৪১২ অদৃশ্য বস্তুর সন্ধানে

 ৪১২ অদৃশ্য বস্তুর  সন্ধানে


মানুষের চরিত্র বড় বিচিত্র। যা আছে, তা নিয়ে তার বিশেষ উৎসাহ নেই; যা নেই, তা নিয়েই তার যত মাথাব্যথা। আলমারিতে দশখানা জামা ঝুলছে, কিন্তু তার নজর থাকবে এগারো নম্বর জামাটির দিকে, যেটা এখনো কেনা হয়নি। সংসারে সুখ আছে, শান্তি আছে, বাজারে আলু-পটলও আছে—তবু মানুষ জিজ্ঞাসা করবে, "আচ্ছা, এর পরে কি আছে?"

এই "এর পরে কি আছে?" প্রশ্নটাই সভ্যতার আসল ইঞ্জিন। না হলে মানুষ গুহা থেকে বেরোত না, সমুদ্রে নামত না, আকাশে উড়ত না, এমনকি প্রতিবেশীর বারান্দার দিকেও উঁকি মারত না।

বস্তুত, অজানার প্রতি আকর্ষণ মানুষের জন্মগত। নারী পুরুষকে বোঝার চেষ্টা করে, পুরুষ নারীকে। বিবাহের পঁচিশ বছর পরেও উভয়পক্ষেরই মনে হয়, "লোকটাকে ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না!" সুতরাং যে প্রাণী নিজের জীবনসঙ্গীকেই পুরোপুরি বুঝতে পারে না, সে যে মহাবিশ্বের অদৃশ্য রহস্যের পিছনে ছুটবে, তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই।

বিজ্ঞানীরাও সেই কাজটাই করছেন। তারা আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, তারাগুলো এমনভাবে ঘুরছে, যেন কোথাও একটা অদৃশ্য গুদামঘর আছে। হিসাব মেলাতে গিয়ে দেখা গেল, দৃশ্যমান পদার্থ দিয়ে ব্যাপারটা ঠিক বোঝানো যাচ্ছে না। তখন তারা বললেন—আচ্ছা, হয়তো এমন কিছু আছে, যাকে আমরা দেখতে পাচ্ছি না। নাম দেওয়া হলো ডার্ক ম্যাটার বা অদৃশ্য পদার্থ।

মজার কথা হলো, নামকরণের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরাও অনেক সময় স্কুলপড়ুয়া ছাত্রদের মতো। যা বোঝা যাচ্ছে না, তার নাম দিলেন "ডার্ক"। যেন বাড়ির বিদ্যুৎ চলে গেলে মা বলছেন, "ওই অন্ধকার ঘরটায় কিছু একটা আছে।" কি আছে? জানা নেই। কিন্তু কিছু একটা আছে।

দার্শনিকেরা আবার একটু অন্য ধরনের মানুষ। তারা বললেন, "দেখতে পাচ্ছি না মানেই নেই, এ কথা কে বলল?" বাতাস দেখা যায় না, অথচ গরমকালে তার মূল্য বোঝা যায়। ভালোবাসা দেখা যায় না, কিন্তু তার জন্য মানুষ কবিতা লেখে, যুদ্ধ করে, আবার কখনো কখনো বিয়ে পর্যন্ত করে ফেলে। স্মৃতি, ভয়, আশা—এসবের কোনোটারই ওজন নেই, রং নেই, আয়তন নেই। অথচ মানুষের জীবন এগুলো দিয়েই তৈরি।

আধ্যাত্মিকতার জগতে প্রবেশ করলে অদৃশ্যের সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। সেখানে আত্মা আছে, চেতনা আছে, পরমসত্তা আছে। বিজ্ঞানী যেটাকে যন্ত্র দিয়ে ধরতে চান, সাধক সেটাকে অনুভব দিয়ে ধরতে চান।

এই জায়গায় এসে শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস-এর কথা মনে পড়ে। তাঁর কাছে কালী কোনো ভয়ঙ্কর দেবীমূর্তি নন, বরং বিশ্বচরাচরে ক্রিয়াশীল মহাশক্তির প্রতীক। তিনি বলতেন, ব্রহ্ম আর শক্তি আলাদা নয়। আগুনকে যেমন তার জ্বালানোর ক্ষমতা ছাড়া কল্পনা করা যায় না, তেমনি ব্রহ্মকে শক্তি ছাড়া ভাবা যায় না। যে শক্তি সৃষ্টি করছে, পালন করছে, আবার ভেঙেও দিচ্ছে—সেই শক্তিকেই তিনি "মা" বলে অনুভব করেছেন।

অবশ্য ডার্ক ম্যাটার আর কালিতত্ত্বকে এক করে ফেললে বিজ্ঞানী মহাশয়েরা রেগে যেতে পারেন। আবার কালিতত্ত্বকে কেবল পদার্থবিজ্ঞানের সমীকরণে নামিয়ে আনলেও ভক্তদের আপত্তি হতে পারে। কিন্তু দুয়ের মধ্যে একটা জায়গায় মিল আছে—দুজনেই দৃশ্যমান জগতের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কোনো গভীর বাস্তবতার কথা বলে।

মানুষের ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, অদৃশ্য জিনিসই তাকে সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত রেখেছে। দৃশ্যমান পৃথিবীকে সে মোটামুটি মেনে নিয়েছে; সমস্যা হয়েছে অদৃশ্য পৃথিবীকে নিয়ে। তাই কেউ দূরবীন বানিয়েছে, কেউ উপনিষদ লিখেছে, কেউ ধ্যান করেছে, কেউ গবেষণাপত্র।

তারপর এঁরা সবাই মিলে অনেক কথা লিখে গেছেন। আমরা সেইসব বই পড়ে জ্ঞানী হওয়ার ভান করি। আসলে আমরা যা জানি, তার অধিকাংশই অন্যের অভিজ্ঞতার পুনর্ব্যবহার। পার্থক্য শুধু এই যে, বই থেকে তোলা জ্ঞানকে আমরা নিজের বলে চালিয়ে দিই।

তবে মাঝখানে একটা বড় ছাঁকনি কাজ করে। তার নাম মন। সে সব কথা গ্রহণ করে না। নিজের পছন্দমতো কিছু রেখে দেয়, কিছু ফেলে দেয়। ফলে সত্যের চেয়ে মতামতের ওজন অনেক সময় বেশি হয়ে যায়।

অদৃশ্য পদার্থের সন্ধান তাই কেবল মহাকাশের গল্প নয়। এটি মানুষের চিরন্তন কৌতূহলের গল্প। প্রশ্নের গল্প। অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক অদ্ভুত প্রাণীর গল্প, যে হাজার বছর ধরে একই প্রশ্ন করে চলেছে—"আচ্ছা, এর পরে কি আছে?"

আর মহাবিশ্বও যেন মৃদু হেসে উত্তর দেয়—"সেটা জানতে হলে আরেকটু এগিয়ে এসো।"

০১/০৬/২৬
লেখনীতে রবীন মজুমদার 
নিউ টাউন , কলকাতা। 
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)