(মহাভারতের রাজনীতি ও নারীদের নীরব বলিদান -তৃতীয় পর্ব )
মহাভারতের রাজনীতি ও নারীদের নীরব বলিদান-তৃতীয় পর্ব
(গত সংখ্যা য় : বিচিত্রবীর্যের মৃত্যু - পরবর্তী উত্তরাধিকার নিয়ে মন্ত্রণা - বেদব্যাসকে আমন্ত্রণ - সত্যবতীর ফিরে দেখা - জন্ম ইতিহাস )
[ এই পর্বে অম্বিকা ও কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসদেবের মিলন দৃশ্য ]
মাতা সত্যবতীর আহ্বানে কালবিলম্ব না করে কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসদেব হস্তিনাপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলেন। বনের মধ্যে দিয়ে দীর্ঘ সেই যাত্রা পালা । প্রতিশ্রুতিমত পরাশর মুনি ঠিক বারো বছর বয়সে তার মা'র কাছে থেকে নিয়ে গিয়েছিলেন তার আশ্রমে শিক্ষাদানের জন্য। মাতা সত্যবতী সেদিন অশ্রুজলে বিদায় দিয়েছিলো তার স্নেহের পুত্রকে । আজ সেই মাতার কাছেই দ্বৈপায়নের আগমন।
শরৎকাল বিদায় নিয়েছে, বাতাসে হিমেল পরশ । পথের চারিপাশে গাছের সারি আর তার অবিনস্ত ডাল পালা এক আলো আঁধারী পরিবেশ সৃষ্টি করছে। নিস্তব্দ বন পথে মাঝে মাঝে বন মোরগ স্বল্প আলোয় ভোরের আগমনের বিভ্রান্তিতে ডেকে উঠছে। বন ময়ূরীর পাখার ঝাপটায় কাঁটা বনটা মাঝে মাঝে নড়ে উঠছে। দীর্ঘদিন জীবনটা এক অনুশাসনের জালে আবদ্ধ ছিল আজ খোলা আকাশের নিচে এসে মনে হচ্ছে প্রকৃতির সাথে এমন করে নিবিড় করে পরিচয়টা এর আগে কখনো হয়নি ।
নির্জন পরিবেশ আর নিঃসঙ্গতা মানুষকে ভাবায় , একে একে ব্যাসদেবের মনে পড়ছে তার কৈশোরের কথা। আশ্রমের সেই দিন গুলিতে , কালো রং আর কুৎসিত চেহারার জন্য সহপাঠীদের গঞ্জনা আর উপেক্ষা। মনে মনে বিদ্বেষ জন্মেছিলো সাদা চামড়ার মানুষদের উপর। অদম্য প্রাণশক্তিতে সেই ভৎসনাকে রূপান্তরিত করেছিল সুগভীর জ্ঞান অর্জনের প্রতিজ্ঞায় আর সৃষ্টির দুন্দুভিনিনাদে ।
দরজায় মৃদু আঘাতে সত্যবতী দৌড়ে এলেন, সামনে দন্ডায়মান স্বয়ং ব্যাসদেব। দীর্ঘদিন -বাদে পুত্রের দর্শনে সত্যবতীর অন্তরটা যেন নেচে উঠলো। এক প্রবল অনুসন্ধিৎসা নিয়ে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করতে লাগলেন। ঈষৎ স্থুলকায়া দেহ, এক রাশ দীর্ঘ শ্মশ্রু সারা মুখ মণ্ডলকে আবৃত করে রেখেছে , পিঙ্গলবর্ন জটায় আচ্ছাদিত সমগ্র মস্তক, চোখগুলি যেন জ্বলন্ত গোলা , মুখে তার প্রশান্তির হাসি। যেন কোন এক প্রাচীন রহস্যময় পুরুষ, কালের আহ্বানে মর্ত্যে নেমে এসেছেন মানব জাতির কাছে মুক্তির বার্তা নিয়ে।
এই আনন্দঘন মুহূর্তের দীর্ঘ নীরবতা ভাঙ্গলো ব্যাসদেবের 'জননী' সম্বোধনে । " আমাকে আজ্ঞা করুন মাতা, কি ভাবে আপনাকে আমি সেবা করতে পারি। " খানিকটা ইতস্তত করে, সত্যবতী সবিস্তারে তার সংকটের কারণটি ব্যাখ্যা করলেন -
বিচিত্রবীর্য্যের মৃত্যু , আর ভীষ্ম কঠিন প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ তাই কুরু বংশে আজ প্রদীপ জ্বালানোর মতো কোন উত্তরাধিকারী নেই। একমাত্র তুমিই সন্তানহীনা অম্বিকা আর অম্বালিকার জঠরে সন্তান উৎপাদন করে, আমাদের তথা সারা ভারতভূমির মৃত প্রায় এই সিংহাসনের উত্তরসূরীর প্রবন্ধ রচনার কাজটা করতে পার। তুমি আর আমি এই বিশাল কর্মের নিমিত্ত মাত্র। আমরা উভয়েই জারজ সন্তান , আমাদের প্রাসঙ্গিতা কোন সামাজিক কাজে নেই। তাই বৎস , মনে কর বিধাতা আমাদের এই কাজটা করার জন্য এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন।
অসম্ভব ! নৈতিকতার দিক থেকে এতো ব্যাভিচার। প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন দ্বৈপায়ন ব্যাসদেব। দীর্ঘ দিনের ব্রম্মচর্য্যের তপস্যাকে মুহূর্তের মধ্যে বিসর্জন দেওয়া তার মতো বেদজ্ঞানে সমৃদ্ধ ঋষির পক্ষে মানায় না।
সত্যবতী এর প্ৰত্যুত্তরে বললেন, হে পুত্র ! এর পূর্বে আমি পন্ডিতবর্গ ও রাজকুল পুরোহিতদের সাথে দীর্ঘ আলোচনা করেছিলাম ক্ষেত্রজ পুত্র উৎপাদনের প্রতিকূলতা ও গ্রহনযোগ্যতা সম্পর্কে, ওনারা এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে , যদি পিতৃ বা মাতৃ কুলে জাত কোন পুরুষ দ্বারা এই কার্য্য সম্পাদিত হয়, সেক্ষেত্রে শাস্ত্রের বা ধর্মের দিক থেকে কোন বাধা নেই। সর্বোপরি তা যদি মাতৃ আজ্ঞা পালনের জন্য হয় তাহলে তা নীতি সম্মত।(এই খানেই মহাভারততে সংকট কালে "পরিস্থিতি অনুযায়ী নীতি নির্ধারণ " কি হওয়া উচিত - পরবর্তী সংখ্যায় তা আলোচিত হবে। )
সত্যবতীর ব্যাখ্যায় ধর্ম আর দ্বৈপায়নের ব্যাখ্যায় ব্যাভিচার - এই দুইয়ের টানাপোড়নে, গতানুগতিকতার খোলস ছেড়ে ধর্ম এখানে এক গতিশীল এবং সময়োপযোগী হয়ে উঠলো। এই দ্বান্দ্বিক রূপটাই মহাভারতের এক অনন্য রচনাশৈলীর দৃষ্টান্ত।
ইতিমধ্যে সত্যবতী কাশীরাজের কন্যা বিচিত্রবীর্যের সন্তানহীনা পত্নী অম্বিকাকে জানিয়ে দিলেন যে , তার কাছ থেকে তিনি পুত্র সন্তানের অভিলাষী। সে উদ্দেশ্যে তাকে তার ভাসুরের অঙ্কশায়িনী হোতে হবে এবং সেই পুত্রই আগামী দিনে হস্তিনাপুরের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হবে। অম্বিকার কাছে এই প্রস্তাবটা ভীষণ একতরফা এবং অপ্রত্যাশিত কিন্তু সে ছিল একদম নিরুপায়। যদিও তার অরাজীতে আদেশের কোন নড়চড় হবেনা এটা তিনি জানতেন। অম্বিকার সম্মতি জানানো ব্যতিরেকে কোন গত্যন্তর ছিলোনা।
অবশেষে দীর্ঘ মানসিক দ্বন্দে ক্লান্ত এত দিনের সন্যাসী জীবনের মূল্যবোধের সেই ভাবটা অচিরেই পরিবর্তিত হয়ে মনের অন্দরে কামনার এক মশাল জ্বালিয়ে দিল। দ্বৈপায়নের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছিল সেই অপেক্ষা। অবশেষে এলো সেই বাসনা পূরণের চরম মুহূর্ত । সন্ধ্যা গড়িয়ে রাতের প্রথম প্রহর অতিক্রান্ত। ধীরে ধীরে অম্বিকার ঘরে প্রবেশ করলো দ্বৈপায়ন । ঘরের মধ্যে বিভিন্ন সুগন্ধি আর ফুলের সমারোহে আর কৃপণ প্রদীপের আলো, সব মিলিয়ে এক স্বপ্নিল পরিবেশ তৈরি হোয়েছে। প্রসঙ্গত , ইতিপূর্বে দ্বৈপায়ন ও অম্বিকার মধ্যে কোন সাক্ষাৎকার হয়নি ।
প্রদীপের স্বল্প আলোয় ঋষি দেখলেন বিশাল পালঙ্কতে আধ শোয়া অবস্থ্যায় এক অপূর্ব সুন্দর আর্য নারী মিলনের প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষারত। হঠাৎ পদশব্দে অম্বিকার অবনত মুখখানি ঈষৎ তুলে আগন্তুককে দেখবার চেষ্টা করলেন কিন্তু আলোর বিপরীতে থাকার দরুন শুধু মাত্র একটি ছায়াকে অবলোকন করলেন। ধীরে ধীরে সোনার পালঙ্কের কাছে অম্বিকার একদম নিকটে পৌঁছিলেন।
দীপের আলোর ঝলকানি খেলে গেল ব্যাসদেবের মুখের উপর। পিঙ্গল কেশরাশি , অমাবস্যার রাতের মতো নিকষ কালো গায়ের রঙ, একরাশ ঘন শ্রশ্রু সারা মুখ মন্ডলকে আবৃত করে রেখেছে , এই রূপ এক ভয়ংকর মানুষের সাথে তাকে রতি ক্রিয়া করতে হবে, এই ভেবে দ্রুত নেমে যাবার চেষ্টা করলেন অম্বিকা। কিন্তু সিদ্ধান্ত বদল করে পুনরায় স্বস্থানে বসে পড়লেন। মহূর্তের মধ্যে অম্বিকার পূর্বের সব ধারণা পর্যবসিত হলো নিদারুন ঘৃনায়।
আজীবন ব্রম্মচারী দ্বৈপায়নের কাছে সমগ্র ব্যাপারটা প্রাথমিক ভাবে ধাক্কা দিলেও, নিজেকে সামলে নিয়ে ভাবতে লাগলেন, তার আবির্ভাবের প্রাকমুহূর্তে বহু মানুষ তাকে দর্শন করে হকচকিত হয়ে গেছেন। এইখানেও সেই না বলা গল্পের পুনরাবৃত্তি। কোন মুখবন্ধ না করে তিনি পারস্পরিক প্রতিজ্ঞাবদ্ধের দায়বদ্ধতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করলেন এবং এই পরিস্থিতিতে মনের মিলনটা গৌণ আর দেহের মিলনটাই একমাত্র মুখ্য।
কালবিলম্ব না করে, এক প্রকার জোর করে, আচমকাই অম্বিকার শরীরটা নিজের শরীরের মধ্যে আবদ্ধ করে নিলেন। বজ্র কঠিন নিষ্পেষণে অম্বিকা তার চোখ দুটি বন্ধ করে ফেললেন কিছুক্ষনের মধ্যেই ঘন ঘন নিঃশাস বইতে লাগলো। অঙ্গের সব ভূষণ এক এক করে খসে পড়লো।
কোন ব্যাকরণ ব্যতিরেকে দ্বৈপায়নের রমনক্রিয়া এক ভয়ংকর প্রলয়ের সৃষ্টি করল আর সেই ঝোড়ো হাওয়ায় একে একে অম্বিকার সব প্রতিরোধ ভেঙ্গে এক মিশ্র অনুভুতির আস্বাদ অনুভব করলো। এ এক অচেনা অনুভূতি, ধীরে ধীরে শিথিল হোল সব বন্ধন, শিথিলতার সাথে যোগ্য সংগত করলো অঝোরে বৃষ্টি। অবশেষে দীর্ঘক্ষণের পার্থিব সুখানুভূতির শেষে এক মহৎ কর্ম সম্পাদনের আত্মতৃপ্তি নিয়ে দ্বৈপায়ন অম্বিকার ঘর থেকে দ্রুত নিষ্ক্রান্ত হলেন। (এই খানে মহাভারত "যৌন মিলনের নৈতিকতার" প্রশ্ন তুলে দিলো - পরবর্তী সংখ্যায় তা আলোচিত হবে )
পথ মধ্যে যেন সিংহাসন পেতে গভীর প্রতীক্ষায় দাড়িয়ে ছিলেন সত্যবতী। বদ্ধ কপাটটি উন্মোচিত হোল। ব্যাসদেব সফলতার সাথে কার্য্য সম্পাদনের তৃপ্তিতে স্মিত হাসি মুখে মাতার সম্মুখে উপস্থিত হলো। সেই অর্থ পড়তে পারলেন সত্যবতী, নব আনন্দে নেচে উঠলো তার মন কিন্তু উন্মুখ হয়ে রইলেন পুত্রের মুখ থেকে বদ্ধ কপাটের ওপারের বিবরণ জানার জন্য। বদ্ধ ঘরের অন্দরের ছবিটার বর্ণনা দিতে গিয়ে আর্য নারীর তীব্র ঘৃণা এবং তার ফলস্বরূপ অন্ধ পুত্রের জন্মের ভবিষৎ বাণী সম্পর্কে মাতাকে অবহিত করলেন এবং তিনি নিষ্ক্রান্ত হলেন আশ্রমের উদ্দেশ্যে।
ক্রমশঃ
মন্তব্যসমূহ