৪১৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে -(২৯)

  ৪১৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে  চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে -(২৯)


৩রা জানুয়ারি'১৮৮৫। ৫৪১, ডিয়ারবর্ন এভিনিউ, চিকাগো থেকে  প্রেরিত পত্রের  ভাবার্থের অনুসরণে - 

সৃষ্টির ধর্ম হচ্ছে বিচিত্রতা -

এক দিন তিনি  ছিলেন একা। তার মধ্যে ইচ্ছা সঞ্চারিত হলো  "আমি আজ থেকে বহু হবো" - এই তত্ত্বটা আমাদের বহু বেদের মুলে আছে। এক থেকে বহুত্বে পৌঁছাতে না পারলে সৃষ্টি প্রকাশমান  হয়ে ওঠে না।  তাহলে, এই বহুত্ব বা বিচিত্রটাই সৃষ্টির কারণরূপে বিদ্যমান। এই বিচিত্রতার স্থবিরতা সৃষ্টিকে বিলোপ করে দিতে পারে।  

মানুষ যেমন এক থাকতে ভালোবাসেনা, ঠিক তেমনি ঈশ্বরও একা থাকতে কোন দিনও চাননি। এক থেকে বহু হবার পিছনে সেই ইচ্ছাটাই কাজ করে। বৈচিত্রময়  প্রকৃতি আর নানা রকমের মানুষ সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন  ভাষা ও রুচি - এসবই সেই একের খেলা।  উদাহরণস্বরূপ বলা যায় , এক সেই সমুদ্র, অথচ তার ঢেউ অসংখ্য। ঢেউগুলিকে আলাদা আলাদা মনে হলেও তারা সকলেই সমুদ্রেরই প্রকাশ। তেমনি জগতের নানা রূপ, নানা মানুষ, নানা ঘটনা— সবই সেই এক পরম সত্তার প্রকাশ বা “খেলা”। এ যেন আমাদের একঘেয়েমি থেকে মুক্তির স্বাদ। 


প্রকৃতি একঘেয়েমিকে পছন্দ করে না বলেই সে বৈচিত্রের শিল্পী -

সংস্কৃত ভাষায় " জাতি"  শব্দটি অর্থে নিয়ে বেশ ধুয়াশার সৃষ্টি করে। মানুষ ভেবেই বসে, যেন জন্মসূত্রে পাওয়া অতি সংকীর্ণ কোন এক প্রকোষ্ঠ। তার আদি  অর্থ ছিল অনেক সরল - শ্রেণী, প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট। 

স্বাভাবিক ভিন্নতা যখন শৃঙ্খল হয় -

সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন এই ভিন্নতাকে আমরা জীবনের স্বাভাবিক রূপ হিসেবে না দেখে শৃঙ্খল হিসেবে ব্যবহার করি।

 বিচিত্রতা অর্থাৎ জাতির অর্থই সৃষ্টি। এই জাতি বা শ্রেণীবিশেষ যতদিন সক্রিয় থাকে ততদিন সেখান  থেকে নানা ধরণের বিচিত্রতার যেমন  সৃষ্টি হয় ; আবার সেই বিচিত্রতাকে সামনে যদি কোন প্রতিবন্ধকতার সূচনা হয়, তখন সে ফল দান করতে আর সক্ষম হয়ে ওঠে না, ফলত সমাজ স্থবির হয়ে যায়। 

যদি অতীতের দিকে ফিরে তাকানো হয়, তবে দেখা যাবে প্রত্যেক ব্যক্তির নিজ প্রকৃতি, নিজের বিশেষ প্রতিপন্নতাকে প্রকাশ ও বিকাশের স্বাধীনতা। এমনও দেখা যায় বিভিন্ন জাতির মিলনক্ষেত্রে একত্রে ভোজন, পারস্পরিক বিবাহ সম্পর্ক স্থাপনে  কোন বিধি নিষেধ ছিল না। 

ভারতবর্ষের পতন ও জাতিভেদ  -

যে বিচিত্রতা ছিল জাতির জীবন, তাকে বিধি নিষেধের ঘেরাটোপে ফেলে তার স্বাধীনতাকে  একপ্রকার হরণ করে নেওয়াতে সমাজ ও দেশ নিম্নমুখী হতে শুরু করলো। প্রকৃতির জগতে একটা গাছ যেমন করে তার সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে গতিশীল করে, কখনও  সূর্যের তাপ আর আলোকে আলিঙ্গন  করে,  আবার আঁচল ভরে বৃষ্টির জলকে গায়ে মেখে বাতাসের স্পর্শে আন্দোলিত হয়ে এই বিশ্ব জগতে নিজের অস্তিত্বের  দাম্ভিকতাকে প্রদর্শন করে- এসবই গাছের স্বাধীনতা ভোগের ফসল। 

স্বামীজী গীতা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন - জাতি বিনষ্ট হলে জগতও নষ্ট হয়ে যাবে। বর্তমান সমাজে যে জাতিভেদ বিরাজ করছে, সেটি প্রকৃত জাতিভেদ নয়, বরং সেটি প্রকৃত জাতির উন্নতির সামনে বিশাল প্রাচীর স্বরূপ। তিনি এই ক্রমনিন্মমান অবস্থার জন্য দায়ী করেছেন আভিজাত্যের মোড়কে আচ্ছাদিত কিছু সুবিধাভোগী সম্প্রদায়কে। ভারতমাতা পুনরায় জাগ্রত হবে, যদি শুধুমাত্র জাতির এগিয়ে যাবার পথের বাধাগুলিকে দূর করা যায়। 

পাশ্চাত্যে গিয়ে স্বামীজী দেখলেন, সেখানকার উন্নতির মূল রহস্য হচ্ছে মানুষের শক্তিকে প্রকাশের সুযোগ দেওয়া। একজন কৃষকের ছেলে বিজ্ঞানী হতে পারে, একজন শ্রমিকের ছেলে রাষ্ট্রনায়ক হতে পারে। সমাজ তার সামনে দরজা বন্ধ করে না। 

ভারতীয় সমাজের মূল মন্ত্র ও তার প্রয়োগ -

পৃথিবীর সব জাতির জীবনে কোন না কোন মন্ত্র আলোকবর্তিকার মতো জাতিকে সামনের  দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। ঠিক তেমনি ভারতীয় সমাজের মুলে আছে ধর্ম। ভারতীয় ভাবনায় ধর্ম মানে মানুষের অন্তরের সেই শক্তি, যা তাকে বৃহত্তর সত্যের দিকে নিয়ে যায়। ধর্ম যদি নদী হয়, তবে বিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য, অর্থনীতি— সব তার উপনদী। নদীকে বাঁচাতে হলে উপনদীগুলোকেও বাঁচাতে হয়।

বিচিত্রতাই জীবন, তাকে অস্বীকার করার অর্থ হচ্ছে  মৃত্যু।” যেটি আজ ভীষণ প্রাসঙ্গিক বর্তমান সমাজ জীবনের আলোকে। সমাজ থেকে নিত্য উৎসারিত  ভাবনার  মৃত্যুর প্রতিচ্ছবিতে  জীবনের আকাশটি মেঘাচ্ছন্ন। সেখানে স্বামীজীর কথাগুলিই যেন, সেই কালো মেঘের আচ্ছাদনের মাঝখান থেকে  একগুচ্ছ আলোক বর্তিকা। 

চলবে -

লেখনীতে -রবীন মজুমদার 
তারিখ -  ১১/০৬/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 
২১৩


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)