বিদায় নিয়েছে। শরতের ঝলমল রোদের আলোতে শুরু হলো স্কুলের  কাঠামো তৈরি করার কাজ।  কেউবা দিল খড়, কেউবা দিল বাঁশ আর কাঁদা  মাটির বিনুনি দিয়ে বোনা হলো উপরে খড়ের চাল আর বাঁশের কাঠামোর উপর  মাটির আস্তরণে  মোড়া  নতুন স্কুল। প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে বাচ্চারা হেসে  উঠলো।
প্রতিদিনের মতো মিতুন সন্ধ্যাবেলা আবার প্রার্থনায় বসলো, আর ফিসফিস করে  ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে বলল -"আসলে শক্তি আমাদের ভিতরেই রয়েছে, শুধু তাকে  একাগ্রতার সাথে জাগিয়ে তুলতে হবে, তবেই কেল্লা ফতে। "

তারিখ ৩১/০৮/২৫ 
ভালো লাগলে পরিচিতদের কাছে  শেয়ার করুন। খারাপ লাগলে ইগনোর করুন।
rabinujaan.blogspot.com ক্লিক করে যে কোন সার্চ ইঞ্জিন থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে 
 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)