৩৯৬ বাস্তব অবাস্তবের দোলাচলে
৩৯৬ বাস্তব অবাস্তবের দোলাচলে
গ্রামের নাম অচিনপুর। এই শহরেই থাকত অনির্বাণ। পেশায় স্কুলশিক্ষক, স্বভাবে শান্ত, কিন্তু অন্তরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা। সে জানত—একদিন সে মরবেই। কিন্তু আশ্চর্যের কথা, মৃত্যুর চেয়েও বেশি ভয় সে পেত মৃত্যুর আগের সেই অদৃশ্য কষ্টটাকে—যেটা আসে না, তবুও সে আসে; হয় না, তবুও মনে হয় হয়ে যাচ্ছে।
প্রতিদিন সকালে সে যখন আয়নার সামনে দাঁড়াত, নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে ভাবত— “আজও বেঁচে আছি, কিন্তু এই বেঁচে থাকাটাই বা কতটা নিশ্চিন্ত?”
একদিন স্কুলে যাওয়ার পথে সে দেখল—রাস্তার ধারে এক বৃদ্ধ চুপচাপ বসে আছেন। মুখে অদ্ভুত প্রশান্তি। যেন সব ভয় ঝরে গেছে।
অনির্বাণ এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—“আপনি এখানে বসে কী ভাবছেন?”
বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,
—“মৃত্যু নিয়ে।”
অনির্বাণ একটু চমকে উঠল।
—“মৃত্যু? ভয় লাগে না?”
—“ভয়?” বৃদ্ধ হাসলেন, “ভয়টা মৃত্যুতে নয়, বাবা। ভয়টা হলো—আমরা মরার আগেই হাজারবার মরে ফেলি।”
অনির্বাণ চুপ করে গেল। এই কথাটা তার ভেতরে কোথাও আঘাত করল।
বৃদ্ধ আবার বললেন,
—“তুমি কি জানো, মানুষ কেন ভয় পায়? কারণ সে ভবিষ্যতের যন্ত্রণা আগে থেকেই কল্পনা করে নেয়। যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকের সামনে একটাই পথ—লড়াই। সেখানে ভাবার সময় নেই। কিন্তু তোমাদের এই নাগরিক জীবনে—অসংখ্য পথ, অসংখ্য ভয়, অসংখ্য হিসেব। আর সেই হিসেবই তোমাদের কষ্ট বাড়ায়।”
অনির্বাণ একটু থেমে বলল,
—“তাহলে কি ভাবা ভুল?”
—“না, ভাবা ভুল নয়। কিন্তু ভয়কে পুষে রাখা ভুল। তুমি কি কখনও লক্ষ্য করেছ—শান্তি চাওয়ার জন্যই মানুষ সবচেয়ে বেশি অশান্ত হয়?”
এই কথাটা শুনে অনির্বাণের মনে পড়ল—কিছুদিন আগে শহরে এক গণআন্দোলন হয়েছিল। সবাই শান্তির দাবিতে রাস্তায় নেমেছিল। কিন্তু সেই শান্তির দাবির মধ্যেও ছিল ভয়—পুলিশের ভয়, ভবিষ্যতের ভয়, অনিশ্চয়তার ভয়। তবুও মানুষ নেমেছিল—কারণ তারা অন্তরে শান্তি চেয়েছিল।
বৃদ্ধ যেন তার মনের কথা পড়ে ফেললেন।
সে সময়ে আকাশে এক ঝাঁক সাদা পায়রা উড়ে বেড়াচ্ছিল, সে দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ বললেন,
—“দেখো, মানুষ শান্তির পিপাসু। কিন্তু সে ভাবে—শান্তি বাইরে আছে। তাই সে লড়াই করে, বিরোধিতা করে, ভবিষ্যতের ফল ভেবে কষ্ট পায়। অথচ শান্তি আসলে ভেতরে।”
—“তাহলে এই প্রাকমৃত্যুর যন্ত্রণা থেকে মুক্তি কীভাবে?” অনির্বাণ জিজ্ঞেস করল।
বৃদ্ধ একটু আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“মৃত্যুকে মেনে নাও, কিন্তু মৃত্যুর আগের ভয়কে নয়। দেহ একদিন থামবেই—এটা নিশ্চিত। কিন্তু মনকে প্রতিদিন ঝড়ের মধ্যে ফেলা আর তাকে উদ্ধার করা, তোমার নিজের কাজ।”
একটু থেমে আবার বললেন,
—“জীবনটা যুদ্ধ নয় সবসময়। অনেক সময় এটা নদীর মতো—এঁকে বেঁকে, চড়াই উৎরাই ভেঙে, কখন উদ্দাম বেগে আবার কখন শান্ত হরিণীর মতো মৃদু-মন্দ ঢঙে। তুমি যদি প্রতিটা ঢেউকে মৃত্যু ভাবো, তাহলে তো নদী পার হওয়াই যাবে না।”
অনির্বাণের মনে হলো—তার ভেতরের ভারটা একটু হালকা হচ্ছে।
সেদিন সে বাড়ি ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আবার নিজের চোখের দিকে তাকাল। কিন্তু এবার প্রশ্নটা বদলে গেছে।
সে আর ভাবল না—“কখন মরব?”
সে ভাবল—“আজকে কি আমি ভয় ছাড়া বাঁচতে পারলাম?”
বাইরে তখন হালকা বৃষ্টি পড়ছে। শহরের মানুষজন ছাতা নিয়ে ছুটছে—কেউ অফিসে, কেউ বাড়ি, কেউ হয়তো কোনো আন্দোলনের পথে। সবাই নিজের নিজের লড়াইয়ে ব্যস্ত।
কিন্তু অনির্বাণের ভেতরে এক নতুন নীরবতা জন্ম নিল।
সে বুঝল—
মৃত্যু অনিবার্য,
কিন্তু মৃত্যুর আগের আতঙ্ক—
সেটা একপ্রকার অভ্যাস,
যা চাইলে ছেড়েও দেওয়া যায়।
ব্লগার- রবীন মজুমদার
তারিখ - ১৮/০৩/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।
মন্তব্যসমূহ