২৯৩ ইতিহাসের পূর্ণ আলোকে মেঘদূত দর্শন - ১৩তম পর্ব
২৯৩ ইতিহাসের পূর্ণ আলোকে মেঘদূত দর্শন - ১৩তম পর্ব
রামায়ণ ও কালিদাসের মেঘদূত এবং পরবর্তী সময় (৩)
রামায়ণ সেই যুগের সংস্কৃত সাহিত্যের এক অনন্য মহাকাব্য। মহাকবি বাল্মীকি তার শ্লোকগুলি রচনার ক্ষেত্রে প্রভাবিত হয়েছিলেন এক ব্যাধের তীরের আঘাতে সঙ্গমরত এক ক্ৰৌঞ্চির মৃতদেহের পাশে স্ত্রী ক্ৰৌঞ্চির তীব্র ক্রন্দনের হৃদস্পর্শী হাহাকারের মধ্যে দিয়ে, যা মহাকবির অন্তরকে স্পর্শ করেছিল। এই শোকই শ্লোক সৃষ্টির আদি পুরুষ।
আদিকাল থেকে ভারতীয়রা ছিল ধর্মপ্রাণ জাতি। যত রকমের সাহিত্য সে যুগে সৃষ্টি হয়েছিল, তার মধ্যে ধর্ম প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যটাই ছিল অন্যতম প্রধান উপাদান। তাই পুরাণের মতো ইতিবৃত্তকে শুধুমাত্র সংরক্ষনের কারণে ধর্মপুস্তক বলে চিহ্নিত করা হয়ে ছিল, তাই আজও সে সংরক্ষিত আছে। কারণ সেদিনের পুরানকাররা জানতেন, যদি ধর্মপুস্তকের তকমা সেটে দেওয়া যায় তবে ভারতবাসী সেটা বুকে আগলে বাঁচিয়ে রাখবেন।
মহাকবি বাল্মীকি কিন্তু শুধুমাত্র ধর্মের মতো গুরুতর প্রসঙ্গ তুলে আমাদের ভারাক্রান্ত করেন নি। কাহিনীর গতি যত বৃদ্ধি পেয়েছে ততই ধীরে ধীরে গল্পের বেশে ধর্ম এসে খুব যত্ন করে নৈতিকতার মূলভাবকে আমাদের অন্তরে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চালিয়েছে। কখন আমাদের মনে হয়নি আমরা ধর্ম পুস্তক পড়ছি। তিনি তৎকালীন সমাজের চিত্রটা তুলে ধরেছিলেন। একদিকে যেমন ত্যাগ ছিল আবার অন্যদিকে ঈর্ষাও ছিল অর্থাৎ মানব চরিত্রের বহুমুখিতাকে প্রায় শিল্প পর্য্যায়ে কবি তুলে ধরে ছিলেন।
এই জগৎ সৃষ্টির সময় অব্যক্ত ত্রিগুন যখন ব্যক্ত হলো, তখন তাদের সমাহার ত্যাগ করে আপন আপন রূপে ভাস্বর হয়ে কোথাও রজঃ গুনের প্রাধান্য আবার কোথাও তমঃ গুনের প্রাধান্যে সত্ত্ব প্রান্তিক গুণ হয়ে যাওয়াতে সমাজের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল এবং তার পরিনামে যুদ্ধ ও তার উদ্দেশ্য ছিল ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করা।
এতসব করতে গিয়ে মহাকবি কখনো ভোলেন নি মানুষের চরিত্রের বহুমুখিতাকে অঙ্কন করতে, কৃষি নির্ভর তৎকালীন ভারতবর্ষ যে কতখানি প্রকৃতি নির্ভর ছিল এবং মানুষের সাথে প্রকৃতির যে আত্মীয়তার বন্ধন গড়ে উঠেছিল, তা তিনি জানাতে ভোলেননি। আমাদের মূল আলোচনার বিষয়বস্তু, মানুষ- প্রকৃতি এবং যুগে যুগে কবি সাহিত্যিকদের উপর প্রকৃতির প্রভাব ও তার পরম্পরাকে খোঁজার মধ্যে সীমাবদ্ধ।
রামায়ন পড়তে পড়তে কখনই মনে হয়নি, এটা শুধু মাত্র রচিত কাব্যগ্রন্থ বরং আসমুদ্র হিমাচলের মাটি থেকে উৎপাদিত ফসল। প্রখ্যাত অধ্যাপক শশিভূষণ দাশগুপ্তর উধ্বৃতি থেকে তুলে এনে বলতে হয়, মহাকবি বাল্মীকি যেন এক সুনিপুন কৃষক। এই বিস্তীর্ন ভূভাগের ভিতরে যে বৃহত্তর সমাজজীবন ছিল আর সেখানে যত সোনার ফসল ফেলেছিল, তাকেই বেছে বেছে সংগ্রহ করে কবি কল্পনার দ্বারা আটি বেঁধে রামায়ণকে কাব্যরূপে হাজির করেছেন। তাই রামায়ণের পদে পদে কতনা সহজ জীবনের ভিড়। একটা জাতির যুগান্তব্যাপী জীবন-ইতিহাস। সেই জীবনের কোলাহল যেন পাঠকের তন্ত্রিতে অনুরণিত হয়।
রামায়ণের যুগ থেকে কালিদাসের দূরত্ব বেশ কয়েক যোজন। সেই দূরত্বকে কাছে নিয়ে আসার অন্যতম মাধ্যম হিসাবে কল্পনার মেঘদূতের ডানা মেলে উড়ে যাওয়া ছাড়া তথ্য সংগ্রহের বিকল্প উপায় ছিল না। সেই তথ্য থেকে কাব্য রচনা করতে গিয়ে মেঘের জনপদকে অতিক্রম করতে গিয়ে তদানীন্তন সমাজের পটভূমিকে অস্বীকার করার কোন উপায় ছিল না। পাশাপাশি বাল্মীকির কবি প্রতিভার বিচ্ছুরণের সে যুগের আড়ালে আবডালে থাকা সামাজিক সত্তাগুলি উজ্জ্বল হয়ে মহাকাব্যে প্রতিফলিত হয়েছে।
চলবে ০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০
মন্তব্যসমূহ