৪১৯ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -পঞ্চম পর্ব )
৪১৯ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -পঞ্চম পর্ব )
( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে উস্কে দেয় )
প্রশান্ত এই প্রশ্নে বেশ প্রফুল্ল হয়ে উঠলো। নরেনের প্রশ্নের পিছনে যে একটা দার্শনিক ভাবনা কাজ করছে, সেটা বুঝতে প্রশান্তর কোন অসুবিধা হলোনা। আর্যদের ভারতে আসাটা একটা কার্য্য বিশেষ কিন্তু তার পিছনে যে কারণ আছে সেটাতো প্রাথমিক ভাবে অনুমান সাপেক্ষ। আবার অনুমানকে অনুসরণ করতে করতে কার্য্যের খোঁজ আবার তার পশ্চাতের কারণের সন্ধান - এইভাবেই অনুসন্ধান এক জায়গায় এসে থেমে যায় যেখানে সত্য উদ্ঘাটিত হয়। তার পরে আর কিছুই থাকেনা।
কিন্তু ইতিহাসের রহস্য উদ্ঘাটন একটা দীর্ঘ প্রসেস, ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও আধুনিক ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিকরা বেশ কিছু কারণের উল্লেখ করেছেন। তাদের আসার পদ্ধতিতে ছিল ধীরে চলো নীতি। যুদ্ধ-বিগ্রহ নয়, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাদের ভারতে আসার প্রক্রিয়া জারি ছিল।
প্রশ্ন যেখানে জীবন-জীবিকার সেখানে মানুষের প্রাথমিকভাবে স্থান-কালটা বিশেষ কোন প্রাধান্য পায় না। আজকে পশ্চিমবাংলায় চাকরি না থাকাতে বাংলার যুবকরা যেমন অন্যান্য প্রদেশ এমনকি বিদেশেও পাড়ি দিচ্ছে, তারপর একসময় মাতৃভূমিকে স্মৃতির মনিকোঠায় রেখে নিজেকে বাস্তবের হাতে সঁপে দিয়ে পরবাসী হচ্ছে। ঠিক সেরকম আর্য্যরাও তাদের জীবনধারণের উপযুক্ত পরিবেশের নিজেদের পরবাসী করেছে সুস্থভাবে বেচে থাকার তাগিদে।
চলমান বস্তুজগৎ, কাল যা ছিল আজ সে নেই, শুধু পরে থাকে অতীতের স্মৃতি। তারা পশুপালন করতো। প্রধান সম্পদ বলতে একদল গরু আর ঘোড়া আর তার সঙ্গে একরাশ ক্ষুধা। ক্রমশই খাদ্যের অন্বেষণে ক্লান্ত, কেননা প্রকৃতি ক্রমেই অপরাগ হয়ে উঠছে জাগতিক কারণে, অস্বীকার করছে খাদ্যের যোগান দিতে। প্রাণী জগতের আদি অকৃত্তিম চাহিদা হচ্ছে খাদ্য, তাই শুরু হলো পশুদের জন্য চারণ ভূমির খোঁজ, যা ছিল সে দিনের মানুষের খাদ্যের সংকুলানের সাথে তাদের আপেক্ষিপ যোগাযোগ। ক্রমেই এগোতে লাগলো দক্ষিণ-পূর্ব দিকে আর পেয়ে গেলো তাদের ইপ্সিত উর্ব্বর ভূমি, সেটাই এই ভারতবর্ষ।
সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে প্রাকৃতিক নিয়মে জনসংখ্যা বাড়তে থাকে। তার সাথে পাল্লা দিয়ে খাদ্যের সংস্থান যদি না বাড়ে তাহলে মানুষ তো বিকল্পের সন্ধান তো করবেই আর তারই জন্যই একাধিকবার স্থান পরিবর্তন। আসলে একটা মূল পরিবর্তনের সাথে অনেকগুলি সহযোগী পরিবর্তন সাধিত হয়, এটাই মানব জাতির ইতিহাস। ভূমি তখনিই হয়তো মাতৃভূমি আখ্যা পায়, যখন সে তার সন্তানকে আহারের যোগান ও স্থায়িত্ব দিতে পারে।
যোগান যেখানে সীমিত আর চাহিদা বিপুল, সেখানে চাওয়া পাওয়ার ক্ষেত্রে কম-বেশি গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব থাকাটা স্বাভাবিক। ঐতিহাসিকরা অনুমান করেছেন, তাদের ভূখন্ড থেকে ভারতে চলে আসার অপর একটি কারণ এটি হতে পারে।
সেদিন যদি তাদের কথোপকথন টেপ করে রাখার বন্দোবস্ত থাকতো, তাহলে নিশ্চয়ই জানা যেত, মধ্য এশিয়ার এক বৃদ্ধের সাথে সদ্য ভারতে আসা এক তার নাতির ফোনালাপ। বৃদ্ধের প্রথম প্রশ্ন থাকতো, তোমার অবলা জীবগুলিকে দুবেলা খেতে দিতে পারছে তো ? আর তোমাদের খাওয়া পড়ার কোন অসুবিধা হচ্ছে না তো ? পরিবেশটা কেমন ? আবার ওখান থেকে অন্যত্র চলে যাবার সম্ভাবনা নেই তো ? যেই অপরপ্রান্ত থেকে উৎসাহব্যঞ্জক উত্তর এলো দাদু, তোমার ভাবনাটা খুবই বাস্তব কিন্তু এখানে এসে এখানকার মানুষ, মাটি আর পরিবেশ সত্যিই ভালো। তখনই সেই বৃদ্ধ তার বর্ধিত পরিবারকে বলল , এবার বাক্স পেটরা বাঁধো আমরা হিন্দুকুশ পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে (খাইবার পাস) ভারতে যাব, আর মনে রেখো যাবার পথে খাবার আর জল নিতে ভুলানো কিন্তু - এই হচ্ছে বাস্তবতা, ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে নিরীহ মানুষগুলি একান্তই বাঁচার তাগিদে ভারতবর্ষে প্রবেশ করেছিল।
সরস্বতী নদীর তীর, ভোরের আবছা আলো, একের পর এক কুয়াশার ঢেউ যেন নদীর জলের উপর আছড়ে পড়ছে আর সেই জলের কিনারা থেকে এক বৃদ্ধ সাধু গম্ভীর কন্ঠে সুরের মাধুর্য্য মিশিয়ে মহাজাগতিক কোন মন্ত্র উচ্চারণ করছেন, সেই নিৰ্জনতাকে এক অপূর্ব মোহময় পরিবেশ সৃস্টি করে ভরিয়ে দিয়েছে। এই স্থানটি সেদিন পরিচিত ছিল সপ্তসিন্ধু নামে। ধীরে ধীরে এই অত্যাশ্চর্য্য পরিবেশে আর্যদের প্রথম দলটি প্রবেশ করলো।
পরিবর্তনশীলতা বস্তুজগতের ধর্ম। আর্যরা তাদের দীর্ঘদিনের ব্যবহৃত আচার-ব্যবহার , আদবকায়দার ঝুলিটা উজাড় করে স্থানীয় মানুষদের সংস্কৃতির ভাণ্ডারে স্তূপাকার করে সাজিয়ে দিলো। সেই সঙ্গে মিলিত হলো প্রাচীনভারতের সংস্কৃতির আর দুইয়ে মিলে সেদিনের ভারতবর্ষে শুরু হল এক নব সংস্কৃতির জোয়ার।
অবশ্য চলন-বলন-কথনে কিছু অলিখিত অদৃশ্য অঙ্গুলি গোটা সামাজিক সংগঠনকে নিয়ন্ত্রণ করছিল। কোন গোটা গোটা অক্ষরে লেখা কোন নির্দ্দেশনামা নয়, কিন্তু সে অলক্ষ্যে থেকে মানুষের অভ্যাস ও মূল্যবোধকে নিয়ন্ত্রণ করছে। সেখানে শৃঙ্খলা আছে বলেই বিশৃঙ্খলার প্রবেশ নিষেধ।
ধীরে ধীরে সময় অতিক্রান্ত হয় এবং তার সাথে সাথে কিছু পুরাতনকে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে পাল্টে ফেলতে হয়, মানুষ আবার তার সাথে মানিয়ে নেয় , সেটা মানুষের সহজাত অভ্যাস।
এই আচার-অনুষ্ঠানকে অস্বীকার করলে শাস্তির খাড়ার পরিবর্তে সমালোচনার বাঁকা শেলে সে মানুষটি বিদ্ধ হয়, যা শারীরিক শাস্তির থেকে বড্ড শক্তিশালী। এই সমাজ নামক দেহটি গঠনে আর্য্য এবং অনার্যদের মধ্যে অবশ্যিই কিছু কিছু অবদান আছে।
বিভিন্ন সভা-সমিতিতে বক্তিতায় কেউ কেউ দাবি করে যে, হিন্দু ধর্ম পাঁচহাজার বছরে পুরাতন - এটার পিছনে কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে কি ? এবার প্রশ্নটা লাবন্যর দিক থেকে এলো প্রশান্ত কাছে।
ইতিহাস চর্চার ছাত্রদের যদি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়, তাহলে তারা সেই উপাদানভিত্তিক তত্ত্ব সমৃদ্ধ ঘটনাবলীকেই তুলে ধরবে। যেখান থেকে পাঠক সত্যকে উদ্ধার করতে সমর্থ হবে আর সেখানে কোন সত্যকে গোপন করে বিশেষ উদেশ্যে বিবৃতি দেবার প্রয়োজনীয়তা থাকবেনা। প্রশান্তকে বহুবার দেশে-বিদেশে এই ধরনের বহু প্রশ্নের সম্মুখীন তাকে হতে হয়েছে।
ধর্ম চিরকালীনই একটা প্রবাহ। নদী যেমন সমস্ত বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করে আপাত অনন্ত সেই সমুদ্র পানে ধেয়ে যায়, দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্মও মুক্তির মার্গের দিকে গিয়ে তার যাত্রাকে সমাপ্ত করে অনন্তর সাথে একাত্ম হয়ে যায়। যেখানে নদী তার গতি হারায় সেখানে মজে যাওয়া জলাশয়ে শেওলা জমে যায় , ঠিক সেই মতো ধর্মও যদি তার গতিকে হারায় সেখানে কুসংকারের জন্ম হয়। শব্দগত দিক থেকে 'ধর্ম' কথাটা এসেছে সংস্কৃত 'ধৃ ' ধাতু থেকে, যার অর্থ ' যা ধারণ করে'। সে সব সময় সতেজ এবং জীবনরক্ষাকারী কোন মানুষের জীবনের ক্ষতি করে নয়।
যে স্থূল প্রক্রিয়ায় একটি মানুষ শৈশব থেকে অবশেষে এক জন পরিণত মানুষে পরিবর্তিত হয়, সেরকম সুক্ষ প্রক্রিয়ায় মাধ্যমে নিজেকে জানার জন্য অবিরাম সামনের দিকে এগিয়ে যায়। এই ক্ষুদ্র থেকে বৃহত্তর সত্যের দিকে মানুষের চেতনার যে নিরন্তর বিস্তার, সেই যাত্রার পথই হলো প্রকৃত ধর্ম। এই আলোকধারায় চলতে চলতে সামনের বিশাল আলোকবর্তিকা মুছে দেয় সবধরনের সংকীর্ণতা, সে তখন বিশ্বজনীন প্রেমের দিকে ধাবিত হয়ে এক অনন্ত প্রবাহের রূপ নেয়। তার এই আত্মিক বন্ধনের পিপাসা তাকে পৌঁছে দেয় সেই জগতের সেই অনন্তের কাছে।
ক্রমশঃ
মন্তব্যসমূহ