৪০২ যে আপন গৃহে মানুষ কখনই যেতে চায় না

 ৪০২ যে আপন গৃহে মানুষ কখনই যেতে চায় না

বিপিনবাবু আজকাল একটু সন্দেহপ্রবণ হয়ে উঠেছেন। 
না, অফিসের ফাইল চুরি হচ্ছে এমন সন্দেহ নয়—নিজের জীবনটাই যেন চুরি হয়ে গেছে, এই সন্দেহ।

ডালহৌসি স্কোয়ারের সেই পুরোনো সরকারি দালানে বসে তিনি যখন সারাদিন কাগজে সই করতে করতে নিজের নামটাকেই অপরিচিত মনে করতে শুরু করেন, তখনই বুঝতে পারেন—কিছু একটা গড়বড় আছে।

আজও ৫:৩০ বাজার সঙ্গে সঙ্গে তিনি যেন বন্দি পাখির মতো খাঁচা খুলে বেরিয়ে এলেন। ট্রাম, তারপর শিয়ালদহ, তারপর সেই চিরচেনা বনগাঁ লোকাল—সব যেন এক যান্ত্রিক নাটকের পুনরাবৃত্তি।

কিন্তু আজ ট্রেনের জানলার ধারে বসে হঠাৎ একটা অদ্ভুত চিন্তা মাথায় ঢুকে পড়লো—

“আমি কোথায় যাচ্ছি?”

না, প্রশ্নটা ভৌগোলিক নয়।
বনগাঁ লাইনের শেষ স্টেশন পর্যন্ত তিনি বহুবার গেছেন—সেখানে নতুন কিছু নেই।

প্রশ্নটা ছিল—
“আমি আসলে কোথায় ফিরছি?”

প্রথম প্রথম বাড়ি মানেই ছিল বনলতা। ছাদের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা একজোড়া চোখ, যার জন্য লোকাল ট্রেনের প্রতিটা মিনিট যেন ঘণ্টা হয়ে যেত।

তারপর বিয়ে, তারপর চামেলী—
বাড়ি তখন একটা শব্দ নয়, একটা আবেগ।

কিন্তু আজকাল?
আজকাল বনলতার “চা খাবে?” প্রশ্নটা এমন এক সুরে আসে, যেন সেটা আদেশ না অডিট রিপোর্ট বোঝা যায় না।

চামেলীর চোখে বাবার প্রতি সেই চেনা ভালোবাসার বদলে একরাশ “তুমি কিছু বোঝো না” টাইপের দৃষ্টি।

আর আশ্চর্যের বিষয়—

এই সব কিছুর মধ্যে বিপিনবাবু অফিসকেই খুঁজে পান। বড়কর্তার ধমক আর বনলতার গর্জন—একই স্কেল।

অফিসের জুনিয়রের অবজ্ঞা আর মেয়ের বিরক্তি—একই ব্যাকরণ। তখন তার মনে হয়—
“আমি কি বাড়ি ফিরছি, না অফিসের দ্বিতীয় শাখায় যাচ্ছি?”

মধ্যমগ্রাম স্টেশন পেরোতেই ভিড় একটু কমলো। একটু হাওয়া এলো।

হাওয়াটা যেন কোথা থেকে এক পুরোনো বিকেল নিয়ে এলো—
আমবাগান, বৃষ্টি, আর লুকিয়ে হাত ধরা।

সেই সময় ভালোবাসা ছিল অভিযান।
এখন সেটা দায়িত্বের ফাইল।

তখন একটা স্পর্শ ছিল আবিষ্কার,
এখন সেটা রুটিন।

বিপিনবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“মনটাই বোধহয় ভালো ছিল,” তিনি ভাবলেন,
“দেহটা পরে এসে সব গুলিয়ে দিল।”

হঠাৎ তার মনে হলো—
তিনি যেন একজন কৃষক।

কাঁধে লাঙল, সারাজীবন চাষ করে যাচ্ছেন।
ফসল ফলছে, কিন্তু সেটা তার নিজের পাতে উঠছে না।

অফিসে কাজ—বাড়িতে দায়িত্ব—
দুটোর মাঝখানে তিনি যেন এক চ্যাপ্টা মানুষ।

এবার ট্রেনটা শেষের দিকে এগোচ্ছে।

বিপিনবাবু হঠাৎ নিজের কাছে এক ভয়ংকর প্রশ্ন করলেন—

“এই বাড়িটা কি সত্যিই আমার?”

যে বাড়ির জন্য এত দৌড়, এত তাড়া—
সেটা কি আশ্রয়, না একটা অভ্যাস?

যদি সেটা নিজের না হয়—
তাহলে নিজের বাড়ি কোথায়?

ট্রেন থামলো।

সবাই নামছে, ঠেলাঠেলি করছে।
বিপিনবাবুও নামলেন।

কিন্তু আজ তিনি একটু ধীরে হাঁটলেন।

কারণ তিনি জানেন—
যে বাড়িতে তিনি যাচ্ছেন, সেটা তার ঠিকানা, কিন্তু তার আশ্রয় নয়।

সেই দিন রাতে, খাওয়া-দাওয়া সেরে, সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর
বিপিনবাবু ছাদে উঠলেন।

আকাশের দিকে তাকালেন।

তারপর হালকা হেসে বললেন—

“আসল বাড়িটা বোধহয় ওখানেই…
যেখানে ফিরে যেতে কেউ তাড়া দেয় না,
আর কেউ অপেক্ষাও করে না।”

তারপর তিনি নিচে নেমে এলেন।

পরদিন আবার ৫:৩০-এ ছুটি হবে,
আবার দৌড় শুরু হবে।

কিন্তু পার্থক্য একটাই—

আজ তিনি জানেন,
তিনি কোথায় যাচ্ছেন না।

লেখনীতে - রবীন মজুমদার 
২৬/০৩/২৬
নিউ টাউন , কলকাতা। 
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 


 



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)