৪১১ সহ্য ও অসহ্যের সংঘাত
(সাম্প্রতিক পশ্চিম বাংলার রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের উপর আলোকপাত )
সহ্য ও অসহ্য- এই শব্দ দুটিকে নিরীহ মনে করার কোনো কারণ নেই। সামাজিক, রাজনৈতিক জীবনে এর ব্যাপক প্রভাব। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, বস্তু জগতে সৃষ্টি ও ধ্বংসের পিছনে সে অন্যতম কারণ হিসাবে বিদ্যমান। সহ্য ও অসহ্যের সংঘাতে সহ্য বারবার পরাজিত হয় কেন? সেই কারণ খুঁজতেই আজকের এই পৰ্য্যালোচনা।
সহ্য ও অসহ্যকে যদি আমরা একটা অনুভূতির মাত্রা ধরি এবং বিশেষ বিশেষ সময় ও পরিবেশে সে অন্তরস্থ গহ্বর থেকে বেরিয়ে এসে তার প্রতিক্রিয়া জানায় আর সেটাই কার্য্য হিসাবে প্রতিপন্ন হয়। সেই কার্য্যের গ্রহণ যোগ্যতা ব্যক্তিবিশেষে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। তখন প্রতিক্রিয়া পুনরায় ব্যক্তিবিশেষের সহ্য ও অসহ্যের কারণ হিসাবে প্রতিপন্ন হয়ে থাকে। এই ভাবেই এই ক্রিয়াটা একটা অসুখকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে থাকে।
এবার আমরা যদি এর পশ্চাতের কারণ অনুসন্ধানে ব্রতী হই, তবে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হতে পারে।
সহ্য ও অসহ্যের দার্শনিক ব্যাখ্যা-
যদি আমরা এইভাবে ধরি - সহ্য ও অসহ্য অস্তিত্বের দ্বৈত গতি। “সহ্য” মানে কেবল সহনশীলতা নয়; এটি অস্তিত্বকে ধরে রাখার শক্তি। আর “অসহ্য” হল সীমা ভাঙার তাগিদ।
একটু যদি জানালা দিয়ে দৃষ্টিকে প্রসারিত করি, তাহলে দেখা যায় -পৃথিবী সূর্যের তাপ “সহ্য” করে বলেই জীবন আছে, কিন্তু অতিরিক্ত চাপ “অসহ্য” হলে আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ঘটে।
অর্থাৎ সৃষ্টি ও ধ্বংস—উভয়ের মধ্যেই সহ্য ও অসহ্যের ক্রিয়া নিহিত। এই কারণে বলা যায়— সহ্য হলো স্থিতির নীতি, অসহ্য হলো পরিবর্তনের নীতি। দর্শনের ভাষায়, সহ্য = সংরক্ষণ, অসহ্য = রূপান্তর কিংবা পরিবর্তন।
অনুভূতি থেকে কার্য্য : অন্তর্জগতের বহিঃপ্রকাশ
সহ্য ও অসহ্য মূলত অনুভূতির মাত্রা। এই অনুভূতি অন্তরে সুপ্ত থাকে; কিন্তু বিশেষ পরিস্থিতিতে তা প্রকাশিত হয়।
এখানে তিনটি স্তর কাজ করে—
কারণ → নিমিত্ত → কার্য্য
উদাহরণ: ১. অন্তরে অবহেলার বোধ ছিল (কারণ) ২. কারও একটি বাক্য বা আচরণ তাকে জাগিয়ে দিল (নিমিত্ত) ৩. ক্রোধ, কান্না বা বিদ্রোহ প্রকাশ পেল (কার্য্য)
এই কার্য্য আবার অন্যের মনে নতুন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ফলে এক অন্তহীন চক্র শুরু হয়। এটাই মানুষের সামাজিক ট্র্যাজেডি।
“আমি” ও অহংকারের বৃত্তি
যখন মানুষ বলে— “আমি সুখী”,“আমি দুঃখী”,“আমাকে অপমান করা হয়েছে” তখন “আমি” কেবল পরিচয় নয়; এটি আত্ম-অভিমান। এখানে “আমি” নিজেকে অনুভূতির সঙ্গে একাত্ম করে ফেলে। ভারতীয় দর্শনে একে বলা হয় অহংকার। অহংকার মানে কেবল গর্ব নয়। অহংকার মানে— “আমি”-বোধের সঙ্গে কোনো অনুভূতি, সম্পর্ক বা অধিকারের সংযুক্তি। অর্থাৎ— আমার মান, আমার সম্পর্ক, আমার বিশ্বাস, আমার সাফল্য— এসবের মধ্যে “আমি” নিজেকে বিস্তার করে। ফলে এগুলোর উপর আঘাত এলেই মানুষ মনে করে তার অস্তিত্ব আক্রান্ত হয়েছে।
৪. অভিমান কেন জন্মায়?
“মন যখন উপেক্ষিত হয়, তখন যে অনুভূতির জন্ম নেয়, সেই-ই অভিমান।”এটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক সত্য। অভিমান আসলে প্রত্যাখ্যাত অহং-এর নীরব আর্তনাদ।
মানুষ চায়— তাকে দেখা হোক, স্বীকৃতি দেওয়া হোক,গুরুত্ব দেওয়া হোক।যখন সে তা পায় না, তখন মন নিজের ভিতরে সংকুচিত হয়ে যায়।
এই সংকোচ থেকেই জন্ম নেয়— দুঃখ,ক্রোধ,নীরবতা,প্রতিশোধ,অথবা আত্মবিনাশ।অর্থাৎ অভিমান কেবল আবেগ নয়; এটি অস্তিত্বের স্বীকৃতি-সংকট।
সহ্য বারবার পরাজিত হয় কেন?
সহ্য কেন পরাজিত হয়?
কারণ সহ্য ধীর, আর অসহ্য ত্বরিত।সহ্য আত্মসংযম চায়; অসহ্য তাৎক্ষণিক বিস্ফোরণ চায়।
মানুষের মন স্বভাবতই তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার দিকে ঝোঁকে।
তাই—ক্রোধ ধৈর্যের আগে আসে, প্রতিশোধ ক্ষমার আগে আসে, ভাঙন সংলাপের আগে আসে। আরও গভীরে গেলে দেখা যায়—
সহ্য তখনই শক্তিশালী হয় যখন মানুষের “আমি” প্রসারিত হয়।
আর “আমি” যখন সংকীর্ণ হয়, তখন অসহ্য দ্রুত জন্ম নেয়।
যে ব্যক্তি কেবল নিজের আঘাত দেখে, সে অসহিষ্ণু হয়।
যে ব্যক্তি বৃহত্তর বাস্তবতা উপলব্ধি করে, তার মধ্যে সহ্য জন্মায়।
এই কারণেই উপনিষদীয় দর্শনে আত্মজ্ঞানকে মুক্তির পথ বলা হয়েছে।
বৌদ্ধ দর্শনের আলোকে
গৌতম বুদ্ধ বলেছিলেন— দুঃখের মূল হল “তৃষ্ণা” ও “আসক্তি”। অর্থাৎ মানুষ যখন কোনো অনুভূতি বা অধিকারের সঙ্গে নিজেকে বেঁধে ফেলে, তখনই অসহ্যের জন্ম হয়।
বৌদ্ধ দৃষ্টিতে—সহ্য আসে অনাসক্তি থেকে, অসহ্য আসে আসক্তি থেকে।
গীতার আলোকে বলা হয়েছে— মানুষ যখন কামনা ও অহং দ্বারা আবিষ্ট হয়, তখন ক্রোধ জন্ম নেয়; ক্রোধ থেকে মোহ, মোহ থেকে বুদ্ধিনাশ। অর্থাৎ অসহ্য মূলত আহত অহং-এর বিকার।
চূড়ান্ত দার্শনিক উপলব্ধি
সহ্য ও অসহ্যের সংঘাত আসলে মানুষের ভিতরের দুই সত্তার সংঘাত—একদিকে সীমাবদ্ধ “আমি”, অন্যদিকে বৃহত্তর চেতনা। যেখানে “আমি” সংকুচিত, সেখানে অসহ্য প্রবল। যেখানে চেতনা বিস্তৃত, সেখানে সহ্য শক্তিশালী।
তাই সহ্য মানে দুর্বলতা নয়। বরং সহ্য হলো এমন এক শক্তি, যা নিজের আহত অহংকে অতিক্রম করতে পারে।
আর অসহ্য হলো সেই মুহূর্ত, যখন “আমি” নিজের সীমাকে চূড়ান্ত সত্য বলে ঘোষণা করে।
অভিমান হল উপেক্ষিত মনের নীরব ক্রন্দন, অসহ্য হল আহত অহং-এর বিস্ফোরণ, আর সহ্য হল সেই চেতনার শক্তি, যা নিজের ক্ষতকেও বৃহত্তর সত্যের মধ্যে ধারণ করতে পারে।
পরিশেষে, এই সহ্য ও অসহ্যের প্রক্রিয়াটি গতিশীল এবং অমোঘ। সুতরাং সাবধান, রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে ভুল-চুক হয়ে গেলে সে আবার ফিরে আসবেই ।
০৭/০৫/২৬ ৪:৪৫ মি.
লেখনীতে রবীন মজুমদার
নিউ টাউন , কলকাতা।
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে
মন্তব্যসমূহ