৩৩৮ রবীন্দ্রভাবনায় শ্রীমৎ ভাগবত গীতা
৩৩৮ রবীন্দ্রভাবনায় শ্রীমৎ ভাগবত গীতা
ভারতীয় সংস্কৃতির আধ্যাত্মিক ভাণ্ডারে ভগবদ্গীতা এক অনন্য স্থান অধিকার করে আছে। মহাভারতের যুদ্ধক্ষেত্রে কৃষ্ণ ও অর্জুনের সংলাপে যে তত্ত্ব ও দর্শনের বিকাশ ঘটেছে, তা শুধু ধর্মগ্রন্থ নয়—মানবচিন্তারও এক অমূল্য ধন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই গীতাকে অন্ধভক্তির চোখে দেখেননি। তাঁর দৃষ্টিতে গীতা যেমন মহান, তেমনই প্রশ্নসাপেক্ষ। আধ্যাত্মিক মুক্তির আহ্বান তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করেছেন, আবার নৈতিক দ্বন্দ্বের জায়গায় তিনি সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন।
প্রথমত, গীতার যে দিকটি রবীন্দ্রনাথের মনে গভীর শ্রদ্ধা জাগিয়েছিল তা হল কর্মযোগের বাণী। সংসারত্যাগ বা জড়বিশ্ব থেকে পালানোর শিক্ষা গীতায় নেই। কৃষ্ণ বারবার বলেছেন, “কর্ম করো, কিন্তু ফলের আসক্তি রেখো না।” এই অনাসক্ত কর্মের আদর্শ রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী দর্শনের সঙ্গে মিলে যায়। মানুষের কর্তব্যের মধ্যে থেকেই ঈশ্বরচেতনাকে উপলব্ধি করা—এই সত্য তিনি নিজ জীবনের সাধনাতেই অনুভব করেছিলেন। গীতার অদ্বৈত ভাবনা, যেখানে জড় ও চৈতন্য এক ব্রহ্মতত্ত্বের প্রকাশ, রবীন্দ্রনাথের বিশ্বমানবের ধারণাকে পুষ্ট করেছিল।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে গীতার আরেকটি তাৎপর্য বিশেষ উল্লেখযোগ্য। অর্জুন যখন যুদ্ধের নৈতিক সংকটে প্রশ্নের পর প্রশ্ন তুলছেন, কৃষ্ণ বহুক্ষেত্রে যুক্তি দিয়ে প্রতিটি প্রশ্নের সরল উত্তর দেননি। তিনি এক উচ্চতর সত্যের দিকে ইঙ্গিত করেছেন—আত্মা অবিনশ্বর, দেহ নশ্বর; তাই কর্তব্যকর্ম থেকে সরে যাওয়া মানবধর্ম নয়। রবীন্দ্রনাথ এখানে দেখেছেন বুদ্ধির তর্ক নয়, আত্মার জাগরণ ঘটানোর প্রচেষ্টা। কৃষ্ণ যেন অর্জুনের সংকটকে চিরন্তন মানবসংকটের প্রতীকে রূপ দিয়েছেন এবং উত্তরের মাধ্যমে মানুষকে আত্মোপলব্ধির দিকে ঠেলে দিয়েছেন।
তবু রবীন্দ্রনাথ কেবল প্রশংসাতেই থেমে থাকেননি। তাঁর মনে প্রশ্ন জেগেছে গীতার যুদ্ধমুখর অবস্থান নিয়ে। যুদ্ধকে “ধর্মযুদ্ধ” বা কর্তব্য হিসেবে মহিমান্বিত করার যুক্তি তাঁকে দ্বিধাগ্রস্ত করেছে। তিনি মনে করেন, ধর্মের নামে হত্যা কখনোই নিখুঁত নৈতিক সমাধান হতে পারে না। আবার, গীতার অতিরিক্ত গম্ভীর তত্ত্বকথা জীবনের স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দকে কখনো কখনো আড়াল করে দেয় বলেও তাঁর অভিমত ছিল। তাই তিনি গীতাকে একাধারে শ্রদ্ধার চোখে ও সমালোচনার চোখে দেখেছেন।
সবশেষে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথের কাছে ভগবদ্গীতা একদিকে মানবমুক্তির অনন্ত আহ্বান, অন্যদিকে নৈতিক সচেতনতার পরীক্ষাক্ষেত্র। কৃষ্ণের উত্তরহীনতার মধ্যে তিনি খুঁজে পান আত্মবোধের ইঙ্গিত, কিন্তু প্রশ্নহীন গ্রহণযোগ্যতা নয়। তাঁর মতে, গীতা আমাদের শেখায় কর্ম ও আধ্যাত্মিকতার মিলন, তবে সেই পথচলা হোক যুক্তি, মানবতা ও বিবেচনার আলোয়। এই দ্বিমুখী দৃষ্টিই রবীন্দ্রনাথের গীতাবোধকে করে তুলেছে বিশেষ ও অনন্য।
তারিখ - ২৩/০৯/২৫
ভালো লাগলে শেয়ার করুণ -
মন্তব্যসমূহ