৪০৬ মন-ভ্রমণ, ইঁদুরের অ্যানিমেশন ও নাতি-উপাখ্যান
৪০৬ মন-ভ্রমণ, ইঁদুরের অ্যানিমেশন ও নাতি-উপাখ্যান
ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স-এর উপর ড্যানিয়েল গোলমানের "ফোকাস" এর অন্তর্গত "Finding Balance" অবলম্বনে লেখা -
পণ্ডিতেরা কিতাবে লিখে গেছেন—মন নাকি বড়ই চঞ্চল। তা তাঁরা বলতেই পারেন, কারণ তাঁদের আমলে বোধহয় হাতে হাতে এই স্মার্টফোন নামক জাদুবাক্সটি ছিল না। আজকাল মন শুধু চঞ্চল নয়, রীতিমতো পাখা গজিয়ে বিশ্বভ্রমণ করে বেড়াচ্ছে।
সেদিন দুপুরে জম্পেশ একখানা আহারের পর, ইজিচেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে ভাবছি—এইবার একটু সেই ‘মাইন্ডফুলনেস’ বস্তুটার চর্চা করা যাক। মনকে টেনে হিঁচড়ে একেবারে ‘বর্তমান মুহূর্তে’ নামিয়ে আনতে হবে। চোখ দুটি আধবোঁজা করে, শ্বাস-প্রশ্বাসে মন দিয়ে সবেমাত্র নিজের মন নামক বেয়াড়া ঘোড়াটার লাগাম টেনে ধরেছি, ভাবছি—আহা, কী অনাবিল শান্তি! এই বুঝি নির্বাণ লাভ হলো বলে!
ঠিক তখনই কানের কাছে এক মোক্ষম আওয়াজ— "দাদু!"
তড়ফড়িয়ে উঠে দেখি, সামনে আমার নাতি বাবাজি দণ্ডায়মান। চোখেমুখে এক রাশ উত্তেজনা। বিরক্তি চেপে বললাম, "কী রে ভাই? দেখছিস না দাদু এখন গভীর ধ্যানে মগ্ন?" সে ভারী তাজ্জব হয়ে বলল, "ধ্যান? কিন্তু তুমি তো দিব্যি নাক ডাকছিলে!"
বুঝুন ঠেলা! এই জন্যই বোধহয় মুনি-ঋষিরা সব হিমালয়ে পালাতেন। এই ঘোর সংসারে মেটা-অ্যাওয়ারনেস (meta-awareness)-এর কিস্যু দাম নেই। আমি গলা খাঁকারি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টায় বললাম, "ওটা নাক ডাকা নয় হে, ওটা হলো গভীর দীর্ঘশ্বাসের আওয়াজ। তা তোর তলব কেন, সেটা খোলসা করে বল দেখি।"
নাতি তার হাতের যন্ত্রটি আমার মুখের সামনে বাগিয়ে ধরে বলল, "দাদু, দেখো, আমি একটা নতুন গল্প বানিয়েছি, আর সেটাকে নিজেই অ্যানিমেশন করেছি!"
আমি তো থ! যে বয়সে আমরা আমগাছে ঢিল ছুঁড়তাম আর কাদা মেখে ভূত হতাম, সে বয়সে এ ছেলে গল্প ফেঁদে রীতিমতো অ্যানিমেশন বানাচ্ছে! কৌতূহলবশত তাকালাম স্ক্রিনের দিকে। দেখলাম, একটা ইঁদুর তাড়া খেয়ে ছুটছে, আর তার পেছনে এক পেল্লায় বেড়াল। হঠাৎ ইঁদুরটা ঘুরে দাঁড়িয়ে বেড়ালটাকে দিব্যি রবীন্দ্রনাথের কবিতা শোনাতে শুরু করল!
আমি ভিরমি খেয়ে বললাম, "এ কী তাজ্জব ব্যাপার! ইঁদুর আবার রবীন্দ্রগবেষক হলো কবে থেকে?" নাতি অতিশয় বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে বলল, "কেন হবে না? মন তো যেখানে খুশি যেতে পারে। আমার ইঁদুরের মন-ভ্রমণ হয়েছে, সে সোজা শান্তিনিকেতনে চলে গেছে!"
আমার তখন চক্ষু চড়কগাছ! আমি সারা দুপুর ধরে মনকে ‘এখানে এবং এখন’-এ বেঁধে রাখার কসরত করছি, আর আমার এই খুদে নাতি কিনা তার ইঁদুরের মনকে অ্যানিমেশনের জোরে সোজা শান্তিনিকেতনে পাঠিয়ে দিয়েছে! ভাবলাম, গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ যদি আজ থাকতেন, তবে এই ‘মাইন্ডলেস’ যুগের অ্যানিমেটেড ইঁদুর দেখে নির্ঘাত হাসিতে ফেটে পড়তেন।
অগত্যা নিজের ‘মাইন্ডফুলনেস’-এর খাতা গুটিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, "বটে! তা তোর বেড়ালটা কী বলছে?" নাতি একগাল হেসে বলল, "বেড়ালটা বলছে—'থাম থাম! তোর কবিতা শুনে আমার মন এখন বর্তমান মুহূর্তে ফিরে এসেছে!'"
আমি আর কী বলি! বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না বটে, তবে নাতির পাল্লায় পড়লে দাদুর ধ্যানভঙ্গ হতে বাধ্য! আমি ল্যাপটপ-ট্যাপটপ শিকেয় তুলে ঠিক করলাম, মনকে আর জোর করে আটকে রেখে কাজ নেই। তার চেয়ে নাতির ওই ইঁদুর-বেড়ালের অ্যানিমেটেড জগতেই বরং একটু ‘মন-ভ্রমণ’ করে আসি। কারণ ওই যে, আনন্দ তো লুকিয়ে আছে এই ‘এখানে এবং এখন’-এই!
মন্তব্যসমূহ