৪১৮ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -চতুর্থ পর্ব )

 ৪১৮ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -চতুর্থ   পর্ব )

( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে  উস্কে দেয় )    

চেতনার অঙ্কুরোদগম হবার সাথে সাথে ছোট প্রশান্তর প্রশ্ন করার ভূতটা তার কাঁধে চেপে বসেছিল, সে বড় হয়েও সেই ধারাটা বজায় রেখেছে। যাঁর অনুসন্ধিৎসা আছে তাকে জ্ঞান যে আঁকড়ে ধরবে, সে তো বলার অপেক্ষা  রাখেনা। বলার অপরপ্রান্ত থেকে প্রশ্নের বান যে তেড়ে আসবে সেটা  প্রশান্ত তার দীর্ঘ দিনের অধ্যাপনার অভিজ্ঞতা থেকে অনুমান করতে  পারে, কেননা কথা বলাটাও যেমন তীর থেকে নিক্ষিপ্ত বানের মতো স্বভাবতই প্রত্যুত্তরে যে পাল্টা বান আসার অপেক্ষায় থাকতে হয় তীরন্দাজকে। এই আসা যাওয়ার সংঘর্ষে সুদৃঢ় হয় জ্ঞানের ভিত্তি। প্রসঙ্গত, শুধুমাত্র এই প্রশ্ন করা নিয়ে বহু বিতর্কিত ঘটনাবলীর উদাহরণ ইতিহাসে আছে, যখন এই প্রশ্ন শাসকের কাছে শাসিত প্রশ্ন করে। গণতন্ত্র যখন তার চরিত্র হারিয়ে একনায়কতন্ত্রের দিকে ধাবিত হয়, সেখানে আবার প্রশ্ন করার জন্য আজকের সক্রেটিসদের হেমলক পান করতে হয় অর্থাৎ দেশদ্রোহীর তকমা দিয়ে বৰণ করা হয়।  

প্রকৃতির জগতে রত্নকে খুঁজে বের করতে হয়, কেননা সে একাতিত্ব পছন্দ করে না , সে অনেকের সাথে মিলেমিশে থাকে। যেমন, প্রয়োজন আর অপ্রয়োজন একই সাথে মিলে থাকে। যেমন কাটা সরিয়ে গোলাপকে তুলতে হয়, তেমনি অন্য ধাতুর সাথে মিলেমিশে বড় হওয়া সোনাকে পেতে হলে, তার দীর্ঘদিনের বন্ধুদের সঙ্গ থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করতে হয়, ঠিক তেমনি  ইতিহাসের মূল উপাদানগুলি অসংখ্য  ভিন্ন ভিন্ন  ধরনের উপাদানের সাথে মিলেমিশে থাকে আর সেখান থেকে সংগ্রহ করতে গেলে বিচার-বিশ্লেষণকে বিশেষ  প্ৰাধান্য দেবার সাথে সাথে উপাদান সংগ্রহের প্রটোকলটাকেও  অনুসরণ করতে হয়।  

যতক্ষণ পর্যন্ত হরপ্পার লিপি উদ্ধার না হচ্ছে, ততক্ষণ ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্কটা পিছু ছাড়বেনা। আবার শুধু লিপিই তো পূর্ণাঙ্গ বিবরণ নয়। তাই অন্যান্য উপাদানের আলোকে বলা যেতে পারে আনুমানিক দেড়হাজার খিস্টপূর্বাব্দে আর্যরা ভারতে এসেছিলো। 

ইতিহাসের যদি উপাদান খুঁজতে হয়, তবে প্রাথমিক ভাবে সমকালীন সাহিত্যের সাথে পরিচিত হতে হবে। কল্পনার সুতো গুলি বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে বোনা হয় আর সেখান থেকে সযত্নে কল্পনাকে পাশে রেখে বাস্তবতাকে গ্রহণ করতে হবে।  এক্ষেত্রে অগ্রণী সাহিত্য হিসাবে ঋগ্বেদকে ধরতে হবে। আধুনিক পৃথিবীতে গ্রহনযোগ্যতার ক্ষেত্রে অনুমানের থেকে প্রমান বিশেষ কার্যকরী ভূমিকা পালন করে থাকে। 

 "জেন্দা আবেস্তা" নামক প্রাচীন পারস্যের (যার বর্তমান নাম  ইরান) ধর্মগ্রন্থকে ঐতিহাসিকরা মান্যতা দিয়েছে।  কারণ স্বরূপ, ঋগ্বেদ ও জেন্দা আবেস্তার ভাষা ও  দেবদেবীর বর্ণনার এক অসম্ভব মিল খুঁজে পাওয়া যায়। সেই হিসাবে  এটাই প্রমাণিত হয় যে ইন্দো-ইরানি এবং ইন্দো-আর্যদের  মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে একত্রে থাকার নজির একটা স্বীকৃত উপাদান।   

 বর্তমানে আমরা যাকে তুরস্ক বলে জানি, সেখানে খ্রিষ্টপূর্ব চোদ্দশ সালে "বোগাজকয় লিপিটি " আর্যদের স্থানান্তরের এক অকাট্য প্রমাণকে বহন করে। শুধু তাই নয়, দুই রাজার মধ্যে চুক্তি পত্রে সাক্ষী হিসাবে দেবরাজ ইন্দ্রসহ অন্যান্য দেবতাদের নামের  উল্লেখ আছে। মেসোপটেমিয়া (বর্তমানে ইরাক ও সিরিয়া ) অঞ্চলে কাসাইট ও মিত্তানি লিপিগুলিতেও ইন্দো-আর্য্য ভাষার অনেক নাম ও শব্দের ভান্ডারের পরিচয় পাওয়া যায়। 

মা যেমন দীর্ঘকাল পরে তার সন্তানকে চিনতে পারে বিশেষ কিছু চিহ্নের সাহায্যে। ঠিক তেমনি, যে সমস্ত ধূসর রঙের মাটির তৈরি পাত্রগুলি ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় পাওয়া গেলেও তার মাতৃক্রোড় যে আলাদা নয় তা সহজেই অনুমান করা যায়। ঐতিহাসিকরা এই প্রাপ্তিকে আর্যদের বসতি স্থাপনের সাথে সংযুক্ত করেন। 

আর্যরা যে ভারতবর্ষে অনুপ্রবেশকারী, সেটা প্রমান করার আরেকটি উপাদান হয় ভাষা। এই তো সেদিন, অষ্টাদশ শতাব্দীতে উইলিয়াম জোন্স প্রমান করেন, ভারতীয় এলিট ভাষা সংস্কৃতের সাথে ভীষণ মিল খুঁজে পান প্রাচীন গ্রিক, ল্যাটিন  এবং ফার্সী ভাষার সাথে। এই ভাষা পরিবারের সদস্যরা কোন এক সময়ে মধ্যে এশিয়ায় বাস করতো এবং পরে বিভিন্ন দিকে ছাড়িয়ে পড়ে। 

সাম্প্রতিক সময়ের ডিএনএ (DNA) গবেষণায় দেখা গেছে যে, আধুনিক ভারতীয়দের জিনে 'R1a1' হ্যাপ্লোগ্রুপের উপস্থিতি রয়েছে, যা মধ্য এশিয়ার স্টেপ (Steppe) অঞ্চলের প্রাচীন পশুপালক জনজাতির সাথে সরাসরি যুক্ত। হরিয়ানার রাখিগড়িতে প্রাপ্ত প্রাচীন কঙ্কালের ডিএনএ বিশ্লেষণও ইঙ্গিত দেয় যে, খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ থেকে ১৫০০ অব্দের মধ্যে মধ্য এশিয়া থেকে একটি বড়মাপের জনস্থানান্তর ভারতীয় উপমহাদেশের দিকে ঘটেছিল।

আধুনিক ঐতিহাসিকরা বর্তমানে মনে করেন যে আর্যরা কোনো একক সেনাদল হিসেবে ভারত আক্রমণ করেনি, বরং তারা দীর্ঘ সময় ধরে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে পশুপালনের খোঁজে মধ্য এশিয়া থেকে ভারতে প্রবেশ করেছিল এবং ধীরে ধীরে এখানকার সংস্কৃতির সাথে মিশে গিয়েছিল। 

নরেন বলল, এপর্যন্ত বুঝলাম যে আর্যরা ভারতের প্রাচীন ধারার ধারক বা বাহক নয়,  কিন্তু কেন একটা জাতি তার মূল ভূখন্ড থেকে স্বইচ্ছায় নিজেদের উৎপাটিত করে অন্য একটি দেশে এসে বসবাস করতে শুরু করলো, সেটা জানার আগ্রহ রয়ে গেল।  

ক্রমশঃ 

কলমে - রবীন মজুমদার 
২২/০৭/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)