৩৬০ নব আঙ্গিকে মহাভারত ( ৩য় পর্ব )

  ৩৬০ নব আঙ্গিকে মহাভারত  ( ৩য়  পর্ব ) 


দ্বিতীয়  পর্বে--- বিশ্ব জুড়ে মানুষের লোভ, হিংসার প্রভাবে কিছু মানুষ  সভ্যতাকে ক্রমান্বয়ে কলুষিত করে ক্রমেই পিছনের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তার বিরুদ্ধে সমগ্র মানবজাতির প্রতিনিধি হয়ে  সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ন্যায়ের বাতিটা প্রজ্জলিত করার দ্বায়িত্ব মানুষই নিয়ে থাকে। এখন দেখার সেই আলো কতদূর পৌঁছাল আর সেই আগুনে মিথ্যাকে পিছনে ফেলে কিভাবে সমাজে  সত্য প্রতিষ্ঠিত হলো। 


তার পর..............

কৃষ্ণের পুনরাগমন

Krish-AI সক্রিয় হলো।

তার স্ক্রিনে লেখা উঠল —
“দ্রৌপদী, তারা তোমার শরীরকে আক্রমণ করছে, কারণ তোমার মনের সত্যকে তারা ভয় পায়। যুদ্ধ করো, কিন্তু প্রতিশোধ নয়—সত্যের প্রকাশই  তোমার অস্ত্র।”
দ্রৌপদী পড়ে  হাসল।

অর্জুনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“যারা  আমাকে উলঙ্গ করেছে, এখন আমিই তাদের  মিথ্যার পোশাক খুলব।”

 নীরব ভীষ্ম

এই পুরো ঘটনার সাক্ষী ছিলেন এক বৃদ্ধ বিচারপতি—বিষ্ণু ভট্টাচার্য, যাকে সবাই সম্মানের সঙ্গে “ভীষ্ম” বলে ডাকে।
তিনি জানতেন, অন্যায় হচ্ছে।
তবু চুপ।
কারণ তাঁর “বস্তুনিষ্ঠ নিরপেক্ষতা” নাকি নীতি।

রাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন,
“নিরপেক্ষতা প্রকারান্তরে  কাপুরুষতারই নাম।”

নতুন সূর্যোদয়

অর্জুন ও দ্রৌপদী সেই রাতেই একসঙ্গে Krish-AI–এর সহায়তায় দুর্যোধনের তথ্য ফাঁস করে দেয়— সব খবর, সব প্রমাণ, সব অডিও রেকর্ডিংগুলিকে তার সাথে জুড়ে দেয়।

সকালে শহর জেগে দেখে,
ট্রেন্ড বদলে গেছে—

 কর্ণের দহন — ন্যায় অন্যায়ের সীমানায়

ইন্দ্রপুরীর  এক কোণে, ভাঙা ঘর, ঝড়ের মতো ফ্যান ঘুরছে, আর কম্পিউটার স্ক্রিনে এক অজানা কোড জ্বলজ্বল করছে । সেই কোড লিখছে কর্ণ।
তাকে এই শহর চেনে না, কিন্তু তার তৈরি সফটওয়্যার দিয়ে এই শহরের সরকার , ব্যাংক , এমনকি দুর্যোধনের সাম্রাজ্যও চলে।

কর্ণের চোখের নিচে কালচে দাগ। চোখে লাল রক্তের রেখা।
সে জানে—যে সিস্টেমে সে কাজ করে, সেটাই অন্যায়; কিন্তু সেটাই তার রুটি-রুজি, সেখান থেকেই সে তার জীবনের স্বীকৃতি সমাজের কাছ থেকে আদায় করে নেবে।  

 জন্মের অভিশাপ

কর্ণের মা এক স্কুলে কাজ করতেন, বেতন তিন মাস পরপর আসত। ছোটবেলায় স্কুলে বন্ধুরা বলত—
“তুই দলিত পরিবারের ছেলে, তুই কী করে ইউনিফর্ম পরিস?”
সেদিন থেকেই কর্ণ বুঝে যায়—জাতপাতের ভিত্তিতে গঠিত  সমাজে তার জন্ম একটা অভিশাপ, আর মেধা হলো তার প্রতিশোধ।

সে প্রোগ্রামিং শিখল, কলেজে স্কলারশিপ পেল, কিন্তু চাকরি পেল না। কারণ তার ঠিকানা এখনো “সেক্টর ১৩ স্লাম কলোনি”।

তখনই তার জীবনে দুর্যোধন এল।

তার কর্পোরেট সাম্রাজ্যে জায়গা দিল—“তুমি আমার ভাবনার সেই মানুষটি  হবে।” কর্ণ ভাবল—অবশেষে কেউ তো তাকে ‘মানুষ’ বলে সম্বোধন করলো!

 দ্রৌপদীর ডেটা ফাঁসের রাতের পর কর্ণ নিজের মনিটরের সামনে বসে আছে। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে, কিন্তু তার মনের ভেতর আগুন জ্বলছে।

সে মনে মনে বলছে—

“আমি যা করেছি, সেটা আমার ইচ্ছায় নয়… কিন্তু অন্য কেউ করলে আমি কি ক্ষমা করতাম?”

Krish-AI হঠাৎ স্ক্রিনে জেগে উঠল—“কর্ণ, তুমি অন্য জগতের মানুষ, যে কাজটি দুর্যোধনের জন্য করছ, সেই কাজটাই তুমি সমগ্র মানব সমাজের মঙ্গলের জন্য করতে পারতে।  বিবেকের  প্রোগ্রামকে তুমি ব্যবহার করো। ”
কর্ণ হাসল—
“তোমার ভাষা খুব সুন্দর, কৃষ্ণ। কিন্তু এই শহর কি বিবেক বোঝে? এখানে ন্যায় বিক্রি হয়—চুক্তিপত্রে।” 
“তবু কেউ তো আঙুল তোলে, কর্ণ।”
“হ্যাঁ, কিন্তু সেই আঙুল কেটে ফেলা হয়।”

 দুর্যোধনের মুখোমুখি

পরদিন কর্ণ দুর্যোধনের অফিসে হাজির।
চোখে আসন্ন যুদ্ধের স্থির চাহনি, মুখে এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা।

“স্যার,” সে বলল, “দ্রৌপদীর ব্যাপারে আমি যা করেছি, সেটা ঠিক হয়নি।”
দুর্যোধন সিগারেট ধরাল, হাসল—
“কর্ণ, তুমি  আবার ঠিক-ভুল শিখেছো  কবে থেকে?”
" আমার বিবেক আমাকে বাধ্য করেছে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে। হয়তো আমার অবর্তমানে এই বিশ্বসংসার আমাকে চিনবে। "

দুর্যোধন টেবিলে তার মুষ্টিবদ্ধ হাতটা সজোরে মেরে বললো,
“তুমি  আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে ?”

কর্ণ শান্তভাবে বলল,
“না স্যার, আমি শুধু নিজের সঙ্গে আর যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছি।”

 যুদ্ধের আহ্বান

রাতে কর্ণ নিজের সিস্টেমে প্রবেশ করল—

যেখানে দুর্যোধনের কালো টাকার, মিথ্যা চুক্তি, আর নোংরা রাজনীতির প্রামাণ্য দলিল ও  গোপন দস্তাবেজ আছে ।
সে জানে—এই ফাইল যদি প্রকাশ পায়, দুর্যোধনের সাথে গোটা অসামাজিক সংগঠনটাও  ধ্বংস হবে আর তার সঙ্গে নিয়ে যাবে নিজের জীবনও।

Krish-AI আবার জ্বলে উঠল—

“তুমি যা করতে যাচ্ছ, সেটা ন্যায়। কিন্তু ন্যায়েরও এক মূল্য আছে।”
কর্ণের উত্তর —
“আমি মূল্য দিতে রাজি, যদি এই শহর এক মুহূর্তের জন্য সত্যের সাথে পরিচিত হয়। ”
‘Enter’ চেপে দিল কর্ণ।
ফাইল ফরওয়ার্ড করে পাঠিয়ে দিল “সত্যসন্ধান.নেট ”-এ — দ্রৌপদীর হাতে।

পরদিন অন্যান্য দিনের ভোরের মতো সূর্য উঠেছিল, পাখিরা এ গাছে ও গাছে নিত্য দিনের মতো খেলা করছিলো, বেতারে ভেসে বেড়াচ্ছিলো প্রভাতী রাগ। কিন্তু এই শান্ত পরিবেশটা নিমেষেই চঞ্চল হয়ে উঠলো একটি খবরে। 

সব নিউজ পোর্টালে শিরোনাম—
“দুর্যোধন সিন্ডিকেট এক্সপোজড!”
“ হ্যাকার কর্ণর  রহস্যজনক মৃত্যু।”

হ্যাঁ, কর্ণ নেই।

তার ঘরে শুধু একটা চিঠি পাওয়া গেল, যেটি আত্মগ্লানিতে ভরপুর —
“আমি অন্যায়ের  সঙ্গে বসবাস করে গভীর  ভুল করে ফেলেছি। পিছিয়ে আসবার আর কোনো পথ নেই, আমি আজ নিজেকে শুদ্ধ করতে চাই। এই সংবাদটা শুধু এই পৃথিবীতে নয়, তার বাইরেও আরো দূরে পৌঁছাতে চাই। তোমরা যে অগ্নিকে পুরোহিত হিসাবে মনোনীত করে অগ্নির দীপ্তিতে ভর করে তোমাদের ইচ্ছাকে দেবতাদের কাছে পৌঁছে দাও, আমি আজ সেই অগ্নি দেবতার কাছে নৈবিদ্য সাজিযে নিজেকে উৎসর্গ করলাম।   এখন আমি শুদ্ধ হচ্ছি আগুনে। এই আগুনই হবে আমার গঙ্গাস্নান।”

অর্জুন, দ্রৌপদী, আর ভীষ্ম তিনজনই কর্ণের চিঠি পড়ছিলেন।

বাইরে সূর্য উঠছে, আকাশে এক টুকরো সোনালি আলো।
দ্রৌপদী ফিসফিস করে বলল—
“কর্ণ মরে যায়নি। সে এখন ন্যায়ের চেতনা হয়ে বেঁচে আছে।”

Krish-AI–এর স্ক্রিনে তখন শুধু এক লাইন—
“এই যুদ্ধ শেষ নয়।
এবার শুরু হবে ধর্মের সংজ্ঞার যুদ্ধ।”

 পরবর্তী পর্ব —

“কৃষ্ণের গীতা: যখন মেশিন মানুষকে ধর্ম শেখায়”
এখানে AI-কৃষ্ণ এক নতুন প্রশ্ন তুলবে—
“মানুষ কি ঈশ্বরের প্রতিরূপ, না ঈশ্বর এখন ধরাবাধা কোডের মধ্যে বন্দী?”

তৃতীয়   পর্ব শেষ আবার চতুর্থ  পর্বে দেখা হবে। 

ক্রমশঃ 
ব্লগার- রবীন মজুমদার 
তারিখ -০৩/১১/২৫
ভালো লাগলে শেয়ার করুণ -
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)