৩৩৩ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - ৪
যদি একমত হন, তবে বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন
অনেক না বলা কথা, অনেক ভাবনা, মানুষের জীবনবোধ কেমন হতে পারে- এসবই সম্পূর্ন হতো না যদি স্বামী বিবেকানন্দর সাথে আমরা পরিচিত না হতাম। সেই সঙ্গে আমরা দেখলাম আমাদের অতীতের ভারতবর্ষকে, পরিচিত হলাম এই মহান দেশের কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে আর পাশাপাশি বর্তমানের কদর্য চেহারাটা আমাদের মানসপটে ভেসে উঠলো। যে কোন চর্চা অনেকটা ফুটবল মাঠে অনুশীলন কিংবা প্রত্যহ ঝাড়ু হাতে সকাল -বিকাল মনের অন্দরে জমে যাওয়া ধুলার আস্তরণ পরিষ্কার করার মতো।
অলসতার মতো বিলাসিতার অভ্যাস মানুষকে ক্রমাগত পিছিয়ে নিয়ে যায়। । এই বিলাসিতা ত্যাগের মধ্যে উজ্জীবিত হয় কর্মের উন্মাদনা আর কর্মের দ্বারাই গঠিত হয় সমাজ ও দেশ গঠনের উপযুক্ত পটভূমি।
একটু মোলায়েম করে বলতে হয় - হঠাৎ করে আপনার কানে হঠাৎ “জাগো! জাগো!” ধ্বনি বাজতে থাকে, দয়া করে ঘুম ভেঙে চেয়ার থেকে লাফ দেবেন না। স্বামীজীর আহ্বানটা ছিল সারা দেশ জাগানোর, গৃহস্থালির ঘুম তাড়ানোর নয়। তবে কথাটা এমন তেজী যে, মনে হয় সত্যিই কেউ পিছন থেকে কানে ফুঁ দিয়ে ডাকছে—“উঠ বাবা, এবার কাজে লাগো!”
স্বামীজীর কথাগুলো একেবারে স্ফটিকের মতো পরিষ্কার। “অনেকগুলি তৃণগুচ্ছ একত্র করে রজ্জু প্রস্তুত হলে তাতে মত্ত হাতিকেও বাঁধা যায়”—বাহ! আমাদের বাংলা পাড়া-প্রতিবেশের দৃষ্টান্ত হলে এমনটা হত—“অনেকগুলি চায়ের কাপ একত্র করে যদি খালি হয়, তবে পুরো গলির ঘুম ভাঙে।” কিন্তু স্বামীজী যে কেবল তত্ত্ব বললেন তা নয়; সোজা নির্দেশ দিলেন—যুবকেরা একত্র হও, দরিদ্রের জন্য মাটির কুটির বানাও, ম্যাজিক লণ্ঠন কিনে গরিবদের জ্যোতির্বিজ্ঞান শেখাও। যেন বলছেন, শুধু “জয় হিন্দ” বলে উচ্ছ্বাসে গলা ফাটালেই হবে না, লন্ঠন হাতে এ ঘর ও ঘরে ঘুরতে হবে।
ভাবুন তো, আজকের যুবকরা যদি সেই ম্যাজিক লণ্ঠন হাতে নিয়ে শহরে ঘোরে! পাড়ার লোক ভাববে—ওই যে আবার নতুন রিলের প্রোমোশন শুরু হয়েছে। কিন্তু স্বামীজি বলেছিলেন, “নেতা হতে যেও না, সেবা কর।” এদিকে আমাদের দেশে নেতা হওয়ার প্রতিযোগিতা যে কেমন, সেটা নির্বাচনকালের মাইকের আওয়াজেই বোঝা যায়। স্বামীজি যদি আজ বেঁচে থাকতেন, বোধহয় কপালে হাত দিয়ে বলতেন, “বাবারা, তোমাদের নেতৃত্বের নেশা ছাড়াতে আমার আরও দশ জন্ম লাগবে।”
তিনি বিদেশি শাসনের যুগে বলেছিলেন, “দরিদ্রদের চক্ষু খুলে দিতে হবে, ভাবটা পৌঁছে দিতে হবে।” আজও সেই দরিদ্র ছাত্রের পড়া ছাড়ার কারণ—দারিদ্র্যই। তখন বইয়ের দোকান কম ছিল, এখন মোবাইল রিচার্জের দোকান বেশি; কিন্তু গল্প একই। টিউশন ফি না মেটাতে পারলে ছাত্র আজও মাঝপথে বই ফেলে দেয়। স্বামীজী বলতেন—“কাজের আরম্ভ ছোট হলেও ভয় পেও না।” আজকের স্টার্ট-আপ দুনিয়ায় এটা শুনলে অনেকের মন ভাল হবে, তবে সাথে তিনি যোগ করতেন—“নেতৃত্বের এই পাশব প্রবৃত্তি জীবন সমুদ্রে অনেক বড় বড় জাহাজ ডুবিয়েছে।” স্টার্ট-আপের সিইওদের জন্যও কি উপদেশ রইল না?
এখন আসি রবিঠাকুরের দিকে—“আপনারে দীপ করি জ্বালো।” স্বামীজি যেন এর উত্তরে বললেন—“দীপ জ্বালাবার তেলটা আমি দেখিয়ে দিচ্ছি।” কবি দিলেন রোমান্টিক, স্বামীজি সেখানে যুক্ত করলেন বাস্তবের রসদ। একেবারে হাতেকলমে পাঠ।
যদি স্বামী বিবেকানন্দ আজকের ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপটে তরুণদের উদ্দেশে কথা বলতেন, তাঁর বাণী হয়তো এমনই হতো—তাঁর উনিশ শতকের তেজ রেখে, আজকের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে মিশিয়ে। নিচে তাঁর সম্ভাব্য মূল ভাবগুলো তুলে ধরলাম:
কালে কালে সমাজে শিক্ষা ও প্রযুক্তি প্রবেশ করেছে সেই প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত -
“তোমরা যেটা হাতে পেয়েছো—ইন্টারনেট, মোবাইল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—এগুলো কেবল খেলনা নয়। এগুলোকে ব্যবহার করো গরিবের ঘরে আলো পৌঁছে দিতে, অশিক্ষার অন্ধকার দূর করতে। নেশা, ভুয়া খবর আর ফাঁকা তর্কে এ শক্তি নষ্ট করো না।”
তিনি ডাক দিতেন অর্থনৈতিক বৈষম্য ভাঙার জন্য -
“গগনচুম্বী অট্টালিকা আর বস্তির ফাঁক যত দিন বাড়বে, স্বাধীনতা সম্পূর্ণ হবে না। শিল্প, উদ্যোগ আর স্টার্ট-আপ করো—কিন্তু মনে রেখো, সেই সমৃদ্ধি যেন শেষ মানুষের ঘরেও পৌঁছায়।”
তিনি ডাক দিতেন পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষার জন্য -
“গঙ্গা মলিন হলে, হিমালয় যদি তার বরফকে হারায়, তখন মন্দির-মসজিদে পূজা আর প্রার্থনা অর্থহীন। প্রকৃতির সেবা করো—তাতেই ঈশ্বরসেবা।”
ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে শাসক তাদের স্বার্থে চেয়েছিল ধর্মীয় বিভাজন, তবে স্বাধীনতার পরে আজও সেই বিভাজন সমাজে জীবিত আছে ? তাই দেখে তিনি সম্প্রীতির বার্তা দিতেন -
“ধর্ম নিয়ে হিংসা আমার কাছে সবচেয়ে বড় অজ্ঞান। সব ধর্মের মূল এক—মানুষের কল্যাণ। বিভাজন নয়, বন্ধুত্ব গড়ো।”
জনগনের অর্ধেক শক্তিকে এখনো ঘুমিয়ে থাকতে বাধ্য করছো, অর্ধেক শক্তির দ্বারা দেশের পূর্ণ বিকাশ কি করে সম্ভব, তাই চাই নারীশক্তির জাগরণ-
“নারীকে অবমাননা করা মানে দেশের অর্ধেক শক্তিকে অন্ধকারে ফেলে দেওয়া। শিক্ষার, সিদ্ধান্তের, নেতৃত্বের প্রতিটি স্তরে নারী ও পুরুষ সমান। এই সত্য মেনে না চলতে পারলে স্বাধীনতা কেবল অর্ধেকই থাকবে।”
কর্মেরও একটা ধর্ম আছে, সেটা -
“পুজো-উৎসবের জৌলুসে নয়, রাস্তায়-গ্রামে-শহরে কাজ করাই সত্যিকারের উপাসনা। গরিবের মুখে হাসি ফোটানো, বঞ্চিতকে শিক্ষা দেওয়া—এই তোমাদের আজকের যজ্ঞ।”
ব্লগার- রবীন মজুমদার
তারিখ -১৭-০৯-২৫
ভালো লাগলে শেয়ার করুণ -
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।
মন্তব্যসমূহ