৪৩২ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -১৫তম পর্ব )
( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে উস্কে দেয় )
গত সংখ্যায় যা আছে --
অন্ধকার থেকে আলোর দিকে, অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানের দিকে, এবং শেষ পর্যন্ত নিজের ভিতরের মানুষটির কাছে ফিরে আসার দিকে।
১৫তম পর্বের শুরু -
অসহ্য কাঠফাটা রোদে গাছের পাতাগুলি আর আকাশের পানে চেয়ে থাকতে পারছেনা, শুধু সেই আশায় বেঁচে আছে একদিন বৃষ্টি তো আসবেই। আবার বর্ষার একঘেয়েমিতে ক্লান্ত হয়ে বৃক্ষ আবার আকাশের কাছে প্রার্থনা করবে, অনেক হয়েছে - দীর্ঘদিন সূর্য্যের মুখ দেখিনা। এটাই প্রকৃতির স্বাভাবিক দ্বান্দ্বিকতা। প্রকৃতিতে যখন দ্বান্দ্বিকতা আছে তখন মানুষের মধ্যে থাকবে না এতো হতে পারে না। এই দ্বান্দ্বিকতাই মহাভারতের ঐশ্বর্য্য।
মহাভারতে নৈতিকতা আছে কিন্তু সে নৈতিকতা ধূসর একটা আচ্ছাদনে ঢাকা। যুধিষ্ঠির মহাভারতে ধর্মরাজের তকমায় ভূষিত কিন্তু তিনি বাজি রেখে পাশা খেলায় অনাসক্তি নেই। এই 'আসক্ত' শব্দটি যদি কোন চরিত্রের সাথে মাখামাখি হয়ে যায়, মন কি সায় দেয় ধর্মরাজ বলতে ? আবার অহংকারের মতো একটা বলবান বস্তুকে আগলে রেখে কর্ণ কি করে দানবীর হয়ে উঠলেন - সেটাও প্রশ্নের উর্ধে নয়। সমালোচকগণ তো বলতেই পারেন, কর্ণ তার অহংকারকে তৃপ্ত করার জন্য স্থূল বস্তু দান করতেন আর সুক্ষ বস্তুকে আগলে রাখতেন।
মহাভারতে অন্ধত্বের তকমার অধিকারী অনেকেই ছিলেন। আক্ষরিক অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র পুত্রস্নেহে অন্ধ ছিলেন-তা বহু চর্চিত কিন্তু মহাবীর কর্ণও সাথী চিহ্নিত করতে গিয়ে বন্ধুত্বের কারণে অন্ধ ছিলেন। সত্যের অনুসরণকারী ভীষ্মের রাজপরিবারের প্রতি অন্ধ আনুগত্যের কারণে রাজসভায় প্রকাশ্যে অন্যায় সংগঠিত হওয়াতেও প্রতিবাদ করতে ভুলে গিয়েছিলেন। এটাও ঠিক এক আনুগত্যের প্রতি দাসত্ব কার্য্য হিসাবে এই মহাকাব্যের পাতায় উল্লেখিত কিন্তু মানসিক দ্বন্দ্বের অদৃশ্য কারণ হিসাবে ভীষ্ম ও কর্ণের হৃদয়ে স্পর্শ করেনি, সে কথা জোর করে বলা যাবে না, যা আমাদের অনুভবের আওতায় পরে। এটাই হচ্ছে জীবনের অপরিপুর্নতার এক পূর্ণাঙ্গ ছবি।
কি অসাধারণ মহাভারতের দর্শন। চৈতন্যহীন বস্তু, জগতে যে অসাড়, সেটা বোঝাতে কোন কষ্ট হয়নি। কুরুক্ষেত্রের মতো এই বিশাল যুদ্ধ, এতো মানুষের জীবনের আহুতিতে যজ্ঞ থেকে বিজয় উঠে এলো আর সঙ্গে নিয়ে এলো একরাশ শূন্যতা। নিঃশব্দে উচ্চারিত হলো ভারতীয় দর্শনের ভাবনা, সব ক্ষমতার অলিন্দে বসে আছে সেই জাগতিক ক্ষমতাই হলো চূড়ান্ত ক্ষমতা আর সেটাই হলো সময়।
এই জয় নিয়ে এলো এক অন্তহীন বৈরাগ্য আর অদ্বৈত দর্শনের গম্ভীর ভাবনার ইঙ্গিত। তাইতো মহাভারত হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের মনের অনন্ত জিজ্ঞাসা নিয়ে হেটে চলেছে নৈতিকতা থেকে মানুষের অস্তিত্বের কথা নিয়ে, মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে মানব মনের দ্বান্দ্বিকতার বৈশিষ্ট নিয়ে। এই অন্তহীন পথপরিক্রমা চলতেই থাকবে, সেটাই এই মহাকাব্যের মাধুর্য্য।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন