৩১৮ পরিবর্তনের পরিবর্তন-- প্রথম খন্ড
প্রত্যেক দিনের মতো অরিন্দমবাবু বিকালে পার্কে একটু পায়চারি করে, উমার হাত থেকে চায়ের কাপটা নিয়ে সন্ধ্যে ৭টার খবর শোনার জন্য সাদা কালো টিভিটার সামনে বসলেন। সেই সাদা- কালো টিভি থেকে খবর ভেসে এলো - -"সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো। .... "
অরিন্দমের ভিতর যেন শ্মশানের নিস্তব্ধতা নেমে এলো, চোখে একরাশ শূন্যতা, চোয়ালে যৌবনের সেই লড়াই করার ছাপটা যেন পাকাচুলের আড়ালে ঢাকা পরে গেল। দীর্ঘদিনের বামপন্থী আন্দোলনের অন্যতম যোদ্ধা। স্বপ্ন দেখতো, একদিন দিন না একদিন পৃথিবী মুক্ত হবে, সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা হবে। আজকের এই খবরটা তার বুকের ভিতর উথালিপাথালি করতে লাগলো -
"তাহলে এত ত্যাগ, এতো রক্ত, এ সবই ব্যর্থ হলো। "
ঠিক এইসময়ে সুচেতা একগাদা খাতা-বই হাতে নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকলো। অরিন্দমবাবুর একমাত্র মেয়ে, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যলয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রী। বাবার এই উদাসীন চাহনি তার দৃষ্টি এড়িয়ে গেলো না, তার উত্তর খুঁজতে তাকে বেশি ভাবতে হলোনা, টিভির পর্দায় সোভিয়েতের কাটাছেঁড়ার পর্বই, সে কথা বলে দিলো। সেই দেখে সুচেতার বুঝতে বাকি রইলনা যে তার বাবার মুখে সেদিনের স্বপ্নের দেশের হুড়মুড় করে ভেঙে পরার প্রতিচ্ছবি যে তার বাবার মুখে ফুটে উঠেছে। আজকের মেয়ে সুচেতা, সে বিশ্বাস করতে জানে বস্তু জগতে কোন কিছুই স্থায়ী নয়। বিশ্ব প্রকৃতির নিয়মে একদিন সবইতো ভেঙে পড়বে এবং তার উপরেই নতুন ইমারত গড়বে। সে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল -
"বাবা ! তুমি আবার এক একটা খবর দেখো আর ভিতরে ভিতরে ভেঙ্গে পর"।
অরিন্দম খানিকক্ষণ চুপ করে রইলো, তার পর আস্তে আস্তে বলল-
ঐ যে দেখছো টিভির পর্দায় নিচের টাইম লাইনে কথাগুলি দৌড়ে দৌড়ে যাচ্ছে , আসলে আমার এতদিনের স্বপ্নকে, ভঙ্গ করার ক্ষেত্রে এক একটা বান হয়ে হৃদয়ে আঘাত হানছে।
সুচেতা বলল -" বাবা, আমার একটা প্রশ্ন আছে। তুমি কি পৃথিবীর মানচিত্রের দিকে চোখ কখনো মেলেনি ? কেন সমাজতান্ত্রিক দেশগুলি তাদের আদর্শকে টিকিয়ে রাখতে পারলো না ? আসলে আদর্শ কিন্তু রাষ্ট্রের কোন আলাদা উপাদান নয়, আইন প্রণয়ন কিংবা শাসন ব্যবস্থার রক্ষকদের দিয়ে একে সংরক্ষিত করা যায় না, সে যে একান্তই নাগরিকদের সম্পত্তি এবং তার রক্ষণাবেক্ষনের ভার মানুষের। কেতাবি ভাষায় অনেক কারণ দেখিয়ে অনেক কিছু বলা হয়, কিন্তু এর বাইরে কিছু গভীর তত্ত্ব আছে।
অরিন্দমের উত্তর দেবার আগেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ এলো।
সুচেতাদের বাড়ির সান্ধ্য আসরের অন্যতম মুখ রূপম প্রবেশ করলো, বেশ একটু উত্তেজিতভাবে। সে এই অঞ্চলের একজন দিকপাল সাংস্কৃতিক কর্মী। কবিতা লেখে সংস্কৃতি চর্চা করে।
রূপম বলল - "কাকু শুনেছেন সোভিয়েতের পতনের সংবাদ ? সাংস্কৃতিক অবগতিই এর জন্য দায়ী। সংস্কৃতিই হচ্ছে আসলো জায়গা।
সুচেতা হা করে রূপমের দিকে তাকিয়ে থাকলো।
সুচেতা- "সংস্কৃতি বলতে তুমি কি বোঝাতে চাইছো ?"
রূপম বললো -" তুমি যখন একটা ভালো ছবি দেখো কিংবা কোন আবৃত্তি শোন বা কোন ভালো গান শোনো, তখন এসবগুলি তোমার মধ্যে এক নতুন ধরনের চেতনাকে জাগাতে সাহায্য করে কিনা না ? এই তো সংস্কৃতি, যে তোমার অন্তর্জগতে কোন রকমের বাধ্যবাধকতা ছাড়া প্রবেশ করে যায়। পাশাপাশি আইন বা পার্টির শাসন তোমারে অন্তরে কি প্রভাব ফেলে? কিছু কি বদলায়, আসলে সমাজতন্ত্রের ভিতরে কি কোনো সত্যিকারের সাংস্কৃতিক বিপ্লব হয়েছিল ?"
অরিন্দমের মনে হলো, একটা পুরানো ক্ষতে কে যেন একমুঠো লবন ঢেলে দিলো।
ক্রমশঃ
তারিখ ১৯/০৮/২৫
ভালো লাগলে পরিচিতদের কাছে শেয়ার করুন। খারাপ লাগলে ইগনোর করুন।
rabinujaan.blogspot.com ক্লিক করে যে কোন সার্চ ইঞ্জিন থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।
মন্তব্যসমূহ