মানুষ সুখী হতে চায়—এটা এমন এক তথ্য, যা প্রমাণ করার জন্য কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণার দরকার নেই। কারণ, যেদিন থেকে মানুষ প্রথম ভাতের হাঁড়ি চাপিয়েছে, সেদিন থেকেই সে ভেবেছে—“আজ যদি একটু শান্তিতে খেতে পারতাম!”কিন্তু দুঃখের বিষয়, সেই শান্তি আজও হাঁড়ির ঢাকনার সঙ্গে কোথাও হারিয়ে গেছে।
মহাবিশ্ব নাকি খুব বড় জিনিস। এত বড় যে, আমাদের সুখ-দুঃখ নিয়ে তার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। সে নিজের মতো করে নক্ষত্র পাঠাচ্ছে, গ্রহ বানাচ্ছে, আবার মাঝেমধ্যে উল্কাপিণ্ড ছুঁড়ে দিচ্ছে—যেন কোনো বিরক্ত গৃহস্থ আলমারি পরিষ্কার করতে গিয়ে পুরোনো জিনিসপত্র জানালা দিয়ে ফেলে দিচ্ছে।
আমরা নিচে দাঁড়িয়ে ভাবছি—“এইবার বুঝি মাথায় পড়ল!”
পৃথিবীকে আমরা ‘মা’ বলে ডাকি। কিন্তু এই মায়ের স্বভাব একটু অদ্ভুত। কখনো বন্যা দিয়ে ভাসিয়ে দেয়, কখনো খরা দিয়ে শুকিয়ে দেয়, আবার মাঝে মাঝে ভাইরাস নামের অদৃশ্য অতিথি পাঠিয়ে দেয়—যাদের আপ্যায়নের কোনো উপায়ই আমাদের জানা নেই।
মা যদি এমন হন, তবে শাশুড়ির কথা না বলাই ভালো।
যাই হোক, মানুষ হাল ছাড়ার পাত্র নয়। সে আগুন আবিষ্কার করল, চাকা বানাল, বিদ্যুৎ ধরল, তারপর ভাবল—“এবার বুঝি সুখ এসে গেল!”
কিন্তু সুখ তখন পাশের গলিতে দাঁড়িয়ে হেসে বলল—“দেখি, তুমি আর কতদূর যাও!”
আমরা যখন নতুন ওষুধ বানাই, তখন নতুন রোগও তৈরি হয়ে যায়।
আমরা যখন যুদ্ধ ঠেকাতে অস্ত্র বানাই, তখন সেই অস্ত্রই যুদ্ধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আমরা যখন খাবার বাড়াই, তখন জনসংখ্যা বাড়ে।
সব মিলিয়ে ব্যাপারটা এমন—আপনি যদি ঘরের একপাশ পরিষ্কার করেন, অন্যপাশে ধুলো জমবেই।
একজন ভদ্রলোক ছিলেন—তিনি ভাবলেন, “আমি যদি অনেক টাকা কামাই, তবে নিশ্চয়ই সুখী হব।”
তিনি টাকা কামালেন। তারপর দেখলেন—তার বন্ধুদের গাড়ি তার চেয়ে বড়, তাদের বাড়ি তার চেয়ে উঁচু, আর তাদের সুখ তার চেয়ে বেশি (কমপক্ষে ফেসবুকে তাই দেখা যায়)।
তখন তিনি বুঝলেন—সুখ আসলে প্রতিবেশীর জিনিস।
আবার একজন গরিব মানুষ আছেন—তিনি ভাবেন, “একবেলা পেট ভরে খেতে পারলেই আমি খুশি।”
কিন্তু যেদিন তিনি পেট ভরে খেয়ে ফেলেন, সেদিন থেকেই তিনি ভাবতে শুরু করেন—“মাছটা যদি একটু বড় হত!” অর্থাৎ, সুখ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না—সে সর্বদা আমাদের এক কদম সামনে হাঁটে।
এই অবস্থায় কিছু বিচক্ষণ মানুষ কী করলেন? তারা ঠিক করলেন—“বাহিরের জগতকে বদলানো কঠিন, তার চেয়ে নিজের মাথাটাকেই একটু ঠিক করা যাক!”
তারা দেখলেন, সুখ আসলে কোনো জিনিস নয়—এটা এক ধরনের কৌশল।
যে ব্যক্তি বাসে দাঁড়িয়ে থেকেও জানালার হাওয়া উপভোগ করতে পারে, সে সুখী।
আর যে ব্যক্তি এসি ঘরে বসেও অভিযোগ করে—“আজ একটু বেশি ঠান্ডা”—সে চিরঅসুখী।
এই বিশেষ শ্রেণির মানুষদের চেনার সহজ উপায় আছে।
তারা কঠিন কাজকে খেলা বানিয়ে ফেলে, একঘেয়ে কাজেও আনন্দ খুঁজে পায়, আর জীবনের প্রতিটি ঘটনাকে এমনভাবে নেয়—যেন সবই আগেই ঠিক করা ছিল।
তাদের দেখে মাঝে মাঝে মনে হয়—এরা বোধহয় মহাবিশ্বের সঙ্গে গোপনে কোনো চুক্তি করেছে!
শেষ কথা হলো—
মহাবিশ্ব আমাদের জন্য বিশেষ কিছু ভাবেনি, পৃথিবী আমাদের জন্য বিছানা পেতে রাখেনি, আর সুখও আমাদের দরজায় কড়া নাড়ে না।
সুখকে ধরতে হলে একটু কৌশল করতে হয়।
অর্থাৎ—
মহাবিশ্বকে বদলানো যাবে না, কিন্তু নিজের মেজাজটা একটু বদলানো গেলে মন্দ হয় না।
আর সেটাই মানুষ আজও শিখছে— কেউ শিখছে হাসতে হাসতে, কেউ শিখছে কাঁদতে কাঁদতে, আর কেউ কেউ—
আমার মতো—লিখতে লিখতে!
৩১/০৩/২৬
লেখনীতে রবীন মজুমদার
নিউ টাউন , কলকাতা।
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।
মন্তব্যসমূহ