৪০৪ মহিষাসুর না থাকিলে দেবী দুর্গাকে কে চিনিত:

৪০৪  মহিষাসুর না থাকিলে দেবী দুর্গাকে কে চিনিত: 


একদিন বিকেলে বসে ভাবছিলাম—এই পৃথিবীতে যদি সব মানুষই  ভদ্র থাকতেন, তাহলে ইতিহাস বইয়ের কী হাল হতো! প্রথম পাতাতেই লেখা থাকত— “সবাই ভালো ছিল, তাই আর কিছু ঘটেনি।”
বই বন্ধ।

এই জায়গাতেই এসে হাজির হন মহিষাসুর। তিনি ভদ্রলোক ছিলেন না—এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান।

 মহিষাসুর: একটু বেশি ‘আমি-আমি’ করা মানুষ

মহিষাসুরকে আমরা সাধারণত দানব বলি। কিন্তু একটু ভেবে দেখুন, তিনি আসলে আমাদেরই চেনা এক প্রজাতি—যারা অফিসে ঢুকেই ভাবে, “এই কোম্পানিটা আমিই চালাই।”যারা বাড়িতে ঢুকেই ভাবে, “এই সংসারটা আমার ইশারায় চলে।”

অর্থাৎ, মহিষাসুর আসলে একেবারে আধুনিক। তিনি শুধু একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিলেন—পৃথিবীটাই নিজের বলে ধরে নিয়েছিলেন।

দেবতাদের বিপদ: যখন ‘ম্যানেজমেন্ট’ ফেল করে

এবার সমস্যা হলো, দেবতারা কেউই তাঁকে সামলাতে পারছেন না। যাকে বলে—সব সিনিয়র ম্যানেজার ব্যর্থ। তখন তারা মিটিং ডাকলেন।
 এজেন্ডা: “এখন কী করা যায়?”

অনেক ভেবেচিন্তে তারা তৈরি করলেন এক নতুন ‘প্রজেক্ট’—দেবী দুর্গা

এ যেন কর্পোরেট ভাষায়—
“একজন নতুন CEO আনতে হবে, যিনি আগের সব সমস্যার সমাধান করবেন।”

নারীশক্তি: ‘ইমার্জেন্সি প্রোডাক্ট’ না ‘চূড়ান্ত সমাধান’?

এখানে একটু থামা দরকার। দেবী দুর্গা কিভাবে এলেন? সব দেবতার শক্তি মিলিয়ে। অর্থাৎ, যতদিন নিজেরা পারছিলেন, ততদিন নারীশক্তির দরকার হয়নি।যখন আর পারলেন না—তখন বললেন, “এবার একজন নারী দরকার।”

শুনতে একটু চেনা লাগছে না? বাড়িতে ঝগড়া হলে, শেষে কে মিটমাট করে?অফিসে গোলমাল হলে, কে এসে সব গুছিয়ে দেয়?  হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন।

“নারী ছাড়া বধ নয়”: গল্পের মোক্ষম মোচড় 

মহিষাসুর একটা বর পেয়েছিলেন— কোনো পুরুষ তাকে মারতে পারবে না। এটা শুনে প্রথমে মনে হয়, “বাহ, কী চালাকি!” কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই চালাকিটাই তাঁর বিপর্যয় হয়ে দাঁড়ায়।  কারণ তিনি ভাবতেই পারেননি—যে শক্তিকে তিনি গণনাতেই ধরেননি, সেই শক্তিই একদিন তাঁকে শেষ করবে। এটাই ইতিহাসের চিরন্তন নিয়ম—আপনি যাকে অবহেলা করেন, সে-ই একদিন আপনার সামনে দাঁড়িয়ে বলে,“এবার একটু কথা বলি?”

আমাদের ঘরের ভেতরের দুর্গা ও মহিষাসুর

এখন একটু নিজের দিকে তাকান। বাড়িতে যখন আপনি বেশি ‘অর্ডার’ দিতে শুরু করেন  কিংবা অফিসে যখন আপনি মনে করেন, “আমার ছাড়া কিছুই চলে না”-সমাজে যখন কোনো গোষ্ঠী নিজেকে সর্বশক্তিমান ভাবে-ঠিক তখনই, কোথাও না কোথাও, এক নতুন শক্তি জন্ম নিচ্ছে।

সেই শক্তি হয়তো চুপচাপ। হয়তো সে এখনো কথা বলছে না। কিন্তু সময় এলেই সে বলবে—“এবার যথেষ্ট হয়েছে।”

মহিষাসুরের প্রয়োজন কেন?

 প্রশ্নটা খুব গুরুত্বপূর্ণ— মহিষাসুর না থাকলে কি হতো?
খুব সহজ উত্তর— আমরা দেবী দুর্গাকে চিনতাম না।

আর একটু কঠিন উত্তর—

আমরা বুঝতেই পারতাম না, শক্তির আসল রূপ কোথায় লুকিয়ে আছে। কারণ, শক্তি তখনই প্রকাশ পায়, যখন তাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়।

 ভয়ের নয়, বোঝার গল্প

তাই মহিষাসুরকে শুধু ঘৃণা করলে হবে না—তাকে বুঝতে হবে। কারণ, তিনি আমাদের বাইরের কেউ নন— তিনি আমাদের ভেতরের সেই অংশ, যে মাঝে মাঝে ভাবে, “আমি-ই সব।”

আর দেবী দুর্গা? তিনি সেই শক্তি, যে চুপ করে থাকে, কিন্তু প্রয়োজন হলে সবকিছু বদলে দেয়।

পুজোর সময় আমরা অসুর বধ দেখি, ঢাক শুনি, আনন্দ করি। কিন্তু যদি একটু মন দিয়ে দেখি— এই যুদ্ধটা বাইরে নয়, ভেতরেই চলছে।

২৮/০৩/২৬
লেখনীতে রবীন মজুমদার 
নিউ টাউন , কলকাতা। 
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)