৪০৯ আমরা ঠকতে চাই
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
৪০৯ আমরা ঠকতে চাই
ঘড়িতে ভোটের ঘণ্টা বাজলেই বাঙালির ভেতরের দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী—সব একসাথে জেগে ওঠে। যে মানুষটি গত পাঁচ বছর ধরে বাজারে কুমড়োর দাম নিয়ে নিঃশব্দে হাহাকার করছিলেন, তিনিই হঠাৎ করে এমন ভঙ্গিতে “গণতন্ত্রের সংকট” ব্যাখ্যা করতে শুরু করেন যে, শুনলে মনে হয় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের চেয়ারটি বুঝি সাময়িকভাবে শ্যামবাজারে স্থানান্তরিত হয়েছে।
নির্বাচন নামক এই অপূর্ব যজ্ঞটি বড় বিচিত্র। এখানে দেবতা একজন—ভোটার, আর পুরোহিত বহুজন—প্রার্থী। তবে যজ্ঞ শেষে দেখা যায়, দেবতা প্রসাদ পান না, পুরোহিতরাই পেট ভরে খেয়ে নেন। ভোটের আগে প্রার্থীরা এমনভাবে আপনার দরজায় কড়া নাড়বেন, যেন আপনার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বহু জন্মের। “দাদা, আপনি না থাকলে আমরা কিছুই না”—এই বাক্যটি তারা এমন আন্তরিকতার সঙ্গে বলবেন যে, শুনে আপনার মনে হবে, আপনি না থাকলে রাষ্ট্রপতির পদটিও হয়তো খালি পড়ে থাকত।
ভোটের সময় প্রতিশ্রুতির যে বৃষ্টি হয়, তা বর্ষাকেও হার মানায়। রাস্তা হবে, কাজ হবে, হাসপাতাল হবে, এমনকি মাঝে মাঝে স্বর্গও নামিয়ে আনার আশ্বাস দেওয়া হয়। আমি একবার এক প্রার্থীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “আপনি এত কিছু করবেন, সময় পাবেন কোথায়?” তিনি মৃদু হেসে বললেন, “সময়ের অভাব হলে আমরা প্রতিশ্রুতি বাড়িয়ে দেব, কাজ কমিয়ে দেব।” এই সহজ সমীকরণটি বুঝতে আমার বেশ কয়েক বছর লেগেছিল।
ভোটকয়েন নামক এক অদ্ভুত মুদ্রারও প্রচলন আছে। এর মূল্য বাজারে নয়, ব্যালট বাক্সে নির্ধারিত হয়। এই মুদ্রা দিয়ে আপনি ভবিষ্যতের স্বপ্ন কিনতে পারেন—যদিও সেই স্বপ্নের ডেলিভারি তারিখ সাধারণত অনির্দিষ্ট। দোকানদার (অর্থাৎ নেতা) খুব ভদ্রভাবে বলে দেন, “সার, আপনার অর্ডারটি প্রক্রিয়াধীন আছে, পরবর্তী নির্বাচনের আগেই পৌঁছে যাবে।”
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই যে, এখানে সবাই সমান—ভোট দেওয়ার দিনে। সেই দিন আপনি ও আপনার পাড়ার ধনী ব্যবসায়ী একই লাইনে দাঁড়ান। তবে ভোটের পরদিন থেকেই সমতা একটু ছুটি নিয়ে চলে যায়। ব্যবসায়ীটি আবার ব্যবসায় ফিরে যান, আর আপনি ফিরে যান প্রতিশ্রুতির হিসাব কষতে।
আমাদের সমাজে চাহিদা ও যোগানের সম্পর্কটিও বড় রহস্যময়। চাহিদা বাড়ে, যোগান কমে—এটা অর্থনীতির নিয়ম। কিন্তু রাজনীতিতে দেখা যায়, চাহিদা যত বাড়ে, প্রতিশ্রুতির যোগান তত বাড়ে। ফলে সমস্যার সমাধান না হয়ে, সমস্যার উপর একটি সুদৃশ্য পর্দা টাঙানো হয়। দূর থেকে দেখলে মনে হয় সব ঠিক আছে, কাছে গেলে বোঝা যায়—পর্দার পেছনে আগের সেই পুরোনো গল্পই চলছে।
শিক্ষা ও চাকরির প্রসঙ্গে আসি। ছোটবেলায় আমাদের শেখানো হয়েছিল—“পড়াশোনা করলে মানুষ হবে।” এখন দেখা যাচ্ছে, মানুষ তো হচ্ছি, কিন্তু কাজটা কোথায় হবে, সেটা নিয়ে কেউ বিশেষ চিন্তিত নয়। সরকার বলে, “আমরা পরিকল্পনা করছি।” পরিকল্পনাটি এত দীর্ঘমেয়াদি যে, তা বাস্তবায়িত হতে হতে পরিকল্পনাকারীর নাতি-নাতনিরাও হয়তো ভোটার হয়ে যাবে।
তবে সব কিছুর পরেও, আমরা আশাবাদী। বাঙালি আশায় বাঁচে, আর ভোটে বাঁচে। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর আমরা নতুন করে বিশ্বাস করি—এইবার কিছু একটা বদলাবে। হয়তো বদলায়ও—প্রতিশ্রুতির ভাষা, নেতার মুখ, আর পোস্টারের রং। বাকিটা? সে তো আমাদের চিরপরিচিত, পুরোনো বন্ধুর মতো—যে কখনও ছেড়ে যায় না।
শেষমেশ বলা যায়, নির্বাচন এক অভিনব নাটক, যেখানে আমরা সবাই অভিনেতা, আবার দর্শকও। পার্থক্য শুধু এই—নাটকের টিকিট আমরা নিজেরাই কেটে দিই, আর করতালিটাও নিজেরাই দিই। আর পর্দা নামার পর যখন হিসাব মেলে না, তখন আমরা পরের শোর জন্য আবার প্রস্তুত হতে শুরু করি—কারণ, আশা নামক বস্তুটি বড় জেদি; সে কখনও ভোট হেরে যায় না।
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
মন্তব্যসমূহ