৪০১ মায়ার বন্ধন ও অনন্তের পান্থশালা

 ৪০১ মায়ার বন্ধন ও অনন্তের পান্থশালা


তপনবাবু গতকাল আমাদের ছেড়ে অনন্তলোকে পাড়ি দিয়েছেন। তার স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে জীবন-মৃত্যুর সার্বজনীন রূপটি আমার কাছে যা প্রতিভাত হয়েছে, তারই কিছু কথা - 

মানুষের এই নশ্বর শরীর নিয়ে অহংকারের যেন কোনো সীমা নেই। আমরা ভুলে যাই যে এই দেহ কেবল একটি সাময়িক আশ্রয়মাত্র। একদিন পারিপার্শ্বিক সমস্ত মায়া, মোহ এবং হাতছানিকে পিছনে ফেলে এই শরীর অনন্তের মাঝে বিলীন হয়ে যায়। এই বিশ্ব চরাচরে কোনো প্রাণীই তার নিজস্ব স্বাধীন ইচ্ছায় আগমন করে না; বরং প্রকৃতির এক অমোঘ নিয়মে, বিভিন্ন প্রলোভনের আকর্ষণে সে এই পৃথিবীর আলো দেখে। তারপর প্রকৃতির এই বিশাল রঙ্গমঞ্চে যখন তার নির্দিষ্ট অভিনয়ের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়, তখন একরকম জোর করেই তাকে বিদায় নিতে হয়।

প্রকৃতির রঙ্গমঞ্চ ও মায়ার কুহক

প্রকৃতি একাধারে স্রষ্টা এবং মায়াবিনী। সে নিজে মোহময়ী, আর 'মায়া' হলো তার পাতা এক বিস্তীর্ণ জাল। বেদান্ত দর্শনে যেমন বলা হয়, মানুষের আত্মস্বরূপ অনন্ত ও মুক্ত, কিন্তু সে মায়ার বশবর্তী হয়ে নিজেকে সীমাবদ্ধ ভাবতে শুরু করে। প্রকৃতি আমাদের পঞ্চইন্দ্রিয় দান করে বিশ্বকে অনুভব করার সুযোগ দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু মানুষ না বুঝেই সেই ইন্দ্রিয়সুখের ফাঁদে পা দেয়। সে চিরজীবনের মতো এই মায়াজালের নৌকায় একজন অসহায় যাত্রী হয়ে পড়ে, যেখানে মাঝি স্বয়ং সেই প্রকৃতি।

জীবন-নৌকায় দ্বন্দ্ব ও দ্বৈততা -

এই যাত্রাপথে প্রকৃতি আমাদের অবিরাম দ্বৈততার পাঠ দেয়। নৌকার যাত্রীকে সে কখনও পরিচয় করায় তার দৃশ্যনন্দন, স্নিগ্ধ রূপের সাথে, আবার পর মুহূর্তেই এক বিশাল প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন করে জীবন সংকটের চূড়ান্ত অনুভূতি দান করে। মানুষ আসলে এখানে প্রকৃতির এক অসহায় ক্রীড়নক। বেঁচে থাকার তাগিদে প্রকৃতি যেমন আলো, বাতাস এবং অফুরন্ত খাদ্যের জোগান দেয়, তেমনি সময়মতো সেই প্রাণশক্তি কেড়ে নিয়ে তাকে অচল মুদ্রার মতো পথের মাঝে ফেলে রেখে চলে যায়। এই আসা-যাওয়ার খেলায় মানুষ নিরন্তর এক মিশ্র অনুভূতির শিকার হয়—কখনও সে আনন্দে আত্মহারা, আবার কখনও বিচ্ছেদের গভীর বিষাদে আচ্ছন্ন।

মহাকালের আঘাত এবং নিরাময়- 

প্রকৃতির এই খেলার আরেকটি অব্যর্থ অস্ত্র হলো সময় বা মহাকাল। প্রকৃতি যখন তার সৃষ্টির অস্তিত্ব কেড়ে নেয়, তখন মানুষের মনে যে শূন্যতা ও দুঃখের বাতাবরণ সৃষ্টি হয়, তা অত্যন্ত গভীর। কিন্তু সময় এখানে এক আশ্চর্য ভূমিকা পালন করে। যে সময় একদিন নির্মমভাবে সবকিছু কেড়ে নিয়ে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল, সেই সময় আবার ধীরে ধীরে সেই ক্ষতের ওপর নিরাময়ের প্রলেপও লাগিয়ে দেয়।

সাধারণ মানুষ প্রকৃতির এই চক্রের সাথে একমত হোক বা না হোক, সৃষ্টির প্রথম দিন থেকে এই আবর্তন আপন নিয়মেই চলে আসছে। জীবন এবং মৃত্যুর এই খেলা, মায়ার এই আবরণ—এ সবই এক বৃহত্তর ঐকতানের অংশ। এই সত্যকে উপলব্ধি করতে পারলেই হয়তো শরীর বা পার্থিব অহংকারের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষ সেই অনন্তের যাত্রাকে আরও প্রশান্তির সাথে গ্রহণ করতে পারে।

লেখনীতে - রবীন মজুমদার 
২৪/০৩/২৬
নিউ টাউন , কলকাতা। 


মন্তব্যসমূহ

নামহীন বলেছেন…
Excellent explanation. I am fully convenienced with this

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)