মহাভারতের রাজনীতি ও নারীদের নীরব বলিদান-পঞ্চম পর্ব

 

মহাভারতের রাজনীতি ও নারীদের নীরব বলিদান-পঞ্চম পর্ব 

 

(মহাভারতের নৈতিকতা)

পূর্ব অধ্যায়ের সূত্র - সত্যবতীর ব্যাখ্যা যৌন নৈতিকতা এবং সময়পোযোগী সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা প্রসঙ্গ। 


এই কথাটি অনস্বীকার্য যে, সত্যবতী আজেকের দিনের অনেক নারীদের তুলনায় অনেক বেশি  আধুনিকা ছিলেন । পুত্র বাৎসল্যের স্বাদ থেকে বঞ্চিত পুত্রবধূদের যৌবনের বাস্তব চাহিদাটা তিনি উপলদ্ধি করে ক্ষান্ত থাকেন  নি, তিনি সক্রিয়ভাবে তাকে বাস্তবায়িত করছেন সব রকমের সামাজিক প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বে ও ।  অবশ্য এর মধ্যে রাজনীতি এবং পুত্রবধূদের চাহিদা, কোনটা গুরত্বপূর্ন ছিল সেটা  একমাত্র সত্যবতীই তা বলতে পারবেন। 

শব্দ যখন অপর একটি শব্দের জন্ম দেয় ঠিক তেমনি মহাভারতে একটি ধর্মের ব্যাখ্যা বাস্তবের পটভূমিতে এসে ঠিক বিপরীত একটি  ধর্মের জন্ম দিয়েছে ।  এখানে চিরন্তন  দ্বন্দ্বের আঁধারকে সৃষ্টির কারন হিসাবে ভীষণ যত্ন করে  মহাভারতে পরিবেশিত হয়েছে ।  দুটি বিপরীত ধর্মের দ্বন্দ্বে একটি ধর্মের বিলুপ্তির পরে অপর একটি ধর্মের জন্ম পরিলক্ষিত হয়েছে । আপাতপ্রতীয়মান  নীতিহীনতাকে প্রবল যুক্তির অবতারণা করে তাকে নীতি হিসাবে প্রতিপন্ন করেছে , তাকে আপৎকালীন ধর্ম হিসাবে সারা মহাভারত জুড়ে তার বিস্তৃতি এবং নীতিকে   যুক্ত করেছে রাজনীতির সঙ্গে। কখন মহর্ষি নারদ, কখন ভীষ্ম, সর্বোপরি ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে দিয়ে  এই অনুঘটকের কাজটা করিয়েছেন কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসদেব ।
নীতিকুলশীল পাঠক বারংবার সেখানে ধাক্কা খায়, আবার আপন মনে একদঙ্গল  প্রশ্ন নিয়ে মহাকাব্যের  রচনার সাগরে আবার ডুব দেয় , এখানেই মহাভারতের কবির সৃষ্টির কুশলতা।   

কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসদেব একাধারে মহাভারতের  কাহিনীকার আবার অন্যদিকে তিনি আবার মহাভারতের অন্যতম   তিন মূল  চরিত্রের মানবীয় সৃষ্টিকর্তাও বটে। যাঁদের কেউ একজন ভবিষ্যতের হস্তিনাপুর সিংহাসনের প্রধান উত্তরাধিকার হবেন। একদিকে হস্তিনাপুরের ঘোষিত উত্তরদায়ী ভীষ্ম অন্যদিকে হস্তিনাপুরের অন্তরালে থাকা স্রষ্টা কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসদেব। আগামীদিনে মহাভারত অপেক্ষা করবে ব্যাসদেব আর ভীষ্মের সংযত পরিশীলিত দ্বন্দ্বের নিষ্কর্ষ (essence ) দেখার জন্য । 

যথা সময়ে অম্বিকার সম্পর্কে ব্যাসদেবের  ভবিষ্যৎবাণীর বাস্তবতা অনুযায়ী  অন্ধ  পুত্র  ধৃতরাষ্ট্রের জন্ম হল। পরিবার তথা সমাজে যে অন্ধ,  সে করুণার উদ্বেগকারী এবং  উদ্বৃত্ত মানুষ  হিসাবে গণ্য হয়। রাজপরিবারে এক চাপা কান্নার রোল উঠল। কালবিলম্ব না করে পুনরায় রানী সত্যবতী দ্বৈপায়নকে আহবান করলেন অম্বালিকার গর্ভে ক্ষেত্রজ সন্তান উৎপাদনের জন্য। 

বাক্য বন্ধনে আবদ্ধ দ্বৈপায়ন মাতা সত্যবতীর রাজনৈতিক কর্মযজ্ঞের এক নীরব সাক্ষী।  দ্বিতীয়বার প্রবেশ করলেন হস্তিনাপুরে। মাতা সত্যবতীর নির্দ্দেশে প্রবেশ করলেন অম্বালিকার ঘরে। পূর্বেকার অভিজ্ঞতা মহাভারতের কবিকে খুবই পীড়িত করে ছিল। সময়ের ডাক মাতৃ আজ্ঞারূপে তার কাছে কর্তব্য পালনের মহান দায়িত্বের গুরুভার অর্পণ করছে। সেই কালরূপী নিশির ডাকে সারাদিয়ে সময়ের হাতে কবি নিজেকে অর্পণ করে দিয়েছেন।  কোন প্রারাম্ভরিক যোজনা নয়, স্ত্রী পুরুষের সম্ভোগ মিলনের প্রথাগত প্রক্রিয়াও নয়, সেখানে শুধু নিরেট কর্ম , এই মনোভাব নিয়ে তিনি অম্বালিকার সাথে যৌন মিলনে রত হলেন।  

যৌনরসনায় তৃপ্ত বেদব্যাসের  সারা শরীরে তার পরিপূর্ণতার স্পষ্ট আভাস ছড়িয়ে পড়েছে, ধীরে ধীরে অম্বালিকার ঘর থেকে বেরিয়েই মাতা সত্যবতীর মুখোমুখি হলেন। দ্বৈপায়নের চোখ মুখের উজ্জ্বলতা দেখে সবই বুঝতে পারলেন মাতা সত্যবতী কিন্তু তার পুত্র তো ত্রিকালদর্শী তাই তার কাছ থেকে আগাম সংবাদটা নেবার লোভটা সংবরণ করতে পারলেন না। মাতাকে আশ্বস্থ করে বললেন যথা সময়ে পুত্র সন্তান হবে । 

ক্রমশঃ 
  
  
.                                                                                 
(বিঃ দ্রঃ লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন )












মন্তব্যসমূহ

Ani বলেছেন…
সবকটা লেখা ভালো লাগছে। লেখার সাবজেক্ট খুবই সমসাময়িক।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)