এই কথাটা আজকের দিনে বলা হলে বক্তাকে প্রথমেই জিজ্ঞেস করা হতো—
“আপনি কোন এনজিওর? আপনার ইউটিউব চ্যানেল আছে তো?”
স্বামীজী থাকলে নিশ্চয়ই বলতেন—
“চ্যানেল? আমি তো নদীর কথা বলছি বাবা!”
স্বামীজীর মতে, যিনি সত্যিই কর্মময় পুরুষ, তাঁকে আলাদা করে প্রচার করতে হয় না। তিনি নিজের গুণেই জনমানসে প্রতিষ্ঠিত হন। ঠিক যেন পাকা আম—নিজে থেকেই গন্ধ ছড়ায়, আলাদা করে বিজ্ঞাপন দিতে হয় না। কিন্তু আজকাল আমরা যা করি, তা হলো—কাঁচা আমে পারফিউম ছিটিয়ে বাজারে বসি।
আর শ্রী রামকৃষ্ণ? স্বামীজীর মতে, তাঁর ক্ষেত্রে প্রচারের প্রশ্নটাই অবান্তর। তিনি ছিলেন সূর্যের মতো—সূর্যকে আর টর্চ জ্বালিয়ে দেখাতে হয় না। অথচ আজকাল দেখা যায়, কেউ আধঘণ্টা চুপ করে বসলে তাকে “ধ্যানগুরু” ঘোষণা করে দেওয়া হয়, আর দু’দিন পরেই তার অ্যাপ বেরোয়।
স্বামীজীর দর্শন এখানে আরও মারাত্মক। তিনি বলছেন—
অবতার বলে আলাদা কিছু নেই। যাঁরা ব্রহ্মত্ব লাভ করেছেন, তাঁরাই জীবন্মুক্ত। আর ব্রহ্মা থেকে শুরু করে ঘাসের ডগায় বসা পিঁপড়ে—সবাই একদিন সেই মুক্তির অধিকারী হবে।
এ কথা শুনে আজকের বহু ধার্মিক ব্যবসায়ীর চোখ কপালে উঠবে। কারণ, তাহলে তো মুক্তির উপর একচেটিয়া ডিলারশিপ থাকে না! স্বামীজী এখানে স্পষ্ট ভাষায় বলে দিচ্ছেন—
ধর্ম মানে সাহায্য করা। অধর্ম মানে সাহায্য না করা।
কর্ম মানে পরোপকার। বাকি সব কুকর্ম।
এবার আসি শিক্ষকদের কথায়। স্বামীজী বড় নিষ্ঠুরভাবে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন—
“যারা লোকশিক্ষা দিতে নিজেকে অযোগ্য মনে করে, তারা শিক্ষকের কাপড় পরে লোক ঠকিয়ে কেন খায়?”
এখানে অবশ্যিই শিক্ষকের জায়গার নেতা বা মেকি ধর্মগুরুকে অনায়াসে বসিয়ে দিয়ে আজকের দিনের বাস্তবতার নিরিখে সহজ সরল উত্তরকে মিলিয়ে নেওয়া যায়।
এই প্রশ্নটা আজকের দিনে করলে অনেকেই বলবেন—
“খেতে তো হবে!”
হ্যাঁ, খেতে হবে—কিন্তু খাবার নাম করে বিষ বিক্রি করাকে শিক্ষা বলে না। স্বামীজীর বক্তব্যে কোনো রস নেই—এই অভিযোগ কেউ তুলতে পারবে না। কারণ, এমন নির্মম সত্য উচ্চারণে একধরনের নিষ্ঠুর হাস্যরস লুকিয়ে থাকে।
সবশেষে বলা যায়, স্বামী বিবেকানন্দ আমাদের আরাম কেড়ে নিতে এসেছেন। তিনি আমাদের বলেছেন—
পোস্ট নয়, কাজ করো।
পরিচয় নয়, পবিত্রতা অর্জন করো।
আচার নয়, সাহায্য করো।
এইসব কথা পড়ে আজকের মানুষ যদি একটু অস্বস্তি বোধ করেন—তবেই লেখার সার্থকতা। কারণ, সৈয়দ মুজতবা আলী নিজেই বলতেন—"যে লেখা পড়ে আরাম হয়, সে লেখা সাবান; আর যে লেখা পড়ে চুলকানি হয়, সেই ওষুধ।"
স্বামীজীর লেখা নিঃসন্দেহে ওষুধ।
তিক্ত—কিন্তু আরোগ্যকর।
ক্রমশঃ
মন্তব্যসমূহ