৩৯৮ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (২৫)
৩৯৮ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (২৫)
২৯শে সেপ্টেম্বর,১৮৯৪ আমেরিকা থেকে লেখা চিঠির ভাবার্থের অনুসরণে -সমুদ্রপারের চিঠি: শিকল ভাঙার গান
ভৌগোলিক দূরত্ব জিনিসটা বড় অদ্ভুত। মানুষ হাজার হাজার মাইল দূরে চলে যায়, কিন্তু মন পড়ে থাকে সেই চেনা পথের ধারে, যেখানে আছে এক ধুলোমাখা উঠোন, প্রাচীন গাছগাছালিতে ঘেরা একচালা একটি ঘরে।
১৮৯৪ সাল। আটলান্টিকের ওপারে এক সম্পূর্ণ অচেনা শহর, অচেনা মানুষজনের ভিড়। কিন্তু জানলার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা গেরুয়াধারী সন্ন্যাসীর চোখে ভাসছে দক্ষিণেশ্বরের সেই পাগলাটে ঠাকুরের মুখ। স্বামীজী বুঝছিলেন, শিকড় থেকে দূরে গেলেই বরং শিকড়ের টান সবচেয়ে বেশি টের পাওয়া যায়। রামকৃষ্ণের যে ভাব-আন্দোলন, তাকে তো শুধু গঙ্গার পাড়ে আটকে রাখলে চলবে না, তাকে ছড়িয়ে দিতে হবে পৃথিবীর এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে। তার জন্য চাই মানুষ, চাই নিজস্ব সংবাদপত্র, চাই একটা শক্ত ভিত। স্বপ্ন আর বাস্তবের এই যে সেতুবন্ধন—এটাই তো তাঁর জীবনের আসল কাজ।
তিনি মানুষ চিনতেন। খুব কাছ থেকে, আবার অনেক দূর থেকে, মানুষের মনের অন্ধকার গলিঘুঁজিগুলো তাঁর চেনা ছিল।
এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। এই যে আমাদের ভারতবর্ষ, হাজার বছরের পুরোনো এক দেশ—এরা আত্মাকে খুঁজতে গিয়ে শরীরটাকে একেবারে শিকল দিয়ে বেঁধে ফেলেছে। আবহমান কাল ধরে যে আত্মিক স্বাধীনতার অহংকার আমরা করে এসেছি, তা তলিয়ে গেছে ধর্মের অপরিণত, আধখেঁচড়া সিদ্ধান্তের পাঁকে। ধর্মের নামে একগাদা অর্থহীন নিয়ম, ছুতমার্গ আর কুসংস্কারের নাগপাশে আমরা সমাজটাকে এমনভাবে পেঁচিয়ে ফেলেছি যে, তার আর এগোবার কোনো উপায় নেই।
অন্যদিকে, এই পাশ্চাত্য দেশগুলো। এদের হাওয়া-বাতাসে একটা মুক্তির গন্ধ। এরা সমাজটাকে আগে স্বাধীন করেছে। ধর্ম এদের মাথার ওপর ছড়ি ঘোরায় না, তাই সমাজটা অনেক বেশি পরিণত। প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের এই যে ফারাক, এই যে দুই বিপরীতমুখী স্রোত—এটাই স্বামীজীর ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল।
প্রাচ্য বড্ড বেশি নিজের ভেতর সেঁধিয়ে গেছে, অন্তর্মুখী। আর পাশ্চাত্য বড্ড বেশি বাইরের দিকে দৌড়োচ্ছে, বহির্মুখী। পাশ্চাত্য বিশ্বাস করে, আগে একটা মজবুত সামাজিক উন্নতির জমির ওপর দাঁড়াতে হবে, তারপর যদি দরকার হয় ধর্মের উন্নতি করা যাবে। আর আমাদের প্রাচ্যের ভাবনাটা ঠিক উলটো—আমরা ধর্মের চশমা দিয়েই সামাজিক শক্তি অর্জন করতে চাই। এই এখানেই আমরা বারবার হোঁচট খেয়েছি। স্বামীজী খুব স্পষ্টভাবে দেখেছিলেন, আমাদের দেশের তথাকথিত সংস্কারকরা ধর্মের খোলসটাই ঘষামাজা করছেন। সব ধর্মের গভীরে যে আসল সত্যিটা লুকিয়ে আছে, সেই অতল জলে ডুব দেওয়ার সাহস বা ইচ্ছে—কোনোটাই তাঁদের নেই।
তাই তো তিনি ডাক দিয়েছিলেন এক নতুন সমাজ গড়ার। এমন এক সমাজ, যেখানে কোনো শিকল থাকবে না। না ধর্মের অন্ধ গোঁড়ামি, না সমাজের ভ্রুকুটি। নিজের আত্মাকে উদ্ধার করতে হবে নিজেকেই—'উদ্ধরেদাত্মনাত্মানম্'। কেউ ওপর থেকে এসে ম্যাজিকের মতো সব ঠিক করে দেবে না। এই যে নিজের ওপর বিশ্বাস, এই যে মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অসীম শক্তির জাগরণ—এটাই তো আসল মুক্তি। সমুদ্রের ওপার থেকে ভেসে আসা সেই দীর্ঘশ্বাস আর সেই বজ্রনির্ঘোষ আজও আমাদের চারপাশে ঘোরে। শুধু আমরাই কান পেতে শুনতে ভুলে গেছি।
ক্রমশঃ
মন্তব্যসমূহ