৩৯৭ মগজ দখলের লড়াই: কাঁচা বনাম পাকা

৩৯৭ মগজ দখলের লড়াই: কাঁচা বনাম পাকা 

সাবধান! সাবধান ! দেশবাসীগণ আমাদের মগজ দখল করতে আসছে রংবে রঙের জামা পড়া  একাধিক দলে বিভক্ত কিছু জমি কেনার দল।  তারা প্রথমে ভাষণে , তাতে যদি কাজ না হয়, তাহলে আমাদের মগজে অবস্থিত 'লোভ''কে  হাতিয়ার করবে , তাতে ও যদি কাজ না হয়, তাহলে আদি অকৃত্তিম  মনের অন্দরে লুকিয়ে থাকা  'ভয়' কে কাজে  লাগাবে । 

'দখল' শব্দটা শুনলেই আমাদের চোখের সামনে জমিজমা, বাড়ি বা বড়জোর ফুটপাথ ভেসে ওঠে। কিন্তু আসল জবরদখলটা যে প্রতিনিয়ত আমাদের মগজের ভেতর চলছে, তা নিয়ে আমরা কজন মাথা ঘামাই?

ছোটবেলায় শুনতাম ডাবের জল খেলে বুদ্ধি বাড়ে, আবার আমগাছের তলায় সন্ধেবেলা গেলে ব্রহ্মদৈত্য ঘাড় মটকায়। এই যে ভয় মেশানো একটা অদ্ভুত বিশ্বাস— একেই বলে  'কাঁচা জ্ঞান'। এই জ্ঞান মগজের এক কোণে দিব্যি পাটি বিছিয়ে বসে থাকে। তারপর একদিন হঠাৎ বিজ্ঞান এসে হাজির। সে এক্কেবারে হাতুড়ি-শাবল নিয়ে ভাঙচুর চালিয়ে জানাল, ব্রহ্মদৈত্য বলে কিছু নেই, ওটা আসলে গাছের ডালের ছায়া আর কার্বন-ডাই-অক্সাইডের কারসাজি। ব্যস, কাঁচা জ্ঞান চটজলদি পাততাড়ি গুটিয়ে পালাল, আর সেখানে সিংহাসন পেতে বসল 'পাকা জ্ঞান'।

কিন্তু মুশকিল হলো, মগজের এই মিউনিসিপ্যালিটি বড্ড ঢিলেঢালা। সবার মগজে উচ্ছেদ অভিযান সমানভাবে চলে না।

ধরুন, আপনি মহাকাশ বিজ্ঞান নিয়ে পিএইচডি করেছেন, অথচ গ্রহণের সময় রান্না করা খাবার ফেলে দিচ্ছেন এই ভয়ে যে রাহু এসে তাতে বিষ মিশিয়ে দেবে। এখানে আপনার মগজের একদিকে পাকা জ্ঞান ল্যাবরেটরিতে টেলিস্কোপ নিয়ে বসে আছে, আর ঠিক তার পাশের ঘরেই কাঁচা জ্ঞান ধূপকাঠি জ্বালিয়ে বসে বলছে— "বাপু হে, অত বিজ্ঞান দেখিও না, ওসব রাহু-কেতুর ব্যাপার স্যাপার আলাদা!"

ভয় হলো এই কাঁচা জ্ঞানের প্রধান অস্ত্র। প্রাচীনকালে মানুষ বজ্রপাত দেখে ভয় পেত, ভাবত দেবরাজ রুষ্ট হয়েছেন। এখন মানুষ বজ্রপাত দেখে ভয় পায় ঠিকই, কিন্তু সেটার কারণ হিসেবে 'পজিটিভ-নেগেটিভ চার্জ' বুঝে নিয়ে বাড়িতে একটা আর্থিং-এর ব্যবস্থা করে ফেলে। ভয়টা তখন আর অন্ধ থাকে না, একটু 'এনলাইটেনড' বা আলোকপ্রাপ্ত হয়।

আসলে আমরা যারা নিজেদের খুব আধুনিক ভাবি, আমাদের মগজটাও অনেকটা পুরনো আমলের মেসবাড়ির মতো। যেখানে আদিম সংস্কারের ভাড়াটে আর আধুনিক যুক্তিবাদী মালিকের মধ্যে সারাদিন ঝগড়া চলছে। যারা এই ভাড়াটেকে বিদায় দিয়ে নিজের ঘরটা পুরোপুরি সাফ করতে পেরেছেন, তারাই আসলে 'বিজ্ঞ'। আর যারা পারছেন না, তারা ওই ভয়ের পুরনো চাদর গায়ে দিয়ে যুগের পর যুগ কাটিয়ে দিচ্ছেন।

আমাদের সম্মিলিত প্রগতির গাড়িটা যে মাঝে মাঝে হেঁচকি তোলে, তার কারণ একটাই— ড্রাইভারের আসনে হয়তো পাকা জ্ঞান বসে আছে, কিন্তু পেছনের সিটে বসে কাঁচা জ্ঞান বারবার বলছে, "পেছন থেকে কেউ হাঁচল কেন? যাত্রা অশুভ হবে না তো?"

এই 'হাঁচি' আর 'কাঁচি'-র লড়াই যেদিন শেষ হবে, সেদিনই হয়তো মানুষ সত্যিকার অর্থে অভিন্ন গতিতে এগিয়ে যাবে। ততক্ষণ পর্যন্ত মগজের এই জবরদখল চলুক, আমরা নাহয় দূর থেকে দাঁড়িয়ে একটু হাসি!

ব্লগার- রবীন মজুমদার 
তারিখ - ১৯/০৩/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 











মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)