৪৩১ স্বামী বিবেকানন্দ ও ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলন
৪৩১ স্বামী বিবেকানন্দ ও ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলন
খুব নিরীহ একটি কথা -"তুমি দুর্ব্বল নও। " এই কথাতেই অর্ধেক পৃথিবীতে রাজত্ব করা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত কেঁপে উঠেছিল। স্মৃতির সত্যিকারের কিংবা ইচ্ছাকৃত ভ্রমে স্বাধীনতোত্তর দেশীয় রাজপুরুষেরা ব্রিটিশদের মতো যাঁর নাম উচ্চারণ করতে ভয় পায়, সেই স্বামী বিবেকানন্দই ছিল জাতির মেরুদন্ড গঠন করার কারিগর। এই কথাটি যে কতখানি সঠিক তার প্রমান দিয়েছে ১৯১৮ সালের Sedition Committee, যাকে Rowlatt Committee-ও বলা হয়, সেই কমিটির রিপোর্ট। কেন স্বামীজী আজ উপেক্ষিত, সেই প্রশ্নের উত্তরের খোঁজ সচেতন মানুষেরা খুঁজে নেবেন। সেই চর্চার পরে ঈশ্বর বা সত্যকে(সত্য ঈশ্বরের অপর নাম ) জানা না জানার দ্বায়িত্ব তাঁদের। প্রশ্ন কেউ তোলে, আবার কেউ করে।
সেদিন ছিল একদল পরাধীন মানুষ। যারা দীর্ঘদিনের শাসকের অত্যাচারে মানুষ হিসাবে সেই জাতিটা তাদের আত্মপরিচয়ের তকমাটা কোথায় যেন হারিয়ে ফেলে ছিল। জাতিকে এই আচ্ছন্নতা থেকে মুক্ত করার জন্য বহু মানুষ বহু পথ হাতড়ে বেরিয়েছেন কিন্তু সঠিক পথের দিশা কেউ খুঁজে পাননি।
"অন্তরে অন্তর মিশালে তবে তার অন্তরের পরিচয় "- হয়তো সবার সাথে পরাধীন ভারতের আপামর জনগনের হৃদয়ে সদাই বেজে ওঠা সুরটির অনুরণনটি সঠিক মননের অভাবে অপর মানুষের হৃদয়ে সঠিক ভাবে পৌঁছাতে পারেনি। কিন্তু স্বামী বিবেকানন্দ সেটা শুনতে পেয়েছিলেন। আর সেই পোড়া বাঁশির অর্থকে অনুধাবন করে তাঁর আগামীর গান - সে তো ইতিহাস।
হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালা সেই-ই হতে পারে, যাঁর সুরের সাথে শ্রোতার সুরের মেলবন্ধন ঘটে যায়। হৃদয়ে হৃদয় যে যোগ করতে পেরেছে সে তো হৃদয়ের রাজা হয়ে গেছেন। তিনি তো মানুষের আধ্যাত্মিক জগতের রাজা আর সেই রাজার রাজত্বের পতন যে হয় না, সেটা বুদ্ধিমান শাসকরা জানেন বলেই, তাকে আড়াল করার চেষ্টা।
গল্পটা এমনিই ছিল -
আজকের দৃষ্টিতে সেদিনের কলকাতাকে দেখলে চলবে না। শহরটা যেন আড়াআড়ি দুই ভাগ হয়ে গেছে। একদিকে সাহেবদের কলকাতা - চওড়া রাস্তা, ঘোড়ার গাড়ি, গ্যাসের আলোর রোশনাই, মৃদু মন্দ লয়ে বাজনার সাথে বলরুমে পানীয়র গ্লাস হাতে নিয়ে বিলেতি পোশাক পরে সাহেব-মেমদের নৃত্য। ঠিক তার পাশে সেই দেশি কলকাতার অলি-গলিগুলি আলোর অভাবে বিষাদহীন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কেরোসিনের টিমটিমে আলোতে ছাই সহযোগে এঁটোকাঁটায় বিদীর্ন কাঁসার থালা বাসন গুলিকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় ঘর্মাক্ত কলেবরে বাড়ির রমণীরা মাজছে আর ক্ষণে ক্ষনে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে। দেশটা শুধু হেরে যায়নি, দেশের মানুষগুলি যেন এক সেই জীবন যুদ্ধের পরাজিত সৈনিক।
ইংরেজরা শুধু ভারত শাসন করছেন না, ভারতীয়দের মনটাকে যেন পকেটে পুরে রেখেছে। আজকের মতো সোশ্যাল নেটওয়ার্ক ছিল না, কিন্তু ইংরেজরা আজকের মতো তাদের হোয়াটস্যাপ য়ুনিভার্সিটির মাধ্যমে মিথ্যা প্রচারে ভারতীয়দের জর্জরিত করে তুলেছিল যে, ভারতবর্ষ একটা প্রাচীন, কুসংস্কারাচ্ছন্ন অতি দুর্ব্বল জাতি। বারবার এই রেকর্ডটি বাজানোর ফলে একসময় ভারতীয়রা ভাবতে শুরু করেছিল সত্যিই তারা দুর্ব্বল জাতি।
এমন এক দোলাচলের সন্ধিক্ষণে উত্তর কলকাতায় এক তরুণ, যাঁর তন্ত্রিতে তন্ত্রিতে আত্মবিশ্বাসের ঝলক, দৃষ্টি যেন সদাই বিশেষ কিছুকে খুঁজে বেড়াচ্ছে , সেই চিরন্তন প্রশ্ন - ঈশ্বর কি আছেন ? আসলে, সত্য যে লুকিয়ে আছে ঈশ্বরের আড়ালে, তাকেই উন্মোচিত করে পরাধীন দেশবাসীর কাছে তুলে ধরতে হবে যে।
শুনেছেন দক্ষিনেশ্বরে এক পুরোহিত আছেন, যিনি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন। সেই উত্তরের তাড়নায় পদব্রজে বারবার তিনি ছুটে যাচ্ছেন সেই দক্ষিনেশ্বরের ব্রাহ্মণ পুরোহিত শ্রী রামকৃষ্ণের কাছে , তিনিই সেই দত্ত বাড়ির নরেন্দ্র নাথ। তারপরের ইতিহাস তো সবার জানা। শ্রী রামকৃষ্ণের 'মা' যে আসলে সেই পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ সেই ভারত মাতা ভিন্ন আর কেউ নয়। এখানেই দুয়ে দুয়ে চার হয়ে গেলো।
সেই দিনগুলিতে দরকার ছিল ভারতবর্ষের রাজনৈতিক স্বাধীনতার থেকে আরো বেশী প্রয়োজনীয় ছিল ব্রিটিশদের অহংকারের কারাগারে বন্দী ভারতীয়দের লুন্ঠিত আত্মপরিচয়কে আজাদ করার।
অবশেষে এলো সেই সুযোগ। আন্তর্জাতিক আঙিনায় ভারতবর্ষ ও তার প্রাচীন সংস্কৃতিকে তুলে নিয়ে আসবার মাহেন্দ্রক্ষণ। সময়টা ১৮৯৩ সালের শিকাগোর ধর্মসভার মঞ্চ।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা অসংখ্য বিপ্লবী, রাজনৈতিক নেতা এবং সংগ্রামীর নাম পাই, যাঁরা হাসিমুখে দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন। কিন্তু এই রাজনৈতিক বিপ্লবের অনেক আগে, ভারতের মাটিতে নিঃশব্দে এক অন্যরকম বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল। সেই বিপ্লব ছিল আত্মপরিচয় ফিরে পাওয়ার বিপ্লব, মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্তির বিপ্লব। আর এই মনস্তাত্ত্বিক মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত সেনাপতি ছিলেন কোনো রাজনৈতিক নেতা নন, বরং একজন গৈরিক বসনধারী সন্ন্যাসী— স্বামী বিবেকানন্দ।
স্বামীজি নিজে কোনো রাজনৈতিক দল গঠন করেননি, সরাসরি কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনেও অংশ নেননি। তবু ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অবদানকে ঐতিহাসিকরা অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে গণ্য করেন। কিন্তু কেন? কীভাবে একজন সন্ন্যাসী হয়ে উঠলেন বিপ্লবীদের পরম আরাধ্য?
'দুর্বলতাই মৃত্যু' – মনস্তাত্ত্বিকভাবে দাসত্বের অবসান
দীর্ঘ ব্রিটিশ শাসনে ভারতবাসী যখন সত্যিই বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে তারা একটি হীন, দুর্বল এবং অনুন্নত জাতি, ঠিক সেই চরম হতাশার মুহূর্তে স্বামীজি আবির্ভূত হলেন এক কালবৈশাখীর মতো। তিনি শিকাগো থেকে ফিরে এসে ভারতবাসীকে শোনালেন উপনিষদের সেই অমোঘ বাণী— "উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য বরান নিবোধত" (ওঠো, জাগো এবং লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত থেমো না)।
তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করলেন, "ভয় পেয়ো না, তুমি দুর্বল নও। দুর্বলতাই পাপ, দুর্বলতাই মৃত্যু।" তাঁর এই কথাগুলো কেবল আধ্যাত্মিক উপদেশ ছিল না; এটি ছিল পরাধীন, মেরুদণ্ডহীন এক জাতির ধমনীতে মৃতপ্রায় রক্তে নতুন শক্তির সঞ্চার। ব্রিটিশরা যে মনস্তাত্ত্বিক হীনমন্যতার বীজ বুনেছিল, স্বামীজি তা সমূলে উৎপাটন করেছিলেন।
বিপ্লবীদের গীতা: 'বর্তমান ভারত' ও 'কলম্বো থেকে আলমোড়া'
বিশ শতকের শুরুর দিকে ভারতের সশস্ত্র বিপ্লবীদের দিকে তাকালে একটি অবাক করা বিষয় চোখে পড়ে। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা বিপ্লবীদের এক হাতে থাকত শ্রীমদভগবদ্গীতা, আর অন্য হাতে থাকত স্বামী বিবেকানন্দের লেখা বই, বিশেষত 'কলম্বো থেকে আলমোড়া' এবং 'বর্তমান ভারত'।
বাঘা যতীন (যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়) তাঁর মন্ত্রগুপ্তি পেয়েছিলেন স্বামীজির আদর্শ থেকেই। স্বামীজি বলতেন, "লোহার মতো পেশী আর ইস্পাতের মতো স্নায়ু চাই।" বাঘা যতীন সেই আদর্শেই নিজের এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের জীবন গড়েছিলেন।
ঋষি অরবিন্দ স্পষ্ট বলেছিলেন, "বিবেকানন্দই আমাদের জাতীয় জীবনের রূপকার।"
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু স্বামীজিকে তাঁর মানসগুরু হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। নেতাজি লিখেছিলেন, "স্বামীজি যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তবে আমি তাঁর পদপ্রান্তে বসে থাকতাম।" নেতাজির আপসহীন সংগ্রামের যে স্ফুলিঙ্গ, তার আদি উৎস ছিল বিবেকানন্দের দর্শন।
দেশমাতৃকাই একমাত্র উপাস্য(মনের সংঘব্ধতা আর একই আরাধ্য দেবতা )
সেই যুগে সনাতন ধর্মে অনেক দেব-দেবীর আরাধনা প্রচলিত ছিল। কিন্তু স্বামীজি ভারতবাসীকে এক নতুন ধর্মে দীক্ষিত করলেন— দেশপ্রেমের ধর্ম। তিনি বললেন, "আগামী পঞ্চাশ বছর আমাদের একমাত্র উপাস্য দেবতা হবেন আমাদের এই মাতৃভূমি। অন্য সব দেব-দেবীকে আপাতত দূরে সরিয়ে রাখো।"
একজন সন্ন্যাসীর মুখে এমন কথা সেই যুগে ছিল কল্পনাতীত। তাঁর এই বাণী ভারতের তরুণ সমাজকে এতটাই উদ্দীপ্ত করেছিল যে, তারা হাসিমুখে দেশের জন্য প্রাণ দিতে কুণ্ঠাবোধ করেনি। তাঁর শিষ্যা ভগিনী নিবেদিতাও তাঁরই নির্দেশে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে, শিল্পে ও শিক্ষায় যে যুগান্তকারী ভূমিকা নিয়েছিলেন, তা স্বামীজিরই দেশপ্রেমের সম্প্রসারিত রূপ।
মানুষের মতো মানুষ গড়ার মন্ত্র
স্বামীজি বিশ্বাস করতেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা তখনই আসবে এবং টিকবে, যখন দেশের মানুষ আত্মবিশ্বাসী ও চরিত্রবান হবে। তিনি বলেছিলেন, "আমার মানুষ চাই যারা হবে সবল, তেজস্বী ও বিশ্বাসী তরুণ।" তিনি এমন এক যুবসমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন যারা শুধু পুঁথিগত বিদ্যায় নয়, বরং সাহস, ত্যাগ এবং সেবার মন্ত্রে দীক্ষিত হবে। তাঁর এই মানুষ গড়ার দর্শনই স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল।
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট যখন ব্রিটিশের ইউনিয়ন জ্যাক নামিয়ে ভারতের তেরঙা পতাকা উত্তোলন করা হলো, তখন স্বামীজি সশরীরে উপস্থিত ছিলেন না। ১৯০২ সালেই ৩৯ বছর বয়সে তাঁর মহাপ্রয়াণ ঘটেছিল। কিন্তু যে সুবিশাল এবং মজবুত ভিত্তির ওপর ভারতের স্বাধীনতার ইমারতটি গড়ে উঠেছিল, তার প্রধান স্থপতি ছিলেন তিনিই। স্বামী বিবেকানন্দ কেবল ভারতের আধ্যাত্মিক গুরু নন, তিনি ছিলেন ঘুমন্ত ভারতের জাগরণের সেই প্রলয়-শিঙা, যাঁর ধ্বনিতে পরাধীনতার শিকল প্রথমবার কেঁপে উঠেছিল।
পৃথিবীর ইতিহাস বলে জনজাগরন বা পরিবর্তনের প্রকৃত কান্ডারি তারাই, যাঁরা দেশের জনগনের মানসিক প্রস্তুতি গঠনে সাহায্য করেন। এই ভারতবর্ষের নিঃসন্দেহে সেই কান্ডারি ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ।
বৃটিশদের গোয়েন্দা রিপোর্টের অংশ -
এই প্রসঙ্গে Sedition Committee, যাকে Rowlatt Committee-ও বলা হয়, সেখান থেকে উদ্ধৃত ১৯১৮ সালে ভারতে বিপ্লবী ও গোপন রাজনৈতিক আন্দোলনের অনুসন্ধানের জন্য গঠিত হয়। এর রিপোর্টে বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের বৌদ্ধিক ও আদর্শগত উৎস বিশ্লেষণ করতে গিয়ে রামকৃষ্ণ পরমহংস ও স্বামী বিবেকানন্দের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রিপোর্টে বিপ্লবীদের পাঠ্য ও অনুপ্রেরণার প্রসঙ্গে বলা হয়েছিল যে ভগবদ্গীতা, বিবেকানন্দের রচনা এবং মাজ্জিনি ও গ্যারিবাল্ডির জীবনচরিত তাঁদের শিক্ষার অংশ ছিল। গবেষণামূলক সূত্রে Sedition Committee Report-এর ১৯১৮ সালের সংস্করণের পৃষ্ঠা ১৭-এর উল্লেখ রয়েছে।
মন্তব্যসমূহ