৩২৪ ছোট্ট মিতুনের প্রার্থনা - ২য় পর্ব
৩২৪ ছোট্ট মিতুনের প্রার্থনা - ২য় পর্ব
প্রথম পর্বের পর .........................
প্রতিজ্ঞা -
গতকাল রতনকে পুকুর পাড়ে বাসন মাজতে দেখে মিতুনের মনে যে দুঃখ জেগে উঠেছিল, আজ কিন্তু সেই একই ছবিটা অজান্তেই দুঃখের জায়গায় একটা জেদ এসে মনের মধ্যে দানা বাঁধলো। সে গতরাতে স্বপ্নের মধ্যে ঈশ্বরের উপদেশ শুনতে পেয়েছে। আজ থেকে তাকে সেটাই পালন করতেই হবে।
সে মনে মনে বলল-
"আমি বড়ো হয়ে একজন শিক্ষক হবো। আমার স্কুলে গরীব বলে কোন ছাত্র বাদ পড়বেনা। রতন, পাপিয়া ও সাজিয়ার মতো সবাই যারা আছে তারা সেখানে পড়বে। "
নিজের মধ্যেই এক কথাগুলি ভেবে মিতুনের মনে হলো, কে যেন তার মাথায় ও পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল - " সাবাশ মিতুন, সাবাশ ! তুমি সত্যিকারের একজন সৎ মানুষের মতো চিন্তা করতে শিখে গেছো। "
হোক না তার আট বছর বয়স, মানুষের ভালো করার জন্য বয়স কোন বাধাই নয়। আরেকটা জিনিস মিতুন উপলদ্ধি করলো, যত প্রশ্ন সে ঈশ্বরকে করেছে, তার উত্তর কিন্তু বাইরে থেকে এসে কেউ তাকে বলে দেয়নি, তার বুকের ভিতর থেকে সে আগামী দিনে তাকে কি করতে হবে- তার নির্দেশ এসেছে। ধারণা যে মনে মনে হয় নি, তা নয়, প্রত্যেক মানুষের ঐ বুকের মধ্যেই বোধ হয় ঈশ্বর বাস করেন ? কেউবা সেটা বুঝতে পারে, আর কেউ সারা জীবন ধরে তাঁকে বাইরে খুঁজে বেড়ায়।
প্রতিজ্ঞার হাত ধরে জমিতে পা -
সেদিন স্কুল থেকে এসেই হোম ওয়ার্ক তাড়াতাড়ি সেরে ফেলে মিতুন রতনদের বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা হল। সন্ধ্যা হয় হয় অবস্থা, রতনদের বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই। কেরোসিনের বাতির আলোতে অন্ধকারে তাদের কাজ করতে হয়। রতন সবে বিকালের কাজ করে ঘরে ঢুকেছে। ঘরের দাওয়াতে বসে শুকনো মুড়ি চিবোচ্ছে। মিতুন ধীরে ধীরে রতনের পাশে গিয়ে বসলো।
কোন রকম ভনিতা না করে মিতুন রতনকে জিজ্ঞাসা করলো -
" হ্যাঁ রে রতন - তুই কি অ আ ক খ গ এসব জানিস ?"
রতন খানিকটা হাঁ করে মিতুনের চোখের দিকে তাকালো।
- " না রে , এগুলো আমি জানিনা। "
মিতুন বলল, "জানিস, এগুলো জানলে অনেক নতুন নতুন জিনিস জানতে পারবি। স্কুলে যাসনা তো কি হয়েছে; যা যা আমাদের স্কুলে পড়ায় আমি সেগুলো তোদের শিখিয়ে দেব। সত্যি কথা বলতে কি, এই অক্ষর জ্ঞান হবার পরে আমি অনেক কিছু পড়তে পারি আর নিত্য নতুন জিনিস পড়ে ভীষণ মজা পাই। অক্ষর জ্ঞান অনেকটা একটা শিশুকে হাত ধরে হাটতে শেখানোর মতো , একবার শিখে গেলে, সে কত জায়গায় ঘুরে ঘুরে কত কিছু যেমন জানতে পারে আবার মেলায় গিয়ে আনন্দও করতে পারে-- ঠিক সেই রকম।"
রতন অবাক হয়ে ভাবলো, তাহলে তো এই অক্ষরগুলির কি সাংঘাতিক ক্ষমতা। তার ভিতর থেকে জানার খিদে বাড়তে লাগলো আর বন্ধু মিতুনকে বলল - " হ্যা ভাই, তুই আমাকে যখন সময় পাবি, তখনিই চলে আসবি আর আমি আমাদের অন্য সব বন্ধুদের বলবো, যাদের অক্ষরজ্ঞান নেই। ভীষণ ভালো হবে কিন্তু। "
মিতুন মনে মনে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিলো, এতো সহজেই তার ভাবনা যে ধীরে ধীরে হাঁটতে শিখবে - এই ভেবেই ভিতর থেকে আবেগে একটা কান্না বেরিয়ে আসতে চাইলো।
আবার পরের দিন সন্ধ্যায় রতনদের বাড়িতে পাপিয়া এসে হাজির, একটু পর হনহন করে সাজিয়া এসে হাজির হলো, চোখে মুখে একটা ভীতির ভাব।
ঘরে ঢুকেই সাজিয়া বলল - "মা জানতে পারলে বকাবকি করবে। "
দিন বয়ে যায়। একে সবাই ধীরে ধীরে বর্নমালার সাথে পরিচয় হয়। যে গ্রামে শতকরা আশিভাগ মানুষ নিরক্ষর, সেখানে, নিজের নামটি লেখা যেন গ্রামের সংস্কৃতির বিপরীত মেরুতে গিয়ে যেন প্রতিদন্দ্বিতার সামনে মিতুনের টিমকে হাজির করেছে। কেন গ্রামের কাকুরা এই রকম করছে এই নিয়ে মিতুন তার মা অনিতা দেবীর সাথে আলোচনা করছিলো। অনিতা দেবী কলকাতায় এক নামি কলেজ থেকে সমাজবিজ্ঞানে অনার্স নিয়ে পাশ করেছেন।
অনিতা দেবী মিতুনকে ঠিক তার মতো করে বোঝালেন -" শোন মিতুন, তুমি সারা দিনে স্কুলে যাবার প্রস্তুতি থেকে শুরু করে রাত্রে বিছানায় শোবার আগ পর্যন্ত দিনে প্রায় আট থেকে দশ ঘন্টা ব্যয় করো শিক্ষা গ্রহণের পিছনে। তাছাড়া, তোমার যাতায়াত, স্কুলের ফী, বই খাতার খরচ, গৃহ শিক্ষক বাবদ একটা খরচ হয়। যদি পরিবারটাকে একটা উৎপাদনের কারখানা মনে করো তাহলে, তোমাকে পরিবার পড়াশুনার জন্য যতটা সময় বরাদ্দ করেছে তার পরিবর্তে কোন বিনিময় মূল্য পায় না বরং পড়াশুনাকে এগিয়ে নেবার জন্য পরিবার থেকে অর্থ ব্যয় করতে হয়। এখানে প্রশ্ন হলো শিক্ষার। শিক্ষার মূল্য যারা শিক্ষাকে ভালোবাসে তারই দিতে পারে আর যারা পরিবারকে কারখানা ভাবে আর পরিবারের প্রত্যেকটা সদস্যকে তার কর্মচারী ভাবে, তাহলে তারা যথার্থ ভাবে শিক্ষার বিরোধিতা করবে। আসলে, শোষণের প্রথম পিঁড়ি কিন্তু পরিবার। সুতরাং তুমি যে তাদের কাছ থেকে বিরোধিতা পাবে, সেটাই সত্য। "
চলবে ...............
ভালো লাগলে পরিচিতদের কাছে শেয়ার করুন। খারাপ লাগলে ইগনোর করুন।
rabinujaan.blogspot.com ক্লিক করে যে কোন সার্চ ইঞ্জিন থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।
মন্তব্যসমূহ