৪১৫ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -প্রথম পর্ব )

 ৪১৫ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -প্রথম পর্ব )

( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে  উস্কে দেয় ) 

পাথরের সুদৃশ্য কোটর থেকে ভোরের সল্প আলো ফোটার সাথে সাথে মোরগটা আড়মোড়া ভেঙে উচ্চস্বরে ডেকে উঠলো।  অবশ্য এই নিঃশব্দ পাহাড়ী পরিবেশে মোরগের  ডাকাটা খুব যে খারাপ লাগে তা বলা যাবে না। অগত্যা নরেন হাত বাড়িয়ে টেবিলের উপর থাকা ফ্লাস্কের মুখটা খুলে একগ্লাস জল খেয়ে নিল। নরেনের এইটা দীর্ঘ দিনের অভ্যাস। 

আজ রবিবার, সকালটা একটু অলসতার সাথে দিনটা শুরু করবে, নরেনের মনে মনে সেই ইচ্ছা ছিল। গতকাল বন্ধুদের সাথে প্রায় মধ্যে রাত্রি পর্যন্ত সুরাপানের রেশটা এখনও  অল্প সল্প  সারা দেহ মনে ছড়িয়ে আছে। 

 জোড়বাংলার এই বাংলোটা সেই ব্রিটিশ আমলে তৈরি। চারপাশে সারি সারি পাইন গাছগুলিকে দেখে মনে হচ্ছে সুসজ্জিত পাহারাদাররা  অতন্দ্র প্রহরীর মতো আদেশের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে।  বিচিত্র প্রজাতির  সিঙ্কোনা গাছগুলির লালচে বাদামি বাকল আর পাতার সমাহার লনটাকে বিশেষ আকর্ষণীয় করে তুলেছে  আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রডোড্রেনডন  গাছের সাথে আরো কত নাম না জানা গাছের  উজ্জ্বল উপস্থিতি বেশ নজর কাড়ার মতো।  এসবের মাঝখানে জানলা দিয়ে উঁকি মারে কাঞ্চনজঙ্ঘার সুউচ্চ চূড়াগুলি।  

বিভাস খাসনবীশ প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক। তার ঘরণী লাবণ্য সরকারি উচ্চপদে অধিষ্ঠিত, তারই কল্যাণে প্রতিবারই  এই বাংলোটা পেতে নরেনদের অসুবিধা হয় নি।  তবে বুকিং পেতে বেশ কয়েক মাস আগে থেকে জানাতে হয়। বুকিংয়ের কনফারমেশন পেলে, সেই অনুযায়ী হার্ভার্ডের ইতিহাসের গবেষক এবং অধ্যাপক দম্পতি মধুছন্দা আর প্রশান্ত সাত সমুদ্র পার করে তাদের ব্যস্ত সিডিউলকে শিকেয় তুলে দার্জিলিঙের এই বাংলোতে এসে হাজির হয়। অবশ্য এখানকার কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ের গরমের ছুটির সাথে সামঞ্জস্য থাকে। 

এই বাংলোটি দুইতলা বিশিষ্ট। মোট ঘরের সংখ্যা বারোটা। প্রত্যেক ঘরের সাথে এটাচ বাথরুম , পুবের বারান্দা আর ঘরের বাইরে একটা লম্বা করিডোর সব আলাদা আলাদা  ঘরগুলিকে নিজের মতো করে বেঁধে রেখেছে এবং প্রত্যেক ঘরে  ফায়ার প্লেস আছে। একটু দূরে গার্ডের ঘর কিন্তু কিচেন এবং ডাইনিং রুমটা  নিচের একটি বিশাল ঘরে। 

 লামা পরিবার দীর্ঘদিন ধরে এখানে ঐ গার্ডের রুমে বাস করছে। অতিথিরা এলে বেশ সযত্নে তারা রান্না থেকে শুরু করে অতিথিদের সবরকমের ফাই ফরমাস হাসি মুখে হজম করে। 

 এই বাংলোটি দার্জিলিং থেকে বেশ উঁচুতে। জোড়বাংলার পাশের রাস্তা  থেকে ডানদিকে ঘুরে রিসার্ভ ফরেস্টের গেট পার করে জঙ্গলের রাস্তার মধ্যে দিয়ে এঁকে বেঁকে উপরে উঠতে হয়। মাঝে মধ্যে নিচের জঙ্গল থেকে উপরে  উঠে আসা সম্বরদের আনাগোনা কদাচিৎ চলার পথে চোখে পরে।  স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়  চিতাদের উপস্থিতি।  ঠান্ডা এখানে নিত্য সঙ্গী, অবশ্য তাপমাত্রার সামান্য হেরফের যে মাঝে মধ্যে হয় না, সেটা জোর করে বলা যায় না। প্রায়শই দুপুর দুটা-তিনটার পর কুয়াশা এসে বাইরের পৃথিবীর সর দৃশ্যমানতাকে হরণ করে নেয়। এহেন এই পরিবেশটাই নরেনদের এই জায়গার প্রতি আকর্ষণ বাড়িয়ে তোলে। তাই প্রতিবার এখান থেকে চলে  যাবার পর আবার ফিরে আসার তৃষ্ণাটাকেও  সঙ্গে নিয়ে যায় আগামীতে আসার জন্য।  

সামনের শান বাঁধানো পুকুরটি যে একসময় গভীর ছিল , তার অনেকটা জল শুকিয়ে যাবার পর বেশ নজরে পড়ে। এখান থেকে টাইগার হিলের দূরত্ব , জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হেটে গেলে এক ঘন্টারও  কম সময় লাগবে। 

 গতকাল বিকাল থেকে সাহেবদের তৈরি করা কনফারেন্স রুমে বসে আড্ডা বসেছিল। ঘরের দেয়ালগুলিতে জানিনা কি ভাবে পেস্ট করে ছিল বিশাল বিশাল পোর্সিলিনের খোদাই করা বিভিন্ন ঘরানার ছবি। এর মধ্যে অবশ্য বেশ কিছু ফুল ও লতানো গাছের ছবি আছে। আসবাবপত্রগুলোর কোন পরিবর্তন সাধিত হয় নি, সেই ব্রিটিশ আমলের স্মৃতিকে মনে করিয়ে দেয়। 

যা হয়, একদল সচেতন বাঙালি চা'য়ের  কিংবা সুরাপানের আসর, যাই হোকনা  কেন, ড্রিংকসের সাথে রাজনীতির মুখবলি না থাকলে সূরা পানের মজাটাই অসম্পূর্ন থেকে যায়। অবশ্য সন্ধ্যার সময় বেশ কষিয়ে ভেড়ার মাংস আর সাল্যাড শিরিন  লামার গৃহকর্তী দিয়ে গিয়ে ছিল। 

কালকে মধুছন্দা কথায় কথায় বলে উঠলো , আমাদের ওখানে পেপার পত্রিকায় যা দেখছি, আমাদের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে ভারতীয় ও অভারতীয়দের মধ্যে ভারতের রাজনীতির কারবারিরা বেশ হাসির খোরাক হয়ে উঠেছে, মূলত ইতিহাস চর্চার গভীরতা আর বিকৃত করার প্রবণতা দেখে।  

বিভাস মধুছন্দার কথার সূত্র ধরে বলল - "আমার মনে হয়, এঁরা ভারতীয়দের ঘুরপথে ইতিহাস চর্চার জন্য অনুপ্রাণিত করছে। যে বস্তুকে লুকোতে চাইবে, তার প্রতি মানুষের কৌতূহল বাড়াটা ভীষণ স্বাভাবিক"। ইতিহাস নামক বিষয়টি ভীষণ ইন্ট্রিগ্রেটেড , মূল ইতিহাসের সাথে সংম্পৃত্ত অন্যান্য বিষয়গুলি যদি একদম মেল্টেড হয়ে যায় তবে বোঝা যায় তার মধ্যে কোন খাদ নেই আর যদি না হয়, তাহলে বোঝা যাবে প্রক্ষিপ্ত কিংবা লুকিয়ে ফেলেছে।  যুগে যুগে ঐতিহাসিকদের মধ্যে ইতিহাস বিকৃত করার প্রবণতা ছিল। আমি তোমাদের অসংখ্য  উদাহরণ থেকে একটা  দিই। 

ক্রমশঃ 

কলমে - রবীন মজুমদার 
১৩/০৭/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)