সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

৪৩৯ মুকুলের ফিরে দেখা

৪৩৯ মুকুলের ফিরে দেখা 


মুকুল একান্ত অবহেলায় পালিত একটি আম গাছের চারা যে আগামীর স্বপ্নে বিভোর।  আমার এই "মুকুল" নামটা ওই মাতৃহারা পাঁচবছরে ছেলে আকাশের দেওয়া।  এক সন্ধ্যায় মুকুল তার জীবনের অতীতের স্মৃতির দরজায়  হাত লেগে বেজে উঠল। তারপর সবকিছু একদম চুপচাপ। 

বাতাসের সাথে বড্ড ভাব মুকুলের। তার জীবনের সবকিছুকে শুধু বাতাস আর আকাশের সাথে অকপটে ব্যক্ত করে। 

মুকুল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। বাতাসের কথাগুলো তার ছোট্ট পাতাগুলোর মধ্যে যেন মৃদু শিহরণ তুলেছিল। সে আকাশকে প্রতিদিন জানালার ধারে বসে থাকতে দেখেছে। দেখেছে তার দুটি পা  দীর্ঘদিন ধরে অসাড়,  অথচ চোখ দুটি কত দূরে চলে যায়।, সেই দিগন্ত রেখার কিংবা তাকে অতিক্রম করে কোন এক অজানা মহাশুন্যে। 

মুকুল বলল,
—“কিন্তু মন দিয়ে মানুষ কী করতে পারে? সে তো হাঁটতে পারে না, দৌড়তে পারে না, অন্যদের মতো মাঠে গিয়ে খেলতে পারে না।”

বাতাস হেসে উঠল। তার হাসিতে পাতাগুলো একসঙ্গে দুলে উঠল।

—“তুই এখনও ছোট, মুকুল। তাই ভাবছিস মানুষের শক্তি শুধু তার পায়ের মধ্যে। পা মানুষকে পথ দেখায় না, মন পথের সন্ধান করে। চোখ মানুষকে দৃশ্য দেখায়, কিন্তু মন তাকে অর্থ দেয়। হাত দিয়ে মানুষ ঘর বানায়, কিন্তু স্বপ্ন দিয়ে সে সভ্যতা গড়ে।”

মুকুল কিছুক্ষণ নিশ্চুপ।

বাতাস আবার বলল,
—“দেহের ক্ষমতা সীমিত। মন যদি নিজেকে চিনতে পারে, তার সীমা অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। যে মানুষ নিজের অক্ষমতাকে নিজের পরিচয় বানিয়ে ফেলে, সে তার দেহের চেয়েও ছোট হয়ে যায়। আর যে মানুষ তার অক্ষমতাকে অতিক্রম করে নিজের শক্তিকে চিনতে শেখে, সে দেহের সীমার ভিতর থেকেও সীমাহীন হয়ে উঠতে পারে।”

মুকুলের মনে হলো, কথাগুলো যেন শুধু আকাশের জন্য নয়, তার নিজের জন্যও।

সেদিন সন্ধ্যায় আকাশ জানালার ধারে এসে বসেছিল। পশ্চিম আকাশে সূর্য তখন অস্ত যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মুকুলের পাতায় শেষ আলো এসে পড়েছে।

আকাশ বলল,
—“মুকুল, আজ তোকে খুব সুন্দর লাগছে।” 
মুকুলের ইচ্ছে হলো হেসে উঠতে। কিন্তু গাছের হাসি মানুষের মতো শোনা যায় না। তার হাসি শুধু পাতার মর্মরে প্রকাশ পায়।

আকাশ বলল,
—“জানিস, ছোটবেলায় আমি ভাবতাম তুই একদিন আমার চেয়ে অনেক বড় হয়ে যাবি। তখন আমি তোকে দেখতে জানালার ধারে বসে থাকব, আর তুই আমাকে ছায়া দিবি।”

মুকুল মনে মনে বলল,
“তুই ভুল ভাবছিস আকাশ। একদিন তুই এত বড় হবি যে, আমিই তোর ছায়ায় আশ্রয় চাইব।”

কিন্তু সে কথা আকাশ শুনতে পেল না।
তারপর থেকে আকাশের মধ্যে যেন অদ্ভুত একটা পরিবর্তন দেখা দিতে লাগল। পরিবর্তনটা প্রথমে কেউ বুঝতে পারেনি।

তার বাবা বাইরে থেকে ফিরে এসে দেখলেন, ছেলে আগের মতোই জানালার ধারে বসে আছে। কাকিমাও দেখলেন, তার চলাফেরার মধ্যে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। রামুকাকা প্রতিদিনের মতো বাগানে জল দিচ্ছে, আগাছা পরিষ্কার করছে।

শুধু মুকুল বুঝতে পারল—আকাশ বদলেছে। আগে সে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকত। এখন সে জানালার বাইরে দেখতে শুরু করল। এই তাকানো আর দেখার মধ্যে বিস্তর  ফারাক, সেটা মুকুলের বোধগম্যের বাইরে নয়। 

আগে আকাশ ভাবত—সে অন্যদের মতো নয়।

এখন সে ভাবতে শুরু করল—
“অন্যদের মতো হওয়া কি সত্যিই প্রয়োজন?”

আগে তার মনে প্রশ্ন ছিল—
“আমি কেন হাঁটতে পারি না?”

এখন প্রশ্ন হলো—
“আমি হাঁটতে না পারলেও কী কী করতে পারি?”
এই একটি প্রশ্নই যেন তার জীবনের দরজা খুলে দিল। 
আকাশ পড়াশোনায় মন দিল। মাস্টারমশাই একদিন বিস্মিত হয়ে কাকিমাকে বললেন, —“আকাশের মধ্যে অসাধারণ স্মরণশক্তি আছে। শুধু পড়াশোনা নয়, যে কোনো বিষয় নিয়ে তার অনন্ত কৌতূহল ।”

কাকিমা মৃদু হেসে বললেন,
—“ও তো ছোট থেকেই এমন।”

কিন্তু মুকুল জানত, এটা শুধু প্রশ্ন করার অভ্যাস নয়। আকাশ এখন নিজের ভিতরটাকে খুঁজছে।

সে বই পড়তে শুরু করল। ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য—যা সামনে পায় তাই। তার ঘর ধীরে ধীরে বইয়ে ভরে উঠল। যে জানালার ধারে একদিন সে শুধু বাইরের পৃথিবীকে দেখত, সেই জানালার ধারে এখন বই খুলে বসে সে পৃথিবীকে নিজের ভিতরে আত্মস্থ করতে লাগলো ।

মুকুল বিস্মিত হয়ে ভাবত—
মানুষ কী আশ্চর্য!

যে মানুষ নিজের পায়ে এক পা এগোতে পারে না, তার মন মুহূর্তের মধ্যে পাড়ি দেয় পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।

আকাশ বইয়ের পাতায় হিমালয় দেখছে, সমুদ্র দেখছে, মরুভূমি দেখছে।  বিজ্ঞানীদের আবিষ্কারের ভিতর দিয়ে অজানাকে চিনছে।

তার শরীর জানালার ধারে।
কিন্তু তার মন?
সে তো তখন পৃথিবীর সমস্ত জানালা খুলে দিয়েছে।
একদিন আকাশ মুকুলকে বলল,
—“তুই জানিস, আমি একটা জিনিস বুঝেছি?”
মুকুল পাতাগুলো দুলিয়ে জানতে চাইল, কী?
—“মানুষের সবচেয়ে বড় কারাগার তার শরীর নয়। তার নিজের ধারণা।”
মুকুল চুপ করে রইল।

আকাশ বলল,

—“আমি এতদিন ভাবতাম, আমি হাঁটতে পারি না, তাই আমি অসম্পূর্ণ। এখন বুঝেছি, আমার পা হয়তো আমাকে বহন করতে পারে না, কিন্তু আমার মন আমাকে বহন করতে পারে। আর মন যদি থেমে যায়, তবে সুস্থ শরীরের মানুষও আসলে পঙ্গু।”

এই কথাটা শুনে মুকুলের মনে হলো, বাতাস সেদিন যা বলেছিল, আকাশ নিজের ভাষায় সেই কথাই বুঝে নিয়েছে।

দিন যেতে লাগল। আকাশ লেখালেখি শুরু করল। প্রথমে ছোট ছোট গল্প। তারপর প্রবন্ধ। তারপর মানুষের জীবন নিয়ে লেখা। তার লেখায় বারবার ফিরে আসত প্রকৃতি।

একটি পাখি কীভাবে উড়ে যায়—এই দৃশ্য তার কাছে শুধু উড়ে যাওয়ার দৃশ্য ছিল না। সেটি ছিল স্বাধীনতার প্রতীক।

একটি গাছ কীভাবে ঝড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে—সেটি তার কাছে শুধু প্রকৃতির ঘটনা ছিল না। সেটি ছিল অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম।

একটি বীজ কীভাবে মাটির অন্ধকার ভেদ করে আলোয় উঠে আসে—সেটি তার কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় দর্শন।

আর একটি মানুষ কীভাবে নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে—সেটিই হয়ে উঠল তার জীবনের প্রধান প্রশ্ন। তার লেখা ধীরে ধীরে অন্য মানুষের কাছে পৌঁছাতে লাগল। একদিন দূরের একটি কলেজ থেকে তাকে বক্তৃতা দিতে আমন্ত্রণ জানানো হলো।

কাকিমা অবাক। বাবা প্রথমবারের মতো ছেলের দিকে নতুন চোখে তাকালেন। আকাশ মৃদু হেসে বলল, —“আমি তো যেতে পারব না।”
কাকিমার মুখটা মলিন হয়ে গেল। 
কিন্তু আকাশ বলল, 
—“আমি যেতে না পারলে ওরা আসবে।” সেদিন সত্যিই কয়েকজন ছাত্র তার বাড়িতে এল। দোতলার সেই বিশাল জানালার ধারে বসেই আকাশ তাদের সঙ্গে কথা বলল। কথা বলতে বলতে কখন যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেল, কেউ বুঝতে পারল না।

একজন ছাত্র শেষে বলেছিল,

—“স্যার, আপনার সঙ্গে কথা বলে মনে হচ্ছে, আমরা এতদিন সুস্থ শরীর নিয়েও খুব অসুস্থভাবে বেঁচে ছিলাম।”

আকাশ কিছু বলল না। 
তার চোখ চলে গেল মুকুলের দিকে। মুকুলের পাতাগুলো তখন সন্ধ্যার বাতাসে মৃদু দুলছে।
সেদিন রাতে মুকুল বাতাসকে বলল, 
—“তুমি ঠিকই বলেছিলে।” 
বাতাস বলল, 
—“কী বলেছিলাম?”
—“দেহ নয়, মনই জীবনের পরিচালক।” 
বাতাস কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—“না মুকুল, কথাটা একটু অন্যভাবে বল। দেহকে অস্বীকার করে মন বড় হয় না। দেহের সীমাকে মেনে নিয়ে মন যখন তার ভিতরকার সম্ভাবনাকে আবিষ্কার করে, তখনই মানুষ বড় হয়।”

মুকুল বলল,
—“তাহলে আকাশ বড় হয়েছে?”
বাতাস হাসল।
—“না। আকাশ এখনও বড় হচ্ছে। মানুষ যতদিন নিজের ভিতরের সম্ভাবনাকে আবিষ্কার করতে থাকে, ততদিন তার বড় হয়ে ওঠার শেষ নেই।”

বছর কয়েক পরে মুকুল সত্যিই বড় হয়ে উঠল।

তার ডালে ডালে পাখি বসতে লাগল। কাঠবেড়ালিরা ছুটে বেড়াতে লাগল। মৌমাছিরা এসে চাক বাঁধল। বসন্তে তার সমস্ত শরীর ফুলে ফুলে ভরে উঠল।

একদিন আকাশ জানালার ধারে বসে বলল, 
—“মুকুল, তোর স্বপ্নগুলো তো সব সত্যি হয়ে গেল।” 
মুকুল মনে মনে উত্তর দিল, 
“তোর স্বপ্ন?” 
আকাশের চোখে তখন অদ্ভুত এক আলো। 
সে বলল, 
—“আমার স্বপ্ন এখনও শেষ হয়নি।” 
—“কী স্বপ্ন?” 
আকাশ জানালার বাইরে তাকাল।
—“যে মানুষ নিজেকে দুর্বল ভাবে, তাকে নিজের শক্তিটা চিনিয়ে দেওয়া। যে মানুষ ভাবে সে পারবে না, তাকে একবার অন্তত চেষ্টা করতে শেখানো। আর যে মানুষ নিজের শরীরের কোনো সীমাবদ্ধতার কারণে নিজেকে ছোট ভাবে, তাকে বোঝানো—মানুষের মূল্য তার শরীর কত দূর যেতে পারে তাতে নয়; তার মন কত দূর দেখতে পারে, তার উপর।”
মুকুলের সমস্ত পাতা যেন একসঙ্গে কেঁপে উঠল।
সে বুঝল, আকাশ এখন আর সেই ছোট্ট ছেলেটি নেই যে জানালার ধারে বসে তার সঙ্গে কথা বলত।
সে এখন নিজেই একটি আকাশ। 
যে আকাশের কোনো পা নেই, অথচ তার কোনো পথের শেষ নেই।

সেদিন সন্ধ্যায় সূর্য ডুবে যাওয়ার সময় মুকুলের উপর সোনালি আলো পড়েছিল। কয়েকটি পাখি এসে তার ডালে বসেছিল। একটি কাঠবিড়ালি লেজ উঁচু করে এ ডাল থেকে ও ডালে ছুটে বেড়াচ্ছিল।

আকাশ চুপ করে তাদের দেখছিল।

তারপর ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল।

তার মনে হলো, সে হাঁটছে।

একটি দীর্ঘ পথ।

পথের দুপাশে পাহাড়।

দূরে নদী।

তার ওপারে অজানা কোনো দেশ।

সে হাঁটছে।

কেউ তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে না।

কোনো হুইলচেয়ার নেই।

কোনো সহানুভূতি নেই।

কেউ তাকে দুর্বল বলছে না।

সে একা।

কিন্তু একা নয়।

তার সঙ্গে তার মন।

তার সঙ্গে তার স্বপ্ন।

তার সঙ্গে তার সমস্ত অসম্ভবকে সম্ভব করার ইচ্ছা।

হঠাৎ সে শুনতে পেল, মুকুলের পাতাগুলো কাঁপছে।

বাতাস যেন বলছে—

“দেহের যে দরজা বন্ধ, মন তার জানালা খুলে দেয়।”

আকাশ চোখ খুলল।

জানালার বাইরে তখন অসংখ্য তারা।

সে মৃদু হেসে বলল,

—“আমি বুঝেছি।”

মুকুল শুনল।

আকাশ বলল,

—“মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি সে কতটা দূর হাঁটতে পারে, তা নয়। সে কতটা দূর ভাবতে পারে—সেটাই তার আসল শক্তি।”

সেই রাতে মুকুল প্রথমবার বুঝল—

সে আর আকাশের বন্ধু মাত্র নয়।

আকাশ তারও শিক্ষক হয়ে উঠেছে।

আর দোতলার সেই জানালাটি?

সেটি আর কোনো বন্দিত্বের জানালা নয়।

সেটি হয়ে উঠেছে এক অসীম পৃথিবীর দরজা।

যে দরজার ওপারে দেহের কোনো সীমা নেই।

আছে শুধু মন।

আর সেই মনের আকাশ—
যত দূর বিস্তৃত, মানুষের পৃথিবীও তত দূর।

লেখনীতে -রবীন মজুমদার 
তারিখ ২৫/০৮/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 

কোন মন্তব্য নেই:

ujaan

৪৩৯ মুকুলের ফিরে দেখা

৪৩৯ মুকুলের ফিরে দেখা  মুকুল একান্ত অবহেলায় পালিত একটি আম গাছের চারা যে আগামীর স্বপ্নে বিভোর।  আমার এই "মুকুল" নামটা ওই মাতৃহারা প...