৪০৫ মাথার ভাড়া-বাড়ি: এক দারোয়ান, দুই ভাড়াটে, আর এক অসহায় মালিক

 ৪০৫ মাথার ভাড়া-বাড়ি: এক দারোয়ান, দুই ভাড়াটে, আর এক অসহায় মালিক


ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স-এর উপর  ড্যানিয়েল  গোলমানের   "ফোকাস" এর অন্তর্গত   "এটেনশন টপ এন্ড বটম" অবলম্বনে লেখা -

একদিন আবিষ্কার করলাম যে , আমার মাথাটা মানে আমার হেডঅফিস,  সে যেন একটা ভাড়া-বাড়ি। তবে এই বাড়ির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, মালিক আমি হলেও, এই মাথার নিয়ন্ত্রণ আমার হাতে নেই।

বাড়িতে থাকে মোটে তিনজন— একজন নিচতলার ভাড়াটে যার নাম 'উল্টে' তার একটা ইংরেজি নাম আছে 'বটম আপ'। একজন ছাদের ঘরের ভাড়াটে 'পাল্টে' তার আবার ইংরেজি নাম 'টপ ডাউন',  আর একজন দারোয়ান 'আবেগ' তার আবার সাহেবি নাম ' অ্যামিগডালা'। আর আমি? একজন বাড়িওয়ালা, আমি শুধু ভাড়া তুলি—তাও মাঝে মাঝে! 

এরা আমার বাড়িতে বসবাস করার সাথে সাথে নির্দিষ্ট কিছু কাজও তারা করে। আমি আবার দূর থেকে সেটা নজর করি। আমি দ্রষ্টা আর তারা দৃশ্য। 

নিচতলার ভাড়াটে ভীষণ পরিশ্রমী। সে কখনও ছুটি নেয় না, বেতন চায় না, কিন্তু বাড়ির প্রায় সব কাজ করে। সকালে দাঁত মাজা, চা খাওয়া, রাস্তায় হাঁটা—সব সে সামলায়। 

আমি তখন ভাবি—“দেখো, আমি কী সুন্দর নিয়ম মেনে জীবন কাটাচ্ছি!” আসলে আমি কিছুই করছি না—সব করছে সে। 

কিন্তু এই ভদ্রলোকের একটা সমস্যা আছে—সে একটু বেশিই স্বাধীনচেতা।

যেমন— আমি ঠিক করেছি, আজ থেকে ডায়েট করব। নিচতলার ভাড়াটে বললো—“ঠিক আছে, কিন্তু ফ্রিজে যে কেকটা আছে, ওটা তো ফেলে দেওয়া ঠিক হবে না!” 

আসলে সেটা গিয়ে দাঁড়ালো —ডায়েট শুরু হওয়ার আগেই শেষ।

 এবার আসা যাক আমার ছাদের ভাড়াটে পাল্টের সম্পর্কে আমার মূল্যায়নে - ছাদের ভাড়াটে খুব ভদ্র, খুব শিক্ষিত, একটু অহংকারীও।সে মাঝে মাঝে নিচে নেমে এসে বলে—

“দেখো, তোমরা যা করছো, সেটা ঠিক হচ্ছে না।”

এই ভদ্রলোকই আমাকে বই পড়তে বসায়, পরিকল্পনা করায়, বড় বড় স্বপ্ন দেখায়।তাঁর জন্যই আমি মাঝে মাঝে ভাবি—“আমি একদিন মহান হবো!”

কিন্তু সমস্যা হলো—এই ভদ্রলোক ঠিক সময়ে ঠিক কাজটা করতে জানেন না।

যেমন, আমি একদিন রাস্তায় হাঁটছি। নিচতলার ভাড়াটে খুব সুন্দরভাবে হাঁটাচলা সামলাচ্ছে। হঠাৎ ছাদের ভাড়াটে নেমে এসে বললো—“দেখি তো, তোর পা ঠিকভাবে পড়ছে তো?”

ব্যস!

তারপর থেকে হাঁটাটা আর স্বাভাবিক রইলো না। ডান পা আগে না বাঁ পা—এই চিন্তায় আমি প্রায় পড়ে যাচ্ছিলাম।

যেখানে চিন্তা সেখানেই  বিপদ-একবার টিভিতে দেখছিলাম, এক দৌড়বিদ শেষ মুহূর্তে হেরে গেল। 

কারণ?

সে ভাবতে শুরু করেছিল—“আমি ঠিকভাবে দৌড়াচ্ছি তো?”

এইটাই মানুষের ট্র্যাজেডি। যে কাজটা আমরা হাজারবার করেছি, সেটাকে যদি একবার চিন্তা করে করতে যাই— তাহলেই সর্বনাশ। 

যেমন— সাইকেল চালানো। আপনি যদি হঠাৎ ভাবেন—“আমি কীভাবে ভারসাম্য রাখছি?” তাহলে নিশ্চিত পড়বেন। 

 এবার আসি বাড়ির সবচেয়ে নাটুকে চরিত্র—দারোয়ান। দারোয়ান আবেগ যেমন সতর্ক তেমনি ভীরু। এই ভদ্রলোকের কাজ হলো—বিপদ দেখলে সবাইকে সতর্ক করা। কিন্তু সমস্যা হলো—তিনি সবকিছুকেই বিপদ মনে করেন।
বিড়াল দেখলে বলেন—“বাঘ!”
ছোট সমস্যা দেখলে বলেন—“জীবন শেষ!”
একদিন আমি হালকা পিঠে ব্যথা পেলাম।
দারোয়ান চিৎকার করে বললো—
“শেষ! তুমি আজীবনের জন্য শয্যাশায়ী!”
তারপর কী হলো জানেন?
আমি গুগলে সার্চ করতে করতে নিজেই নিজের রোগ নির্ণয় করে ফেললাম—এবং দেখলাম, আমি প্রায় মৃত। 
এবার আসা যাক, নিচতলার ভাড়াটের ষড়যন্ত্র আর বিজ্ঞাপনের হাল হকিকৎ নিয়ে দু-চার কথা -
একদিন বাজারে গিয়ে দেখলাম, আমি এমন সব জিনিস কিনছি, যার দরকার আমার নেই। একটা চকচকে বোতল, একটা অদ্ভুত চকলেট, আর এক জোড়া জুতো—যা আমার পায়ে লাগে না। 
পরে বুঝলাম, নিচতলার ভাড়াটে আগেই সব ঠিক করে রেখেছিল। 
বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে বোঝানো হয়েছে—“এই জিনিস কিনলেই তুমি সুখী হবে।”
সে বিশ্বাস করেছে। আমি বিল মিটিয়েছি।
 অটোপাইলট জীবন
সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো— আমরা প্রায় সারাদিনই অটোপাইলটে চলি। একদিন রেস্টুরেন্টে বসে আছি।
ওয়েটার জিজ্ঞেস করলো—“খাবারটা ভালো লাগছে?”
আমি বললাম—“না, এখনও খাইনি।”
কিন্তু প্লেট তখন প্রায় খালি। 
এই উত্তরটা আমি দিইনি— আমার নিচতলার ভাড়াটে দিয়েছে।
 মালিকের দুঃখ
সবশেষে বুঝলাম— 
এই বাড়ির মালিক আমি হলেও, আসলে আমি একজন অসহায় মধ্যস্থতাকারী।

নিচতলার ভাড়াটে বলে—“মজা করো।”
ছাদের ভাড়াটে বলে—“সংযম রাখো।”
দারোয়ান বলে—“সবাই বিপদে!”

আর আমি দাঁড়িয়ে ভাবি—
“কাকে শুনবো?”

মানুষের জীবন আসলে এক অদ্ভুত নাটক—
যেখানে অভিনেতারা সবাই নিজের নিজের সংলাপ বলে যাচ্ছে, কিন্তু পরিচালক ঘুমিয়ে আছে। তাই বুদ্ধিমান সেই,  যে মাঝে মাঝে নিজের মাথার ভাড়া-বাড়িতে গিয়ে বলে—
 “এই যে, তোমরা একটু চুপ করো তো! আমি একটু বাঁচি!”

২৯/০৩/২৬
লেখনীতে রবীন মজুমদার 
নিউ টাউন , কলকাতা। 
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 

মন্তব্যসমূহ

নামহীন বলেছেন…
খুব সুন্দরভাবে লেখা। পড়ে ভালো লাগলো।
Ani বলেছেন…
দুর্দান্ত লিখেছো। অসাধরণ। সত্যি, এই সব লেখা প্রকাশিত হওয়ার দরকার।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)