৪৩৭ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে -(৩০)
১৮৮৫ সালে বিদেশ থেকে শিষ্যদের উদ্দেশ্য পাঠানো পত্রের ভাবার্থের অনুসরণে-
১৮৮৫ সাল। চিঠিটির তারিখ ও স্থান সেখানে উল্লেখিত নেই। শুধু কয়েকটি কথা, কয়েকটি ভাব, যেন সময়ের স্রোত পেরিয়ে এসে আমাদের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। কথাগুলি পড়তে পড়তে মনে হওয়া স্বাভাবিক—একজন মানুষ চলে যাওয়ার পরও তাঁর সবচেয়ে বড় উপস্থিতি কি তাঁর নামের মধ্যে থাকে, না তাঁর তৈরি করে যাওয়া মানুষগুলির মধ্যে?
প্রশ্নটা সহজ নয়।
কারণ মানুষ চলে যাওয়া মানে অস্তিত্বের অস্তিত্বহীনতা মাত্র। তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত থাকে। স্বামীজী যেন সেই জায়গাটাতেই হাত রেখেছিলেন।
আদর্শ যদি একটি পতাকা হয়, তবে তাকে শুধু নেতার হাতে থাকলে চলবে কেন? নেতা তো চিরকাল থাকবেন না। একদিন তাঁকে চলে যেতেই হবে। তখন পতাকাটি কে বহন করবে? সেই উত্তরাধিকার যদি আগে থেকে মানুষের ভিতরে তৈরি না হয়, তবে পতাকা একসময় কেবল কাপড় হয়ে যায়—দণ্ড থাকে, রং থাকে, কিন্তু তার মধ্যে আর কোনো হাওয়া থাকে না।
স্বামীজীর চিন্তার ভিতরে তাই একটা অদ্ভুত তাড়া ছিল—মানুষ চাই। শুধু ভক্ত নয়, মানুষ। শুধু অনুসারী নয়, মানুষ।
শুধু তাঁর নাম উচ্চারণ করবে এমন মানুষ নয়—তাঁর অনুপস্থিতিতেও তাঁর আদর্শকে নিজের জীবনে বহন করতে পারবে এমন মানুষ।
মস্ত কঠিন কাজ এই মানুষ তৈরি। একটি মন্দির বানানো যায়, একটি প্রতিষ্ঠান গড়া যায়, কিন্তু মনোমন্দির তৈয়ারি সহজে হয় না।
অন্তরে অন্তর মিলালে তার অন্তরের পরিচয়। কোথায় তার দুর্বলতা তাকে চিনতে হয়। জীবন থাকবে, কিন্তু জীবনের গ্লানি থাকবে না।
সুখ আসবে, কিন্তু সুখ তোমাকে উন্মত্ত করবে না। দুঃখ আসবে, কিন্তু দুঃখ তোমাকে ভেঙে ফেলবে না। আনন্দ আসবে, কিন্তু আনন্দে তুমি নিজের অস্তিত্ব হারাবে না। তৃষ্ণা আসবে, কিন্তু তৃষ্ণা তোমাকে তার দাস বানাতে পারবে না।
তখনই হয়তো মানুষ প্রথমবার বুঝতে পারে—মুক্তি মানে জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়। মুক্তি মানে জীবনের মধ্যেই দাঁড়িয়ে জীবনকে অতিক্রম করা। ভারতীয় দর্শন যার নাম দিয়েছে—জীবন্মুক্তি।
জীবন আছে, অথচ সেখানে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হচ্ছে না। সংসার আছে, অথচ সংসার জীবনের সাথে অন্তরের সম্পর্ক স্থাপিত হচ্ছে না।
এই কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে স্বামীজীর অস্ত্র ছিল—সেবা। মানুষের কাছে যাও। তার সুখ-দুঃখের, তার ক্ষুধার যন্ত্রণাকে উপলদ্ধি কর। তার শিক্ষার অস্পুর্ণতাকে ভরিয়ে দাও। তার মান-অপমানের সমব্যাথী হও। তবেই তো মন্দির হয়ে উঠবে ধর্মের পীঠস্থান নচেৎ পুরোটাই ফাঁকা।
স্বামীজীর কাছে ধর্ম তাই খুব জটিল কোনো তত্ত্ব ছিল না। যে মানুষের দুঃখ অনুভব করতে পারে, যে দুঃখের কারণ বুঝতে চায়, যে অন্য মানুষকে সেই দুঃখ থেকে মুক্তির পথ দেখাতে পারে—ধর্ম তার মধ্যেই জীবন্ত। বাকি সব? অন্তঃসার শূন্য কতগুলি ফাঁকা বুলি মাত্র।
তাই শিক্ষা মানে কেবল জ্ঞান দেওয়া নয়। শিক্ষা মানে মানুষের ভিতর থেকে ভয়টাকে সরিয়ে দেওয়া।
স্বামীজী যখন পাশ্চাত্যের মানুষের কথা বলেছিলেন, তখন তাঁর চোখে হয়তো এই শক্তিটিই ধরা পড়েছিল। কাজের সময় তারা নিজেদের ব্যক্তিগত অহংকারকে সরিয়ে রেখে একসঙ্গে কাজ করতে পারে। একজন নেতৃত্ব দেয়, অন্যরা সেই নেতৃত্বকে কাজে পরিণত করে। ব্যক্তিগত স্বার্থ তখন বৃহত্তর কাজের সামনে ছোট হয়ে যায়। সেই জন্যই তারা বড়।
কিন্তু অর্থের প্রশ্নে আবার তাদের মধ্যে অন্য এক মানুষকে দেখা যায়। অর্থের জায়গায় তারা অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক। সেখানে উদারতার দরজা অনেক সময় বন্ধ থাকে। অর্থাৎ কোনো মানুষই সম্পূর্ণ নয়। কোনো জাতিই সম্পূর্ণ নয়। কোনো সভ্যতাই সম্পূর্ণ নয়।
শিক্ষার কাজ হল—যেখানে শক্তি আছে, তা গ্রহণ করা; যেখানে দুর্বলতা আছে, তা অতিক্রম করা। আর সেই শিক্ষার শেষ ফল কী? লোকশিক্ষা। মানুষের কাছ থেকে পাওয়া জিনিস মানুষকেই ফিরিয়ে দেওয়া।
একজন মানুষ যতটুকু শিখেছে, যতটুকু পেয়েছে, তার সবটাই তো তার নিজের নয়। তার মধ্যে মিশে আছে সমাজের শ্রম, পূর্বপুরুষের অভিজ্ঞতা, শিক্ষকের জ্ঞান, অগণিত মানুষের অদৃশ্য অবদান।
একমুঠো অন্নের পিছনে অনেক মানুষের অবদান আছে। সেটা একা গ্রহণ করলে চলবে না, তাহলে এতো মানুষের কাছে তুমি ঋণ মুক্ত হতে পারবে না। আর এই ঋণ শোধ করার নামই লোকশিক্ষা।
আর এখানেই শিক্ষকেরও পরীক্ষা।
শিক্ষকের কাপড় পরলেই শিক্ষক হওয়া যায় না। বক্তৃতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে কয়েকটি বড় বড় কথা বললেই মানুষ শিক্ষিত হয় না। যে শিক্ষা মানুষের ভিতরে সাহস জাগাতে পারে না, যে শিক্ষা তাকে অন্যের দুঃখের দিকে তাকাতে শেখায় না, যে শিক্ষা তাকে নিজের সীমাবদ্ধতার বাইরে নিয়ে যেতে পারে না—সে শিক্ষা কেবল শব্দের অলঙ্কার।
শিক্ষক তখন শিক্ষক নন। তিনি কেবল শব্দের ব্যবসায়ী। মানুষকে নিজের দিকে টেনে নিও না, তাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখাও। গুরুর ছায়ায় সারাজীবন বসে থাকা শিষ্য নয়। গুরুর আলো নিজের মধ্যে নিয়ে অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাওয়া মানুষ চাই।
কারণ গুরু যদি সত্যিই গুরু হন, তবে তিনি নিজের ভক্তের সংখ্যা বাড়াতে চান না; তিনি চান তাঁর পরে আরও কিছু স্বাধীন মানুষ জন্ম নিক। সেই মানুষরা হয়তো তাঁর নামও নেবে না। তাঁর ছবি ঘরে রাখবে না। তাঁর নামে কোনো মিছিলেও হাঁটবে না। কিন্তু একদিন কোনো ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াবে। কোনো ভীত মানুষের কাঁধে হাত রাখবে। কোনো হতাশ মানুষকে বলবে—“ভয় পেয়ো না।”কোনো অশিক্ষিত শিশুর হাতে বই তুলে দেবে। কোনো অপমানিত মানুষকে তার নিজের মর্যাদা ফিরে পেতে সাহায্য করবে।
আর মানুষ চাই , যে জীবনের মধ্যেই থেকেও জীবনের দাস নয়। যে নিজের মুক্তির সঙ্গে অন্যের মুক্তিকেও এক করে দেখতে শেখে। যে গুরুর নামকে নয়, গুরুর আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখে।
সম্ভবত এই মানুষটির সন্ধানেই স্বামীজীর সমস্ত সাধনা।
চলবে -
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন