৪০৭ বঞ্চনার বুমেরাং: এক ভদ্রলোকের আত্মকথা

৪০৭  বঞ্চনার বুমেরাং: এক ভদ্রলোকের আত্মকথা


আমার এক আত্মীয় আছেন—নামধাম বলা বারণ, কারণ তিনি এখনো সমাজে “বিশ্বাসযোগ্য” মানুষ হিসেবে পরিচিত। তবে এই বিশ্বাসযোগ্যতার ভিতটা যে কতটা পলিথিনের মতো, তা তিনি নিজেও জানেন, আমিও জানি—শুধু সমাজ জানে না। সমাজ সাধারণত একটু দেরিতে জানে, আর জানলে এমনভাবে জানে যে, আর জানার মতো কিছুই থাকে না।

এই ভদ্রলোকের একটি অদ্ভুত গুণ আছে—তিনি কখনো সরাসরি মিথ্যা বলেন না, তিনি “পরিস্থিতিকে একটু ঘুরিয়ে দেন”। একদিন তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম,
—“আপনি কি মিথ্যা বলেন?”
তিনি খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললেন,
—“না রে বাবা, আমি সত্যকে একটু বিশ্রাম দিই মাত্র!”

এই “বিশ্রাম দেওয়া” সত্যটা যে একদিন উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করবে, তা তিনি ভাবেননি।

প্রথম প্রথম ব্যাপারটা বেশ মজার ছিল। তিনি এক জায়গায় একরকম কথা বলছেন, আরেক জায়গায় আরেকরকম। ফলে তাঁর জীবনটা হয়ে উঠল এক ধরনের মাল্টিপ্লেক্স সিনেমা—একই মানুষ, কিন্তু বিভিন্ন স্ক্রিনে বিভিন্ন চরিত্র। কোথাও তিনি সৎ, কোথাও তিনি অসৎ, কোথাও তিনি নিরীহ, কোথাও আবার ভীষণ বুদ্ধিমান।

কিন্তু সমস্যা হলো—টিকিট কেটে সবগুলো সিনেমা একসঙ্গে দেখা তাঁর পক্ষেও সম্ভব হচ্ছিল না।

একদিন দেখলাম, ভদ্রলোক খুব চিন্তিত।
—“কি হলো?”
—“দেখ তো, আমি কাল কোথায় ছিলাম?”
—“সে তো আপনি জানবেন!”
—“সেই তো সমস্যা! আমি তিন জায়গায় তিন রকম বলেছি। এখন কোনটা সত্যি, তা মনে করতে পারছি না!”

এই অবস্থাকে দার্শনিকরা বলেন “অস্তিত্ব সংকট”—আর আমি বলি “মিথ্যার জ্যাম”।

এরপর শুরু হলো দ্বিতীয় অধ্যায়—সন্দেহ।
যে মানুষ সারা জীবন অন্যকে ঠকিয়েছে, সে একদিন আবিষ্কার করল—সবাই তাকে ঠকাতে পারে। দোকানদার পাঁচ টাকার বেশি নিলেই তিনি ভাবেন, “এই তো! শুরু হয়ে গেল!”
স্ত্রী একটু দেরিতে বাড়ি ফিরলেই তিনি মনে করেন, “এতদিনে বুঝি আমাকেই ঠকানো হচ্ছে!”

আমি বললাম,
—“আপনি এত সন্দেহ করেন কেন?”
তিনি গম্ভীর হয়ে বললেন,
—“দেখ, মানুষকে আমি খুব ভালো চিনি!”

আমি মনে মনে বললাম, “আপনি আসলে নিজেকেই খুব ভালো চেনেন!”

এই যে “Mirror Effect”—মানে আয়নায় নিজের মুখ দেখে অন্যের মুখ বিচার করা—এটা ভদ্রলোকের জীবনে এমনভাবে ঢুকে গেল যে, তিনি আয়নাও বিশ্বাস করতে পারতেন না। একদিন নাকি আয়নায় নিজের মুখ দেখে বলেছিলেন,
—“এই লোকটা সন্দেহজনক!”

শেষ অধ্যায়টা সবচেয়ে নাটকীয়।
সত্যি কথা হলো—সত্য বড়ই বদমেজাজি জিনিস। তাকে বেশি দিন আটকে রাখা যায় না। একদিন সে হঠাৎ করে দরজা ভেঙে ঢুকে পড়ে।

ঠিক তাই হলো। একদিন ভদ্রলোকের সব “পরিস্থিতি ঘোরানো” কথাগুলো একসঙ্গে জোট বেঁধে বিদ্রোহ করল।
ফলাফল—তিনি সমাজে একেবারে “বিশ্বাসযোগ্য” থেকে “বিশ্বাস-যোগ্য নয়”-এ পরিণত হলেন।

এখন তিনি যখন সত্যি কথা বলেন, তখন কেউ বিশ্বাস করে না।
তিনি যদি বলেন, “আজ আকাশ নীল”,
লোকজন বলে, “নিশ্চয়ই বৃষ্টি হবে!”

এই অবস্থাকে আমি বলি—“বঞ্চনার চূড়ান্ত প্রতিশোধ”

শেষবার যখন তাঁর সঙ্গে দেখা হলো, তিনি খুব দার্শনিক ভঙ্গিতে বললেন,
—“জানো, জীবনটা আসলে একটা বুমেরাং।”
আমি বললাম,
—“হ্যাঁ, বিশেষ করে যখন সেটা আপনি নিজেই ছুঁড়েছেন!”

তিনি একটু হেসে বললেন,
—“তা ঠিক। আমি ভেবেছিলাম অন্যকে মারব, কিন্তু শেষে নিজেই কপালে খেলাম।”

আমি সান্ত্বনা দিয়ে বললাম,
—“কিছু যায় আসে না। অন্তত এখন আপনি সত্যি বলছেন।”

তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—“কিন্তু এখন আর কেউ বিশ্বাস করছে না!”

এই হলো বঞ্চনার সবচেয়ে মজার এবং করুণ পরিণতি—
যখন মানুষ সত্যি বলতে শেখে, তখন পৃথিবী তাকে মিথ্যাবাদী হিসেবে পেনশন দিয়ে দেয়।
বঞ্চনা এক ধরনের বিনিয়োগ—
লাভ হয় অল্পদিন, ক্ষতি হয় আজীবন, আর সুদ হিসেবে পাওয়া যায়—নিজের ওপর নিজেরই অবিশ্বাস। তাই বুদ্ধিমান লোকেরা এখন আর বুমেরাং ছোঁড়ে না—কারণ তারা জানে, শেষমেশ সেটা নিজের মাথাতেই ফিরে আসবে!
৩০/০৩/২৬
লেখনীতে রবীন মজুমদার 
নিউ টাউন , কলকাতা। 
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)