৪৩৮ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে -(৩১)
১৭ই ফেব্রুয়ারী,১৮৯৫ সালে বিদেশ থেকে শিষ্যদের উদ্দেশ্য পাঠানো পত্রের ভাবার্থের অনুসরণে-
সময় বড্ড কম, কিন্তু কাজ যেন অন্তহীন। কাজকে ফেলে রাখাও সম্ভব নয়। সময় আর কাজের অনুপাতে সময় কম। স্বামীজী তার বিশ্রামের সময়টাকে বিলম্বিত করে, সেই সময়টা কাজের জন্য ব্যয় করছেন। দীর্ঘ দিনের এই অভ্যাসের দরুণ দেহ তার পুঞ্জিত প্রাপ্য সেই বিশ্রামকে ফিরে পেতে চায়। স্বামীজী সে ডাকে যথাপোযুক্ত সাড়া না দেওয়ায় দেহ আজ বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে।
কিন্তু স্বামীজীর সামনে থামার কোন অবকাশ নেই। যে কোন মহান কাজের অগ্রগতির পথের মধ্যে বিছানো থাকে, কণ্টক। লক্ষ্যের সাথে পাল্লা দিয়ে তার দুর্গমতা বৃদ্ধি পায়।
স্বামীজীর লক্ষ্য তো কোন ভৌগলিক সীমানায় কিংবা কোন সম্প্রদায় বা কোন বিশেষ ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। স্বামীজীর কাজ সমগ্র বিশ্ব জুড়ে আর সেই কাজকে বাস্তবায়িত করতে গেলে যে উপযুক্ত সময়ের প্রয়োজন, তার কাছে সেই সময়টুকু পর্যন্ত নেই।
মনে রাখতে হবে- স্বামীজীর বয়স তখন মাত্র ৩২ বছর এবং তার শরীর চলে গিয়েছিলো মাত্র ৩৯ বছর বয়সে।
জড় সভ্যতার অবগুন্ঠনে ঢাকা এই পাশ্চাত্য সমাজ শান্তির জন্য লালায়িত। তাদের কাছে সব আছে শুধু শান্তিই নেই। ঘরের আয়তন যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু তার সাথে পাল্লা দিয়ে মনের বিশালতাকে কমিয়ে দিয়েছে।
আর ভারতবর্ষের প্রাচীন সাধনার গভীরে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন সেই শান্তির বীজ। ভারতীয় সংস্কৃতির অন্তঃসলিলায় যে আত্মবোধ, যে সংযম, যে নির্ভয়তা, যে বিশ্বমানবতার কথা যুগ যুগ ধরে প্রবাহিত হয়েছে, স্বামীজীর সংকল্প ছিল সেই স্রোতকে কেবল ভারতের মাটিতে আবদ্ধ না রেখে বিশ্বমানবের দ্বারে পৌঁছে দেওয়া।
একদল সৈন্য ও আধুনিক অস্ত্র সম্ভার নিয়ে দেশ দখল করা যেমন সেই অর্থে খুবই সহজ কিন্তু তার থেকে বহুগুনে কঠিন কাজ সেই দেশের মানুষের মগজ দখল করা। তিনি অচিরেই আমেরিকান সভ্যতার একরকমের পীঠস্থান নিউইয়র্কে ও ইংল্যান্ডে এই কাজটিতে করতে অনেকখানি সমর্থ হয়েছেন কিন্তু বাকি রয়ে গেছে বহু।
ভারতীয় দর্শনের উপরের খোলসটা ছিল বড্ড কঠিন। সেখান থেকে নিস্কাশিত রস মানুষের পরিপাক যন্ত্রের পক্ষে উপযুক্ত নয় বলে দীর্ঘদিন সেটি সীমিত মানুষের মধ্যে ঘোরাফেরা করছিল। স্বামীজীর কাছে ভীষণ বড় যুদ্ধ ছিল, তাকে সাধারণ মানুষের মতো করে মূল বিষয়বস্তুকে অপরিবর্তিত রেখে সহজ পাচনযোগ্য করে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেবার।
দর্শন, জটিল পুরাণ আর মনবিজ্ঞানের কঠিন মোড়কের আড়ালে এতদিন আবদ্ধ যে ধর্ম ছিল, তাকে সেই বন্দিত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে, তার স্বাদ আল্হাদ বজায় রেখে একাধারে পন্ডিতদের এবং সেই সঙ্গে সাধারণ মানুষের বোধগম্য করার যে কঠিন কর্মটি নিজ স্কন্ধে স্বামীজী বহন করেছিলেন। তার উদেশ্য ছিল সাধারণ মানুষ তার অর্থ বুঝতে পারবে আর বুঝতে পারলে তার প্রতি ভালোবাসা জন্মাবে আর সেখান থেকে তার হৃদয়ে উত্তরণ হবে। এইভাবেই আগামী দিনে এক বেদান্তিক সমাজ গড়ে উঠবে।
মানুষের জীবনে দুটি ভয় -মৃত্যুর ও হেরে যাবার। বেদান্ত মানুষকে ভয় দূর করে সাহসী হতে শেখায়।
বনের বেদান্তকে ঘরের বেদান্তে উন্নীত করাই ছিল স্বামীজীর ব্রত।
এই যাত্রা পথে কার্য্য সম্পাদন করতে পারবেন, এই বিশ্বাস অর্জন করাটাই ছিল প্রাথমিক কাজ। তাই তিনি বলেন, "কর্মে আমাদের অধিকার, ফলে নহে। "
শিষ্যরা যদি পূর্ণমাত্রায় ত্যাগের ভাব ধারণা করতে না পারেন, তবে সেই শূন্যতাকে পূরণ করে দেবে ভোগ আর বাসনা, কেননা মনে কোন শূন্যতার কোন স্থান থাকেনা।
স্বামীজী দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন- " যে মিশনারিরা কামিনীকাঞ্চনের কোন ধার ধারে না। "
কথাটি কেবল একটি নৈতিক আদর্শের ঘোষণা ছিল না; তাঁর নিজের জীবনই ছিল তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ।
স্বামীজিকে উপলদ্ধি করে বিদেশের মানুষ তখন এক নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেল।
মানুষ এমনও হতে পারে?
যে পৃথিবীতে সাফল্যের মাপকাঠি সম্পদ, আরাম, ভোগ ও ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা পূরণ —সেই পৃথিবীর সামনে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ বলছেন, এসবের ঊর্ধ্বেও জীবন থাকতে পারে। একজন মানুষ নিজের ইচ্ছা, নিজের সুখ, নিজের ভোগের আকাঙ্ক্ষাকে সংযত করে বৃহত্তর মানুষের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে পারে।
এই দৃশ্য তাদের কাছে নতুন।
যার যা নেই, তার প্রতিই মানুষের আকর্ষণ বেশি। যে সভ্যতা ভোগের প্রাচুর্য পেয়েছে, সে ত্যাগের সৌন্দর্যকে নতুন চোখে দেখতে পারে। যে সমাজ সম্পদের মূল্য জানে, সে সম্পদকে অতিক্রম করে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষের দিকে বিস্ময়ে তাকায়।
স্বামীজীর জীবনে তারা সেই বিস্ময়েরই সাক্ষাৎ পেল।
তাঁর বক্তৃতা মানুষকে আকৃষ্ট করেছিল, কিন্তু তাঁর জীবন মানুষকে থামিয়ে দিয়েছিল।
তাঁর যুক্তি মানুষকে ভাবিয়েছিল, কিন্তু তাঁর ত্যাগ মানুষকে নত করেছিল।
তাঁর বেদান্ত মানুষকে জ্ঞান দিয়েছিল, কিন্তু তাঁর চরিত্র সেই জ্ঞানকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিল।
ক্রমে মানুষের ভিড় বাড়তে লাগল। কৌতূহল থেকে শ্রদ্ধা, শ্রদ্ধা থেকে বিশ্বাস, আর বিশ্বাস থেকে এক গভীর আকর্ষণ।
একজন ভারতীয় সন্ন্যাসী তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে কেবল ভারতের কোনো প্রাচীন দর্শনের কথা বলছিলেন না। তিনি যেন তাঁদের সামনে অন্য একটি জীবনের সম্ভাবনা খুলে দিচ্ছিলেন—যেখানে মানুষ ভোগের দাস নয়, ভয়-এর দাস নয়, নিজের ক্ষুদ্রতার দাস নয়।
যেখানে মানুষ নিজের ভিতরের শক্তিকে চিনতে পারে।
যেখানে ধর্ম কেবল মন্দিরে থাকে না, দর্শন কেবল পুঁথিতে থাকে না, আর বেদান্ত কেবল অরণ্যের নির্জন কুটিরে বসে শোনা কোনো দুর্বোধ্য মন্ত্র নয়।
বেদান্ত মানুষের জীবনে নামে।
ঘরের ভিতরে, কর্মক্ষেত্রে , দুঃখের মধ্যে , ভয়ের মধ্যে নামে। পরাজয়ের মুহূর্তে পাশে দাঁড়ায়। আর তখনই স্বামীজীর কর্মের প্রকৃত অর্থ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তিনি কেবল ভারতীয় দর্শনকে পশ্চিমে নিয়ে যাননি; তিনি ভারতীয় দর্শনের ভিতরের মানুষটিকে পশ্চিমের মানুষের সামনে দাঁড় করিয়েছিলেন।
কিন্তু এটুকু ইতিহাস ইতিমধ্যেই জানে—
একজন বত্রিশ বছরের সন্ন্যাসী পৃথিবীর কাছে এসে শুধু একটি দর্শনের কথা বলেননি; তিনি মানুষকে তার নিজের ভিতরের অসীমতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন।
আর সেই স্মরণই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় বিশ্বজয়।
চলবে -
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন