৩৯৫ দুই প্রতিবেশীর রম্য ইতিহাস

  ৩৯৫ দুই প্রতিবেশীর রম্য ইতিহাস 

মানুষের হৃদয় বড় আশ্চর্য জায়গা। সেখানে একই সঙ্গে দুই প্রতিবেশী বাস করে—একজনের নাম কলহ বা যুদ্ধ , আরেকজনের নাম শান্তি। দুজনের বাড়ি পাশাপাশি, মাঝখানে কোনো পাঁচিল নেই। মাঝে মাঝে তারা চায়ের কাপ নিয়ে গল্পও করে। কিন্তু সমস্যা হলো—যখনই কলহ একটু রেগে যায়, তখনই সে শান্তির বাড়ির সামনে কামান বসিয়ে দেয়।

এই অদ্ভুত দুই প্রতিবেশী সম্পর্কের ইতিহাসই আসলে মানবসভ্যতার ইতিহাস। নির্ধিধায় পরিচয় করানো যায় কলহের জন্মস্থানের সাথে। 

জন্মস্থান: মানুষের অন্তর

অনেকেই মনে করেন কলহ  শুরু হয় সীমান্তে। কেউ বলেন অস্ত্রাগারে। কিন্তু ইতিহাসবিদরা ধীরে ধীরে বুঝেছেন—যুদ্ধের আসল জন্মস্থান মানুষের মন।

যখন মানুষের ভেতরে অহংকার, ভয়, লোভ বা ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা জমে ওঠে, তখনই কলহের বীজ অঙ্কুরিত হয়। আর যখন সেই মনেই সহমর্মিতা, আত্মবোধ ও নৈতিকতা জেগে ওঠে, তখন জন্ম নেয় শান্তি।

এই কারণেই ইতিহাসে আমরা দেখি—একই সভ্যতা কখনো মহাকলহ  সৃষ্টি করেছে, আবার কখনো মহান শান্তির যুগও তৈরি করেছে।

কলহ  ও শান্তির চক্র: ইতিহাসের দোলনা

মানবসভ্যতার ইতিহাস যেন এক দোলনা—একদিকে কলহ , অন্যদিকে শান্তি।অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন কলহ  ও শান্তি এক ধরনের চক্রের মধ্যে আবর্তিত হয়। ইতিহাসবিদ আর্নল্ড টয়নবি দেখিয়েছিলেন যে গত কয়েক শতকে প্রায় ১০০-১২০ বছরের ব্যবধানে বড় বড় কলহ  ও শান্তির পর্যায় দেখা যায়।

অর্থাৎ ইতিহাস যেন মাঝে মাঝে গভীর শ্বাস নেয়—প্রথমে সংঘাত, তারপর কিছুদিন শান্তি, তারপর আবার সংঘাত।

উদাহরণ- 

১. রোমান সাম্রাজ্য

রোমান ইতিহাসে একটি বিখ্যাত শান্তির যুগ আছে—প্যাক্স রোমানা

খ্রিস্টপূর্ব ২৭ থেকে খ্রিস্টাব্দ ১৮০ পর্যন্ত প্রায় দুই শতাব্দী ধরে রোমান সাম্রাজ্যে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা ও শান্তি বজায় ছিল। এই সময় বাণিজ্য, আইন ও সংস্কৃতির ব্যাপক উন্নতি হয়েছিল।

কিন্তু মজার বিষয় হলো—এই শান্তি আসলে কলহের  ফল। বহু গৃহযুদ্ধ ও সামরিক সংঘাতের পর সম্রাট অগাস্টাস ক্ষমতা স্থিতিশীল করেছিলেন। অর্থাৎ যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের উপরই দাঁড়িয়ে ছিল সেই শান্তি।

তাই ইতিহাসের রসিক মন্তব্য হলো—
“শান্তি মানে কলহ  নেই—এটা নয়; শান্তি মানে যুদ্ধ একটু বিশ্রাম নিচ্ছে।”

উদাহরণ -

২. ইউরোপের ত্রিশ বছরের কলহ 

১৭শ শতকে ইউরোপে ভয়াবহ সংঘাত হয়েছিল—ত্রিশ বছরের যুদ্ধ। ১৬১৮ থেকে ১৬৪৮ পর্যন্ত চলা এই সংঘর্ষে ইউরোপের বহু অঞ্চল ধ্বংস হয়ে যায় এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারায়।

এই কলহের শেষ হয় ওয়েস্টফালিয়ার সন্ধি দিয়ে, যা আধুনিক আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করে।

অর্থাৎ আবারও দেখা গেল—
একটি ভয়াবহ কলহ  শেষ পর্যন্ত নতুন শান্তির ব্যবস্থা তৈরি করল।

কলহ : ইতিহাসের নির্মম শিক্ষক

মানুষ অদ্ভুত প্রাণী। শান্তিতে থাকলে সে অনেক সময় ভুলে যায় কেন শান্তি দরকার। কিন্তু যুদ্ধ তাকে সেই শিক্ষা আবার মনে করিয়ে দেয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মানুষ বলেছিল—
“এটাই শেষ যুদ্ধ।”

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় ইতিহাস হেসে বলেছিল—
“মানুষের স্মৃতি খুবই দুর্বল।”

তবে যুদ্ধেরও একটি কুটভ্যাস  আছে। অনেক সময় যুদ্ধই মানবসভ্যতাকে নতুন রূপ দেয়।একজন ইতিহাসবিদ তো বলেই ফেলেছেন—

২০শ শতকের অনেক সংঘাত আসলে একটি দীর্ঘ “যুগারম্ভমূলক যুদ্ধ ”, যা নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্ম দেয়।

অর্থাৎ যুদ্ধ কখনো কখনো ইতিহাসের নির্মম কিন্তু কার্যকর শিক্ষক।

সংগঠন ও সংঘাত

মানুষ একসঙ্গে বহু সংগঠনের সদস্য।

মানুষ একসঙ্গে

  • পরিবারের সদস্য

  • কর্মক্ষেত্রের কর্মী

  • সমাজের নাগরিক

  • রাষ্ট্রের নাগরিক

এই সব সংগঠন যেন অনেকগুলো চাকার মতো। একটি চাকা নষ্ট হলে পুরো যন্ত্রটাই কেঁপে ওঠে।

যেমন—
অর্থনৈতিক সংকট → সামাজিক অসন্তোষ → রাজনৈতিক সংঘাত → যুদ্ধ।

ইতিহাসে এর উদাহরণ অসংখ্য। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ইউরোপে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক জোটবদ্ধতা মিলেই এক বিশাল সংঘাতের জন্ম দিয়েছিল।

শান্তির প্রকৃত শর্ত: সাংস্কৃতিক রূপান্তর

কেবল রাজনৈতিক চুক্তি বা অস্ত্রনিয়ন্ত্রণ দিয়ে স্থায়ী শান্তি তৈরি হয় না। শান্তি তখনই স্থায়ী হয় যখন মানুষের সাংস্কৃতিক মানসিকতা বদলায়।

১৯৩৫ সালে ১৫ই এপ্রিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াসিংটন ডি সিতে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি হয়েছিল—রোরিখ প্যাক্ট—যার উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধের সময়ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা করা। আমার মনে হয় -সেটা ছিল সোনার পাথর বাটি। কেননা, সাংস্কৃতিক অবমনের ফলে পঙ্কিল পরিবেশে তার জন্ম। আসলে, সভ্যতার আসল শক্তি অস্ত্রে নয়, সংস্কৃতিতে।

 অধ্যাত্মিকতা: অন্তরের বিপ্লব

এখানেই আসে এই পর্বের মূল ধারণা—অধ্যাত্মিকতা। যে অধ্যাত্মিকতা মানে শুধু ধর্মীয় আচরণ নয়। এটি মানুষের আত্মজাগরণ।

যখন মানুষ উপলব্ধি করে—অন্য মানুষের দুঃখ আমার দুঃখ। অন্যের জীবনও আমার মতো মূল্যবান। ক্ষমতার চেয়ে মানবিকতা বড় - তখনই যুদ্ধের সম্ভাবনা কমে যায়।

অর্থাৎ শান্তির শুরু কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনে নয়— শুরু মানুষের অন্তরে।

যুদ্ধ ও শান্তির দূরত্ব: একটি মজার সত্য

শেষে একটা ছোট্ট সত্য বলি। কলহ  ও শান্তির দূরত্ব আসলে কতখানি?

একটি আঙুল ট্রিগারে চাপলে যুদ্ধ শুরু হয়। একটি হাত করমর্দনে এগিয়ে গেলে শান্তি শুরু হয়। অর্থাৎ যুদ্ধ ও শান্তির দূরত্ব আসলে মানুষের হৃদয়ের দূরত্ব।

ব্লগার- রবীন মজুমদার 
তারিখ - ১৭/০৩/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)