৪১৫ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -দ্বিতীয় পর্ব )
৪১৫ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -দ্বিতীয় পর্ব )
( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে উস্কে দেয় )
গত সংখ্যায় - যুগে যুগে ঐতিহাসিকদের মধ্যে ইতিহাস বিকৃত করার প্রবণতা ছিল। আমি তোমাদের অসংখ্য উদাহরণ থেকে একটা দিই ০০০০০০০০০০০
সুযোগ পেলেই অহংকারী বিদেশীরা ভারতের প্রাচীন সভ্যতাকে অস্বীকার করে পাশ্চাত্যের সভ্যতাকে বড় করে দেখাবার বাসনা ত্যাগ করতে পারতো না। " দি আর্লি হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া" বইটিতে ভিন্সেন্ট স্মিথ ৬৭ পাতা ব্যয় করেছিলেন শুধু মাত্র আলেক্সজান্ডারের বিজয় কাহিনী লিখে। সেখানে ভীষণ মিতব্যয়ী ছিলেন চন্দ্রগুপ্ত ও বিন্দুসারের জন্য ৪১টি পাতা আর সম্রাট অশোকের জন্য মাত্র ৪৪ পাতা বরাদ্দ করেন।
অবশ্য সত্য এমনিই জিনিস কখনই মিথ্যার পিছু ছাড়েনি। নিরপেক্ষ ঐতিহাসিকেরা প্রমান করেছেন, আলেক্সজান্ডার কেবলমাত্র এক প্রান্তিক সামন্তরাজাকে যুদ্ধে হারিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু অন্যান্য ভারতীয় রাজাদের সমরকুশলতার খবর পেয়ে, সময় ব্যয় না করে তড়িঘড়ি ভারতবর্ষ ত্যাগ করে পালিয়ে গিয়েছিলেন।
এরকম মেলা উদাহরণ আছে ইতিহাসকে বিকৃত করার। আবার আমাদের দেশের মানুষেরা সংকীর্ণ স্বার্থে ব্রাহ্মণ্যবাদকে ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বহু শ্লোককে মহাকাব্যে প্রক্ষিপ্ত করার বহু উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যায়। (পরবর্তী সময়ে সেটা আলোচনা করা যাবে ) মহাভারতের বেশ কিছু পর্বে তার দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায় এবং সেই ট্রাডিশন সমানে চলছে। এসব বড্ড কাঁচা হাতের কাজ। সব কিছুরই সিনট্যাক্স আছে, যা ভুলটা ধরিয়ে দিয়ে সাহায্য করে। সময়ের সাথে সাথে ইতিহাসের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বেড়েছে তাই গবেষণাও সারা পৃথিবী জুড়ে বৃদ্ধি পেয়েছে।
আরে বাবা ! শিকড় ছাড়া গাছ কখনো হয় নাকি ? তুমি কোথা হতে এলে ?কে দেবে এই প্রশ্নের উত্তর ? ইতিহাস যে কি, সেটা তো জানতে হবে, এই বলে হার্ভার্ডের ইতিহাসের গবেষক এবং অধ্যাপক প্রশান্ত শুরু করলো - যদিও সবাই সেটা জানে, তবুও আমি রিপিট করলাম।
আরে ভাই ! আগামীকে গড়তে গেলে বর্তমানকে বুঝতে হবে আর বর্তমানকে কে বোঝাবে? সেই অতীত, মানে ইতিহাস। এই তো এখানে নরেন আছে, কমার্সের ছাত্র। "সোয়াট " এনালাইসিস বলে একটা কমার্সের একটা শব্দ আছে, যা আগামীদিনের ব্যবসার দিক নির্দেশ করে। ঠিক এখানে, প্রাচীনকালের ভুল বা সাফল্যের খতিয়ান দেখে নিজেদের তথা রাষ্ট্রের ভুল করার হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। কথায় বলেনা -ইতিহাসের থেকে শিক্ষা বা ভুলের পুনরাবৃত্তি আর যেন না ঘটে বরং সঠিক ইতিহাস চর্চা বেঁচে থাকার গভীর দর্শন।
বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে, হালকা বাতাস জানলায় এসে তার উপস্থিতি ঘোষণা করছে। শব্দটা জানান দিচ্ছে এই ঘরের বাইরেও কিছু আছে। এমন সময় গীতা লামা একটা বড় ট্রেতে করে প্লেট সাজিয়ে চিকেন পাকোড়া নিয়ে এলো। এদের অতিথি বাৎসল্যতার জুড়ি মেলা ভার।
তাই মধুছন্দা বলে, এটাই আমাদের বাংলার সংস্কৃতি, এরই জন্য আমি সবকিছু ফেলে বারবার এদেশে আসতে প্রস্তুত। যেখানে আথিথেয়তাই মানুষের ধর্ম। পাশের মানুষকে নিবিড় করে নেবার সংস্কৃতি বোধ হয় ভারতের সমাজভাবনার মূল স্রোত। 'প্রেম', 'প্রীতি', 'ভালোবাসা', 'অপরের দুঃখে ব্যথিত হওয়া' , সব ধরনের মানুষকে, সব মানুষকে মানুষের একক হিসেবে ভাবা এই সব ভাবনাগুলি ব্রাহ্মণ্যবাদীদের ভাবনার পরিপন্থী। বাস্তবতা আমাদের শেখায় যেমন, বিভিন্ন প্রজাতির সারমেয়কে আমরা তার একক হিসাবে 'সারমেয়' নামে চিহ্নিত করে থাকি। যেমন, কোন কোন দরজায় লেখা থাকে "beware from dog " সেখানে কখনো লেখা থাকেনা " beware from Doberman dog " ইত্যাদি। প্রাণী জগতের প্রত্যেককে আমরা একক হিসাবে অবিহিত করে থাকি কিন্তু মানুষের বেলা ব্যতিক্রম কেন ? নিশ্চয়ই এর পিছনে কোন উদেশ্য আছে। সেই কারণটাকে চিহ্নিত করলে কার্য্যের উদ্দেশ্যটা সহজেই বোঝা যাবে।
বাইরে বৃষ্টিটা বেশ জোরে নেমেছে, ঘড়ির কাটার গুরু গম্ভীর ঘন্টাধ্বনি রাত ১০টা ঘোষণা করলো। সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করে বিভাস প্রশ্ন করল, হ্যারে মধুছন্দা - আজকাল 'সনাতন' শব্দটার যত্রতত্র ব্যবহার দেখতে পাচ্ছি, এর অর্থ আমি তো বুঝি 'চিরন্তন' বা 'শাশ্বত' অর্থাৎ যারা কালকে অতিক্রম করে আজও সে অমলিন। শত পরিবর্তনের জোয়ারে সে নিজেকে হারিয়ে ফেলেনি। তাহলে, ইন্ডিয়ান অরিজিন বৌদ্ধ ধর্ম , জৈন ধর্মতো সেই গোত্রে পরে। গৌতম বুদ্ধের যে ধর্ম সে তো চিরন্তন সত্যের কথাই বলে কিংবা তাকেই পুনরায় আবিষ্কারও বলা যেতে পারে। অর্থের ব্যাপকতায় সে বিশেষ কোন গন্ডিতে আবদ্ধ নয়, বরং সে এই ভারতভূমিতে আবিষ্কৃত চিরন্তন সত্যের একক হিসাবে প্রতিনিধিত্ব করে কিন্তু বিশেষ কোন ধর্মের অর্থ বিশেষ নয়।
শব্দের অর্থ অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্ভর করে বিষয়টিকে তুমি কোনখান থেকে দেখছো তার উপর। যদি জানালার ঘুলঘুলি দিয়ে আকাশকে দেখতে যাও, তাহলে সেইটুকুই দেখা যাবে ঠিক ততখানি , যতখানি দেখবার স্বাধীনতা তোমায় ঘুলঘুলি দিয়েছে তার উপর। আবার ছাদে গিয়ে আকাশকে দেখলে তোমার সামনে কোন বাধা থাকবে না। আসলে দার্শনিক অর্থে যা কিছু চিরন্তন সত্য সে সবই 'সনাতন' অর্থাৎ সব ধর্মের মধ্যে মৌলিক কোন প্রভেদ নেই। শুধু মানুষ তাকে নাম-রূপ দিয়ে আলাদা করেছে। বেদ হচ্ছে হিন্দু ধর্মের সর্বোচ্চ কতৃত্বের অধিকারী, সে যাকে অনুমোদন দেবে সেই-ই সনাতন ধর্ম হিসাবে স্বীকৃতি পাবে- এটাই পরম্পরা, যেখানে যুক্তির স্থান দুর্বল। অবশ্য 'সনাতন' নামক ছাতার তলায় সব ধর্মকে স্থান দিতে হয়, তাহলে স্বীকার করতে হবে বিভিন্ন ব্রান্ডের ধর্ম বাজারে থাকলেও "চিরন্তন সত্যের" প্রশ্নে সব ধর্মই এক, সবই এক সুরে বাঁধা, সেই রামকৃষ্ণের দর্শন - তাকে গ্রহণ করতে হবে, এই বলে মধুছন্দা একটু থামলো।
ক্রমশঃ
মন্তব্যসমূহ