৪৩৯ মুকুলের ফিরে দেখা
মুকুল একান্ত অবহেলায় পালিত একটি আম গাছের চারা যে আগামীর স্বপ্নে বিভোর। আমার এই "মুকুল" নামটা ওই মাতৃহারা পাঁচবছরে ছেলে আকাশের দেওয়া। এক সন্ধ্যায় মুকুল তার জীবনের অতীতের স্মৃতির দরজায় হাত লেগে বেজে উঠল। তারপর সবকিছু একদম চুপচাপ।
মুকুল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। বাতাসের কথাগুলো তার ছোট্ট পাতাগুলোর মধ্যে যেন মৃদু শিহরণ তুলেছিল। সে আকাশকে প্রতিদিন জানালার ধারে বসে থাকতে দেখেছে। দেখেছে তার দুটি পা দীর্ঘদিন ধরে অসাড়, অথচ চোখ দুটি কত দূরে চলে যায়।, সেই দিগন্ত রেখার কিংবা তাকে অতিক্রম করে কোন এক অজানা মহাশুন্যে।
বাতাস হেসে উঠল। তার হাসিতে পাতাগুলো একসঙ্গে দুলে উঠল।
—“তুই এখনও ছোট, মুকুল। তাই ভাবছিস মানুষের শক্তি শুধু তার পায়ের মধ্যে। পা মানুষকে পথ দেখায় না, মন পথের সন্ধান করে। চোখ মানুষকে দৃশ্য দেখায়, কিন্তু মন তাকে অর্থ দেয়। হাত দিয়ে মানুষ ঘর বানায়, কিন্তু স্বপ্ন দিয়ে সে সভ্যতা গড়ে।”
মুকুল কিছুক্ষণ নিশ্চুপ।
মুকুলের মনে হলো, কথাগুলো যেন শুধু আকাশের জন্য নয়, তার নিজের জন্যও।
সেদিন সন্ধ্যায় আকাশ জানালার ধারে এসে বসেছিল। পশ্চিম আকাশে সূর্য তখন অস্ত যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মুকুলের পাতায় শেষ আলো এসে পড়েছে।
তার বাবা বাইরে থেকে ফিরে এসে দেখলেন, ছেলে আগের মতোই জানালার ধারে বসে আছে। কাকিমাও দেখলেন, তার চলাফেরার মধ্যে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। রামুকাকা প্রতিদিনের মতো বাগানে জল দিচ্ছে, আগাছা পরিষ্কার করছে।
শুধু মুকুল বুঝতে পারল—আকাশ বদলেছে। আগে সে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকত। এখন সে জানালার বাইরে দেখতে শুরু করল। এই তাকানো আর দেখার মধ্যে বিস্তর ফারাক, সেটা মুকুলের বোধগম্যের বাইরে নয়।
আগে আকাশ ভাবত—সে অন্যদের মতো নয়।
কিন্তু মুকুল জানত, এটা শুধু প্রশ্ন করার অভ্যাস নয়। আকাশ এখন নিজের ভিতরটাকে খুঁজছে।
সে বই পড়তে শুরু করল। ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য—যা সামনে পায় তাই। তার ঘর ধীরে ধীরে বইয়ে ভরে উঠল। যে জানালার ধারে একদিন সে শুধু বাইরের পৃথিবীকে দেখত, সেই জানালার ধারে এখন বই খুলে বসে সে পৃথিবীকে নিজের ভিতরে আত্মস্থ করতে লাগলো ।
যে মানুষ নিজের পায়ে এক পা এগোতে পারে না, তার মন মুহূর্তের মধ্যে পাড়ি দেয় পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।
আকাশ বইয়ের পাতায় হিমালয় দেখছে, সমুদ্র দেখছে, মরুভূমি দেখছে। বিজ্ঞানীদের আবিষ্কারের ভিতর দিয়ে অজানাকে চিনছে।
আকাশ বলল,
—“আমি এতদিন ভাবতাম, আমি হাঁটতে পারি না, তাই আমি অসম্পূর্ণ। এখন বুঝেছি, আমার পা হয়তো আমাকে বহন করতে পারে না, কিন্তু আমার মন আমাকে বহন করতে পারে। আর মন যদি থেমে যায়, তবে সুস্থ শরীরের মানুষও আসলে পঙ্গু।”
এই কথাটা শুনে মুকুলের মনে হলো, বাতাস সেদিন যা বলেছিল, আকাশ নিজের ভাষায় সেই কথাই বুঝে নিয়েছে।
একটি পাখি কীভাবে উড়ে যায়—এই দৃশ্য তার কাছে শুধু উড়ে যাওয়ার দৃশ্য ছিল না। সেটি ছিল স্বাধীনতার প্রতীক।
একটি গাছ কীভাবে ঝড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে—সেটি তার কাছে শুধু প্রকৃতির ঘটনা ছিল না। সেটি ছিল অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম।
একটি বীজ কীভাবে মাটির অন্ধকার ভেদ করে আলোয় উঠে আসে—সেটি তার কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় দর্শন।
আর একটি মানুষ কীভাবে নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে—সেটিই হয়ে উঠল তার জীবনের প্রধান প্রশ্ন। তার লেখা ধীরে ধীরে অন্য মানুষের কাছে পৌঁছাতে লাগল। একদিন দূরের একটি কলেজ থেকে তাকে বক্তৃতা দিতে আমন্ত্রণ জানানো হলো।
একজন ছাত্র শেষে বলেছিল,
—“স্যার, আপনার সঙ্গে কথা বলে মনে হচ্ছে, আমরা এতদিন সুস্থ শরীর নিয়েও খুব অসুস্থভাবে বেঁচে ছিলাম।”
তারপর বলল,
—“না মুকুল, কথাটা একটু অন্যভাবে বল। দেহকে অস্বীকার করে মন বড় হয় না। দেহের সীমাকে মেনে নিয়ে মন যখন তার ভিতরকার সম্ভাবনাকে আবিষ্কার করে, তখনই মানুষ বড় হয়।”
বছর কয়েক পরে মুকুল সত্যিই বড় হয়ে উঠল।
তার ডালে ডালে পাখি বসতে লাগল। কাঠবেড়ালিরা ছুটে বেড়াতে লাগল। মৌমাছিরা এসে চাক বাঁধল। বসন্তে তার সমস্ত শরীর ফুলে ফুলে ভরে উঠল।
সেদিন সন্ধ্যায় সূর্য ডুবে যাওয়ার সময় মুকুলের উপর সোনালি আলো পড়েছিল। কয়েকটি পাখি এসে তার ডালে বসেছিল। একটি কাঠবিড়ালি লেজ উঁচু করে এ ডাল থেকে ও ডালে ছুটে বেড়াচ্ছিল।
আকাশ চুপ করে তাদের দেখছিল।
তারপর ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল।
তার মনে হলো, সে হাঁটছে।
একটি দীর্ঘ পথ।
পথের দুপাশে পাহাড়।
দূরে নদী।
তার ওপারে অজানা কোনো দেশ।
সে হাঁটছে।
কেউ তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে না।
কোনো হুইলচেয়ার নেই।
কোনো সহানুভূতি নেই।
কেউ তাকে দুর্বল বলছে না।
সে একা।
কিন্তু একা নয়।
তার সঙ্গে তার মন।
তার সঙ্গে তার স্বপ্ন।
তার সঙ্গে তার সমস্ত অসম্ভবকে সম্ভব করার ইচ্ছা।
হঠাৎ সে শুনতে পেল, মুকুলের পাতাগুলো কাঁপছে।
বাতাস যেন বলছে—
“দেহের যে দরজা বন্ধ, মন তার জানালা খুলে দেয়।”
আকাশ চোখ খুলল।
জানালার বাইরে তখন অসংখ্য তারা।
সে মৃদু হেসে বলল,
—“আমি বুঝেছি।”
মুকুল শুনল।
আকাশ বলল,
—“মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি সে কতটা দূর হাঁটতে পারে, তা নয়। সে কতটা দূর ভাবতে পারে—সেটাই তার আসল শক্তি।”
সেই রাতে মুকুল প্রথমবার বুঝল—
সে আর আকাশের বন্ধু মাত্র নয়।
আকাশ তারও শিক্ষক হয়ে উঠেছে।
আর দোতলার সেই জানালাটি?
সেটি আর কোনো বন্দিত্বের জানালা নয়।
সেটি হয়ে উঠেছে এক অসীম পৃথিবীর দরজা।
যে দরজার ওপারে দেহের কোনো সীমা নেই।
আছে শুধু মন।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন