৪১০ নজরানার প্রতিযোগিতা

৪১০ নজরানার প্রতিযোগিতা  


রবিবার সকাল মানেই বলাইদার চায়ের দোকানে আড্ডা—এ এক অলিখিত সংবিধান। ভারতবর্ষের সংবিধানে না থাকলেও পাড়ার সংবিধানে এই নিয়ম অমোঘ। সকাল ৯টা বাজলেই একে একে হাজির হয় সোনা, দিপু, মান্না, কালু, পরী, বাবলা—আর শেষে নাটকীয় ভঙ্গিতে প্রবেশ করে কপিল।

কপিলের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে আড্ডার মান এক ধাপ বেড়ে যায়—কারণ সে শুধু চা খায় না, চিন্তাও খায়। আর সেই চিন্তা হজম না হলে বাকিদের উপর উগরে দেয়।

সেদিনও সে ঢুকেই গলা ছেড়ে গেয়ে উঠলো—
“কে বা আগে প্রাণ করিবেক দান!”
তারপর নিজেই হেসে বলল—
—প্রাণ নয় রে ভাই, এখন সবাই “নজরানা” দানে ব্যস্ত!

কালু সঙ্গে সঙ্গে সংশোধন করলো—
—নজরানা নয়, এটাকে “বিড” বল। দেশটা এখন একেবারে নিলামঘর হয়ে গেছে।

দিপু চা নাড়তে নাড়তে বলল—
—মানে আমরা সবাই পণ্য?

কপিল বলল—
—না, আমরা পণ্য নই—আমরা “ভোটকয়েন”!

এই সময় বাবলা উত্তেজিত হয়ে উঠলো—
—এটা কিন্তু একেবারে ঘুষ! অর্থনৈতিক অপরাধ!

কপিল চায়ে চুমুক দিয়ে বলল—
—তুই খুব সোজাসাপ্টা ভাবছিস। এটা ঘুষ নয়, এটা “প্রতিশ্রুতির অগ্রিম কিস্তি”।

ঠিক তখনই আড্ডার মধ্যে প্রবেশ করলেন অপুদা—যাদবপুরের দর্শনের অধ্যাপক। তিনি আসলে এই আড্ডার “গুগল সার্চ”—যেকোনো প্রশ্নের উত্তর আছে, যদিও উত্তর শুনে প্রশ্নটাই বদলে যায়।

অপুদা এসে বললেন—
—কী রে, আজ আবার কিসের বিচারসভা?

কপিল বলল—
—দেশে নজরানা দেবার প্রতিযোগিতা চলছে অপুদা। কে কত দিয়ে ভোট কিনতে পারে, সেই দৌড়।

অপুদা চশমা ঠিক করে বললেন—
—ওটা প্রতিযোগিতা নয় রে, ওটা “নৈতিকতার ফাইনাল সেল”।

সবাই থমকে গেল।

—দেখ, আগে রাজনীতি ছিল আদর্শের খেলা। এখন সেটা অফারের খেলা। আগে নেতারা বলত “আমাকে সুযোগ দিন”, এখন বলে “আপনাকে সুযোগ দেবো”—এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটাই আসল বিপদ।

কালু বলল—
—মানে আমরা ক্রেতা?

—না, অপুদা হেসে বললেন,
—তোরা একসঙ্গে ক্রেতা আর বিক্রেতা—নিজের ভোট নিজেই বিক্রি করছিস, আবার নিজেই কিনছিস ভবিষ্যৎ।

বলাইদা এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল। হঠাৎ বলল—
—তাহলে আমার দোকানটাই সবচেয়ে সৎ জায়গা। এখানে চায়ের দাম ফিক্সড—কেউ বেশি দিলে বেশি চা পায় না!

কপিল বলল—
—তুই বুঝিস না বলাইদা, তোর দোকানটাই সবচেয়ে পিছিয়ে। তুই যদি বলতি “এক কাপ চা কিনলে একটা বিস্কুট ফ্রি”, তাহলে তো তোর ব্যবসা দ্বিগুণ হতো!

অপুদা হেসে বললেন—
—এই যে “ফ্রি” কথাটা, এটাই সবচেয়ে দামি।
—ফ্রি জিনিসের জন্য মানুষ সবকিছু দিতে রাজি—এমনকি নিজের বিচারবুদ্ধিও।

পরী ধীরে বলল—
—তাহলে গণতন্ত্রটা কী হয়ে দাঁড়াল?

অপুদা একটু আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন—
—গণতন্ত্র এখন আর শাসনব্যবস্থা নয়, এটা এক প্রকার উৎসব।
—পাঁচ বছর অন্তর একবার “মহা সেল” হয়—
“ভোট দিন, অফার নিন!”

দিপু বলল—
—তাহলে আমরা সবাই ঠকছি?

অপুদা মুচকি হেসে বললেন—
—না রে, এখানে কেউ ঠকছে না—
—এখানে সবাই খুশি হয়ে ঠকছে।

এক মুহূর্ত নীরবতা।

হঠাৎ কপিল উঠে দাঁড়িয়ে বলল—
—আমি ঠিক করেছি, এবারের ভোটে আমি নিজেই বিডিং শুরু করব!
—যে দল আমাকে সবচেয়ে বেশি দেবে, তাকে আমার ভোট!

কালু বলল—
—তাহলে তুই একা কেন? আমরা সবাই মিলে গ্রুপ ডিসকাউন্টে যাব!

বলাইদা হেসে বলল—
—তাহলে আগে আমার বাকি মিটিয়ে যা, তারপর যা খুশি বিক্রি কর!

সবাই হেসে উঠলো।

অপুদা শেষ চুমুকটা দিয়ে বললেন—
—হাস, হাস। যতদিন হাসিটা ফ্রি আছে, ততদিনই বেঁচে আছিস।
—যেদিন হাসতেও নজরানা লাগবে, সেদিন বুঝবি—
“গণতন্ত্রের নিলাম শেষ, এখন শুধু হিসেব মেলানো বাকি।”

চায়ের কাপে তখনও ধোঁয়া উঠছে—
কিন্তু কার যেন মনে হলো, সেই ধোঁয়াটা যেন একটু বেশি ঘন… একটু বেশি অস্বচ্ছ… ঠিক যেমন এই “নজরানার প্রতিযোগিতা”।

২৭/০৪/২৬

লেখনীতে রবীন মজুমদার 
নিউ টাউন , কলকাতা। 
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে

মন্তব্যসমূহ

নামহীন বলেছেন…
খুব ভালো লাগলো ৷

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)