৪০০ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে -(২৭)
৪০০ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে -(২৭)
২২শে অক্টোবর,১৮৯৪ সালে স্বামী অখণ্ডানন্দকে লিখিত ২য় পত্রের ভাবার্থের অনুসরণে -
চার দেওয়ালের বাইরে ঈশ্বর: স্বামী বিবেকানন্দের 'শিবজ্ঞানে জীবসেবা' ও মানুষ গড়ার ধর্ম
১৮৯৪ সালের ২২শে অক্টোবর। আমেরিকার ওয়াশিংটন থেকে স্বামী অখণ্ডানন্দকে (গঙ্গাধর মহারাজ) লেখা স্বামী বিবেকানন্দের একটি চিঠি যেন ঘুমন্ত ভারতের বুকে এক নতুন জাগরণের মন্ত্রণা নিয়ে এল। যুগ যুগ ধরে যে ধর্ম কেবল মঠ-মন্দিরের চার দেওয়ালে, শাস্ত্রের নিথর পাতায় আর কিছু যান্ত্রিক আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে বন্দি ছিল, স্বামীজী তাকে মুক্ত করে নিয়ে এলেন খোলা আকাশের নিচে—দরিদ্র, অবহেলিত ও সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায়। এই চিঠিটি নিছকই কোনো ব্যক্তিগত পত্র ছিল না, এটি ছিল এক ঐতিহাসিক 'প্রেম আন্দোলন' এবং রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের সেবাধর্মের অলিখিত ইস্তাহার।
ধর্মের প্রকৃত অর্থ ও সীমানা অতিক্রম স্বামীজী গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, কেবল "প্রভু রামকৃষ্ণ" নাম জপ করা বা তাঁর নামে একটি নতুন সম্প্রদায় গড়ে তোলার মধ্যে প্রকৃত ধর্মচারণ নেই। তাঁর মতে, ধর্ম তখনই সার্থক যখন তা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি স্তরে স্পন্দিত হয়। তিনি চেয়েছিলেন মন্দিরের পবিত্রতা, প্রীতি, ভালোবাসা ও ভক্তিকে সমাজের প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে। এই বিশ্বচরাচরে প্রতিটি মানুষের মধ্যে যে ঈশ্বর সুপ্ত অবস্থায় রয়েছেন, প্রেম ও সেবার মাধ্যমে তাঁর মধ্যে প্রাণসঞ্চার করাই ছিল স্বামীজীর এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য।
রাজপুতানার অভিজ্ঞতা ও 'দরিদ্রদেবো ভব' মন্ত্র ভারত পরিভ্রমণের সময়, বিশেষ করে রাজপুতানা ও খেতড়িতে স্বামীজী এক রূঢ় বাস্তবের মুখোমুখি হন। তিনি দেখেন, তথাকথিত উচ্চবর্ণ বা অভিজাতদের মধ্যে বাহ্যিক ধর্মাচরণের আড়ম্বর থাকলেও, পরহিতৈষণা বা সমাজের নিচুতলার মানুষের প্রতি ন্যূনতম সহানুভূতি তাঁদের নেই। এই বৈষম্য তাঁর হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করেছিল।
তাই তিনি তাঁর অনুগামী ও সহকর্মীদের উদ্দেশ্যে এক যুগান্তকারী ডাক দিলেন— "দরিদ্রদেবো ভব, মূর্খদেবো ভব"। অর্থাৎ, সমাজের যারা দরিদ্র, মূর্খ, অজ্ঞানী এবং পিছিয়ে পড়া মানুষ, তারাই যেন আমাদের উপাস্য দেবতা হয়। ক্ষুধার্তকে অন্ন না দিয়ে বা অজ্ঞকে শিক্ষা না দিয়ে কেবল ঈশ্বরের আরাধনা করা তাঁর কাছে ছিল নিরর্থক।
মানুষ গড়ার কারিগর ও পূর্ণতার পথে উত্তরণ স্বামীজীর এই ভাবাদর্শের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল 'মানুষ' গড়ার দর্শন (Man-making Religion)। তিনি জানতেন, মানুষের মধ্যে অসীম সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে, কিন্তু অজ্ঞানতা, সংস্কার ও দারিদ্র্যের কারণে তা বিকশিত হতে পারছে না। তাই তাঁর সহকর্মীদের প্রতি তাঁর স্পষ্ট নির্দেশ ছিল— মানুষের মধ্যে যেখানেই মানবিকতার ঘাটতি বা অপূর্ণতা দেখা যাবে, তাকে ভালোবাসা ও সেবার মাধ্যমে পূর্ণতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। যারা কেবল মানুষ নামের তকমা নিয়ে বেঁচে আছে কিন্তু মানবিক গুণাবলি অর্জন করতে পারেনি, তাদের জাগিয়ে তুলে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই ছিল রামকৃষ্ণ ভাবাদর্শের প্রকৃত উদ্দেশ্য।
আজ একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও স্বামীজীর সেই চিঠির বাণী সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। যখনই সমাজ স্বার্থপরতা, বিভেদ ও অমানবিকতার অন্ধকারে পথ হারায়, তখনই স্বামী অখণ্ডানন্দকে লেখা সেই চিঠির পঙ্ক্তিগুলো আমাদের আলোর দিশা দেখায়। স্বামীজীর এই আহ্বান আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মানবসেবাই হলো শ্রেষ্ঠ ঈশ্বর আরাধনা। আর্তের সেবা ও পিছিয়ে পড়া মানুষের হাত ধরার মধ্য দিয়েই আমাদের চলার পথ যেন সার্থক হয়—এটাই হোক আমাদের পাথেয়।
মন্তব্যসমূহ