১৬৩ রাম কি এখনও বনবাসে আছেন ?

 ১৬৩ রাম কি এখনও  বনবাসে আছেন ?

 



        
        
        রামেরা বেঁচে থাকে তাঁদের আদর্শের অনুগামীদের মধ্যে। কিন্তু বর্তমানে ভারতে  রামদের যুগে যুগে মৃত্যু হয়।  অথচ সেটা হবার ছিলনা।  যাঁকে অনুসরণ করতে চায় না, শুধুমাত্র তার ইমেজকে কাজে লাগাতে চায় , তাই  একদল মানুষ যত্ন করে দেবতা বানিয়ে দিয়ে পূজা করতে শুরু করে দেয়। তার পিছনের অর্থ হল ত্যাগ, অঙ্গীকারকে রক্ষা করা এসব মানুষের কাজ নয় , এসব অতিমানব অর্থাৎ দেবতাদের কাজ।  সুতরাং তাদের পূজা করো, মন্দির বানাও কিন্তু  অনুসরণ করতে যেওনা। তাতে তোমার তথা দেশের অমঙ্গল হবে। 
        যদি বলা হয় রাম ও রাবন ভিন্ন কোন মানুষ নয় একই মনের  দুটি ভাব।  এক দিকে  ত্যাগের ও অঙ্গীকারের প্রতি সমর্পিত প্রাণের বিকাশ  আর অন্যদিকে  ভোগ  ও অহংকারের বিলাস সমৃদ্ধ ভাবনার প্রকাশ। দুইটি পরস্পর বিরোধী সত্তার দন্দ্বে অবশেষে অহংকারের পতনের মধ্যে দিয়ে ত্যাগের জয়যাত্রা যা ভারতবর্ষের চিরন্তন আদর্শ, তাকেই  প্রতিষ্ঠা করা।  এটাই  রামায়ণের উপজীব্য বিষয়। 

        সবাইকে ছাপিয়ে প্রোটাগোনিস্ট একজনই হয়।  তার কি ধরনের যোগ্যতা থাকার প্রয়োজন তা কিন্তু সঠিক ভাবে বলা হয়নি, তবুও ইতিহাসের পাতায়, দৈনিন্দন জীবনে কিছু মানুষকে সাধারণ থেকে নায়কচিতো স্তরে উন্নীত হবার পিছনের কারন গুলি অনুসন্ধান করলে নায়ক  হয়ে উঠবার উপাদানগুলোকে  বিশ্লেষণ করা যায়। একটি জাতির সামনে কোন নায়কের প্রতিমূর্তি না থাকলে জাতির আধ্যাত্মিক গতি রুদ্ধ হয়ে যায় ,  অন্তত ভারতের মতো দেশে। যেখানে অধ্যাত্বিকতাই সংস্কৃতির অন্যতম ভিত্তি।  তাই এই নায়কের প্রয়োজনীয়তা  সমাজে বার বার ঘুরে ফিরে এসেছে। 

        শাসক যখন ব্যর্থ হয় সুশাসন পরিচালনে তখন তাকে আশ্রয় করতে হয় প্রোটাগনিস্টের উপর। জনসাধারনের মনের আকাশে বেশ খানিকটা কাল্পনিক মেঘের সঞ্চার করে মূল সমস্যা থেকে দৃষ্টিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এর পিছনে পৃষ্ঠপোষকতা সাধারণত শাসক করে থাকেন  প্রত্যক্ষভাবে বা  তাদের সহযোগী সংগঠনের মাধ্যমে।

        আবার কেউ কেউ  দীর্ঘদিনের নিদ্রা থেকে তুলে তার আবির্ভাবকে নায়কোচিত অনুষ্ঠান করে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। অনেকটা ছয় মাস ঘুম থাকে উঠেই কুম্ভকর্ণের  মতো লঙ্কার যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ন হয়ে হারিয়ে যাওয়া আরোপিত বীরের মতো। বার বার চেষ্টা করা হয় প্রোটাগনিস্টের ইমেজেকে  শাসককের  অস্থিমজ্জার  সাথে মিলিয়ে মিশিয়ে এক নতুন ধারার পাবলিসিটির ইমেজ  সৃষ্টি করা , যাতে মনে হতে পারে শাসক শুধু মাত্র পার্থিব জগতে নাগরিকের সুখ চিন্তায় থেমে থাকেন না, তার থেকে আরোবেশি তিনি দিয়ে থাকেন, যাতে করে আধ্যাত্মিক জগতেও মানুষ ঈশ্বরকে খুঁজে পায় তার জন্য সুবন্দোবস্ত করে থাকেন। অধিকাংশ সময়ে নাগরিকদের  স্থুল শরীরের অন্ন সরবরাহ হোক বা না হোক , তাকে ছাপিয়ে যেন তার পারমার্থিক চিন্তা সবথেকে বেশি মান্যতা পায়। 

        এন্টাগোনিস্ট রাবন যদি না থাকতো তাহলে রাম কি কোনদিন নায়ক হতে পারতো। রাবনের অন্ধকরাত্বর যে উজ্জ্বলতা সেটা কখনই ফুটে উঠতো না, যদি না সে সীতাকে হরণ না করতো। আবার তৎকালীন সমাজ যদিনা পরস্ত্রী হরণকে যদি অপরাধের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার না করতো, তা নাহলে, রাবনের মাথায় অসামাজিক কাজের কান্ডারীর শিরোপাটা দেখা যেতো না। অন্যভাবে বলাযায়, রাবনের বৌ চুরি রামকে নায়ক বানিয়ে দিয়েছে। 

            তা না হলে কি হতো -

        একটা সাদা মাটা একটি রাজ্যের রাজকুমার, যার পিতার মাথার উপর  অনিচ্ছাকৃত এক মুনির হত্যার খাঁড়া ঝুলছে , সন্তান উৎপাদনে অক্ষম অথচ তার কামুকভাবের কোন কার্পণ্য নেই। রাজার বড় পুত্র  আগামী দিনের রাজা হবে এটাই পরম্পরা , কিন্তু কামাতুর রাজা কোন এককালে তার রানীকে দেওয়া  কমিটমেন্টকে প্রাধান্য দিয়ে  পরম্পরাকে অস্বীকার করে সেই পুত্রকেই  সিংহাসনের পরিবর্তে বনবাসে পাঠিয়ে দিল। এখানে আবার ভোগ বিলাসে অস্থির রাজা দশরথের ভাবনাকে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে পাঠিয়ে সেই রাজবংশ থেকে উদ্ভূত রাজপুরুষ রাম তার ত্যাগ ও ভোগের উর্দ্ধে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে ইতিহাসের পাতায় দৃষ্টান্তমূলকভাবে স্থায়ী  জায়গা করে নিল। 

বিনা অপরাধে  বনবাস কারাবাসের সমতুল্য । একমাত্র অপরাধ  যে সে পিতার বড় ছেলে। পিতার অন্যায়কে সে মান্যতা দিয়েছিল, অথবা বিরোধিতা করার মতো সামর্থ ছিলোনা বা পিতার ইচ্ছা পালন করাটা যে একটা পরম্পরা, তিনি সেটাকে মেনে নিয়েছিলেন। আসলে, তিনি কোনটা করেছিলেন, তার ব্যাখ্যা কোথাও দেন নি, কেউ কেউ সেটাকে পিতার শর্ত পালন হিসাবে বর্ণনা করেছেন এবং যে সমস্ত কারনগুলি তাকে প্রোটাগোনিস্ট বানানোর পক্ষে অন্তরায়, তাকে যত্ন করে এড়িয়ে গেছেন। পক্ষান্তরে কেউ কখন বলেন নি যে, তার দুর্বলতা ছিল  সত্যের মুখোমুখি  হবার। 

            কর্তব্য পালন এবং মানসিক দৃঢ়তার  আঙ্গিকে যদি বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে দেখা যায়, ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে বালীকে বধ করেছিলেন, স্ত্রী ও সন্তানদের প্রতি স্বামী বা পিতার কর্তব্য পালন করতে পারেন নি, কেবলমাত্র প্রাধান্য দিয়েছিলেন  জনসাধারণের ভোট পাবার বা বাহবা পাবার জন্য। 

            ভারতের ইতিহাসে  প্রোটাগোনিস্ট কি কম পড়েছে ? কোন দৃষ্টিকোণ থেকে   তাকে  মেনে নেব তিনি এক  আদর্শ চরিত্রের উদাহরণ। এটা মনে রাখা প্রয়োজন যে, প্রথমে তিনি মানুষ ছিলেন, তার পরে রাজা, তার পরে স্বীয় কর্মের দ্বারা গড়পড়তা রাজাদের ছাড়িয়ে দৈবগুনের অধিকারী এবং দেবতায় সে উন্নীত। 

        তাহলে, দৈবগুন কি ? ঋকবেদে আমরা দেখি সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা, সুস্থ জীবনের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইন্দ্র, বরুন প্রভৃতি, মানুষ থেকে দেবতার স্তরে উন্নীত হয়ে ছিলেন। যদি ধরে নেওয়া হয় ,  এক দৃষ্টান্ত সৃষ্টিকারী রাজা হিসাবে তিনি প্রজাপালন করেছিলেন। যেমন, শিক্ষা, স্বাস্থা , বাসস্থানের, আইনের চক্ষে সমানাধিকার। সুশাসনের প্রতিষ্ঠা , প্রাকৃতিক দুর্যোগে, মহামারীতে প্রজাকে রাষ্ট্রীয় সাহায্যদান , নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার ও সুরক্ষা ইত্যাদির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলেই তিনি প্রাতঃস্মরণীয় পুরুষ এবং কালক্রমে উন্নত মানব বা দেবতার আসনে প্রতিষ্ঠিত। 

            একটি নাম আর সেই শব্দের উচ্চারণের সাথে সাথে মনে পড়ে যায় সহনশীল, সর্বপ্রকার ভেদাভেদের উর্ধে , সত্যে ও ন্যায়ের জন্য নিবেদিত প্রাণ,   সমষ্টির  স্বার্থ এবং ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে নিজের স্বার্থকে বিসর্জন ( নাগরিকদের ইচ্ছায় স্ত্রী'র সাথে সেপারেশন, পিতার ইচ্ছায় বনবাসে গমন, সুগ্রীবের ইচ্ছায় বালীকে বধ ইত্যাদি  ) , আদর্শ প্রজাপালক এবং মানবিকতাই তার একমাত্র রাজধর্মের বুনিয়াদ। তাহলে, সব রকমের সু শব্দের একটি রূপে বিলীন তা হল  "রাম " নাম। 

        এবার আসা যাক দেবতাদের স্মরণ করার স্বার্থকতা কি তার ব্যাখ্যার। প্রথমত রাম একজন মানুষ নয়, তিনি একটা আদর্শের প্রতিরূপ।  তার আদর্শের যথার্থ অনুসরণ করা মানে হচ্ছে তাকে আমরা মনে প্রাণে শুধু মেনে নিচ্ছিনা তার সাথে এক পরম্পরাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি, যাতে করে আগামী প্রজন্ম একাধারে রামের পাশাপাশি তাদের অনুসরণকারীদের জীবনধারণের উৎকর্ষতাকে এগিয়ে যাবার উৎকৃষ্ট পাথেয় হোতে পারে ।  কিন্তু আজকের রামের বারবার মৃত্যু হচ্ছে তার রাবনরূপী অনুগামীদের হাতে। 

 ক্রমশঃ 

বি: দ্রঃ  ভালো লাগলে শেয়ার করুন , কমেন্ট করুন , ফলো করুন আর খারাপ লাগলেও  কমেন্ট করুন'   

 

১৮/০৭/২০২৩ পর্যন্ত   ১৬৩ টি  ব্লগ পোস্ট করা  হয়েছে 

আত্মদর্শনমূলক ব্লগ - 

  • ওপারের সংগীত 
  • ঐকতান 
  • সভ্যতার নামে  প্রহসন 
  • নাড়ী ছেড়ার গান 
  • আত্মত্যাগ কখনো কখনো আত্মহত্যার সামিল হয় 
  • দলিতের সভ্যাভিমান 
  • একটি প্রান্তিক মানুষের মৃত্যু সভা 
  • ২১শে ফেব্রুয়ারীর মূল্যবোধ  (১৫২)
নিছক প্রেমের গল্প -
  • বনবিতান 
জীবনের সংগ্রামের পাশাপাশি  মানুষের সংগ্রামের কথা   -
  • চে গুয়েভারা দ্য রেভলিউশনারী আইকন অল দ্য টাইম ( ৪টি পর্বে )
পৌরাণিক - বিশ্লেষণমূলক  
  • আমি মহাভারতের পৃথা (১৭টি পর্বে )
  • ব্যাসদেবের জীবনের অপ্রকাশিত ঘটনা 
  • মহাভারতের রাজনীতি ও নারীদের নীরব বলিদান (৬ টি পর্বে )
  • মহাভারতের যাজ্ঞসেনী (৪৬টি পর্বে )
নগর দর্পন -
  • ধর্ম ও শাসক 
  • সমাজের রাজন্যবর্গ 
  • হালচাল 
  • সহাবস্থান 
  • নারদের মর্তে ভ্রমণ ( ১৮+৬=২৪ টি পর্বে )
  • মনীষীরা কি আজকের রাজনীতির কাঁচামাল 
  • ক্ষুদ্র আমি তুচ্ছ নই এই সুন্দর ভুবনে 
  • রজ্জুতে সর্প দর্শন 
  •  কুরুক্ষেত্রে  একটি  বিনিদ্র রাত (১-৪ পর্ব )
নিছক প্রেমের গল্প -
  • বনবিতান 
দর্শন  ও ইতিহাস আশ্রিত   ব্লগ -
  • অহংকারের রসায়ন (৮টি পর্ব - এখনো চলছে )
  • আসা আর যাওয়া 
  • সংঘর্ষ 
  • উত্তর মীমাংসা 
  • আগামী 
  • আমরা বাস করি আনন্দে 
  • সৃষ্টির মুলে দন্দ্ব 
  • অখন্ড যখন খণ্ডিত হয় 
  • কোথায় পাব তারে 
  • গোলক ধাঁধা 
  • চির যৌবনা 
  • রূপ ও স্বরূপের লুকোচুরি 
  • একটি অক্ষরের গল্প 
  • মহাভারতের যাজ্ঞসেনী (৪৫ টি পর্বে -এখনো চলবে )
  • সরণি 
  • পরম্পরা 
  • মেলবন্ধন 
  • সন্ধিক্ষণ 
  •  অনুভূতির বহুগামিতা
  • অসুখ 
  •  সংকট কারে কয় 
  • অন্ধজনে দেহ আলো   
  • প্রেমহীনতা কি  সামাজিক ব্যাধি  
  • ১৬২ হিউস্টনের  ডাইরি (১০ তম পর্ব )
  • ১৬৩ হিউস্টনের  ডাইরি (১১ তম পর্ব   রাম কি এখনও  বনবাসে আছেন ?

  

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)