৪২১ প্রফেসর চেনোওয়েথের তত্ত্বের আলোকে আজকের আন্দোলন
৪২১ প্রফেসর চেনোওয়েথের তত্ত্বের আলোকে আজকের আন্দোলন
গল্পটা হতে পারে দুর্নীতিবিরোধী কোনো বিশাল জমায়েতের, ছাত্রদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের, অথবা কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত জাগরণের। আসুন, প্রফেসর এরিকা চেনোওয়েথের তত্ত্বের চশমা দিয়ে জন্তর মন্তরের এমনই এক আন্দোলনের একটি দৃশ্যপট বিশ্লেষণ করা যাক।
গল্পের প্রধান চরিত্র হতে পারে বিপ্লব রাজপূত, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন তরুণ গবেষক। তার হাতে চেনোওয়েথ ও স্টেফানের সেই বিখ্যাত বইটি—"Why Civil Resistance Works"। সে ব্যারিকেডের একপাশে দাঁড়িয়ে জন্তর মন্তরের এই বিশাল জনসমুদ্র পর্যবেক্ষণ করছে এবং বইয়ের তত্ত্বগুলোর সাথে বাস্তবের মিল খুঁজছে।
১. সাধারণের অংশগ্রহণ: ব্যারিকেডের ওপারের বৈচিত্র্য
বিপ্লবের চোখ আটকে গেল একটি দৃশ্যে। ব্যারিকেডের খুব কাছে বসে আছেন পঁচাত্তর বছর বয়সী এক বৃদ্ধা, তার পাশেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল তরুণ-তরুণী গলা ফাটিয়ে স্লোগান দিচ্ছে, আর একটু দূরে কয়েকজন কৃষক মিলে বিশাল হাঁড়িতে সবার জন্য 'লঙ্গর' (খাবার) রান্না করছেন।
বিপ্লব বইয়ের পাতা মিলিয়ে দেখল। চেনোওয়েথ ঠিক এটাই বলেছিলেন—"Mass
Participation" বা ব্যাপক অংশগ্রহণ। আন্দোলনটা যদি সশস্ত্র হতো, তবে এই বৃদ্ধা বা তরুণীরা এখানে থাকতে পারতেন না। অহিংস হওয়ার কারণেই এটি আর শুধু 'শক্তিশালী যুবকদের' আন্দোলন নেই; এটি সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। এই বিশাল বৈচিত্র্যই আন্দোলনকে একটি অদম্য নৈতিক শক্তি দিচ্ছে।
২. উস্কানি বনাম শৃঙ্খলা: অহিংসার কৌশলগত শক্তি
হঠাৎ দুপুরের দিকে উত্তেজনা ছড়াল। গুজব রটল যে পুলিশ লাঠিচার্জ করবে। সামনের সারিতে থাকা কয়েকজন যুবক উত্তেজিত হয়ে ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করল। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে বয়স্ক নেতারা মাইকে ঘোষণা দিলেন, "কেউ ব্যারিকেড ছোঁবেন না! সবাই রাস্তায় বসে পড়ুন। আমাদের অস্ত্র হলো ধৈর্য।"
হাজার হাজার মানুষ একযোগে পিচঢালা রাস্তায় বসে পড়ল এবং জাতীয় সঙ্গীত গাইতে শুরু করল। বিপ্লবের মনে পড়ল চেনোওয়েথের বিশ্লেষণের কথা। সরকার বা প্রশাসন সবসময় চায় আন্দোলনকারীরা যেন অন্তত একটা ঢিল ছোঁড়ে, যাতে তারা পাল্টা শক্তি প্রয়োগের আইনি ও নৈতিক বৈধতা পেয়ে যায়। কিন্তু এই কঠোর অহিংস শৃঙ্খলা সরকারের সেই ফাঁদকে পুরোপুরি অকেজো করে দিল।
৩. রক্ষকের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব: আনুগত্যের পরিবর্তন
রাস্তায় বসে পড়া মানুষগুলোর ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে দাঙ্গা পুলিশের একটি সারি। তাদের হাতে লাঠি, মাথায় হেলমেট, গায়ে বর্ম। বিপ্লব খেয়াল করল, এক তরুণ পুলিশ কনস্টেবল অবাক দৃষ্টিতে সামনের বৃদ্ধ কৃষকের দিকে তাকিয়ে আছে। বৃদ্ধের চেহারাটা ঠিক তার গ্রামের বাবার মতো। বৃদ্ধ যখন নিজের বোতল থেকে জল এগিয়ে দিলেন ওই কনস্টেবলকে, ছেলেটি লাঠি নামিয়ে জল খেল।
চেনোওয়েথের গবেষণার অন্যতম মূল ভিত্তি হলো "Defection"
বা নিরাপত্তা বাহিনীর আনুগত্যের পরিবর্তন। যখন আন্দোলনকারীরা সশস্ত্র থাকে, পুলিশ নিজের প্রাণ বাঁচাতে গুলি চালায়। কিন্তু যখন কোনো নিরীহ বৃদ্ধ বা নারী ফুল বা জল এগিয়ে দেয়, তখন ওই ইউনিফর্মের আড়ালে থাকা মানুষটার পক্ষে বলপ্রয়োগ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। সরকারের দমননীতির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার এভাবেই ভোঁতা হয়ে যায়।
৪. ৩.৫% নিয়মের নীরব প্রতিধ্বনি
জন্তর মন্তরে হয়তো ৫০ হাজার মানুষ জড়ো হয়েছে। ভারতের ১৪০ কোটি জনসংখ্যার তুলনায় এটি কিছুই নয়। কিন্তু বিপ্লব জানে, এই ৫০ হাজার মানুষ হলো একটা স্ফুলিঙ্গ। এখান থেকে ছবি, ভিডিও আর খবর ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশের মানুষের ফোনে ফোনে।
হয়তো রাস্তায় নামেনি, কিন্তু দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ মানুষ নিজেদের মতো করে সমর্থন জানাচ্ছে—কেউ একদিনের জন্য দোকান বন্ধ রেখে, কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখে, কেউবা মোমবাতি মিছিল করে। চেনোওয়েথের "৩.৫% রুল" ঠিক এভাবেই কাজ করে। যখন একটি অহিংস আন্দোলন দেশের একটি ক্ষুদ্র কিন্তু সক্রিয় অংশকে (৩.৫%) রাস্তায় নামাতে বা সম্পৃক্ত করতে পারে, তখন তার ঢেউ ক্ষমতার মসনদ পর্যন্ত আছড়ে পড়ে। কোনো সরকারি কাঠামোই এতো বিশাল সংখ্যক মানুষের অসহযোগিতা নিয়ে টিকে থাকতে পারে না।
সূর্য ডুবতে শুরু করেছে। জন্তর মন্তরের আকাশ স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত।বিপ্লব তার ডায়েরিতে লিখে রাখল, "অহিংসা কোনো দুর্বলতা নয়, এটি ক্ষমতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে সুশৃঙ্খল ও নিখুঁত এক কৌশল।"
প্রফেসর চেনোওয়েথের ডেটা আর পরিসংখ্যান জন্তর মন্তরের এই পিচঢালা রাস্তায় এসে যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। বন্দুক বা বোমার চেয়ে সাধারণ মানুষের এই শান্ত, ঐক্যবদ্ধ এবং সুশৃঙ্খল অবস্থানই যে ইতিহাস পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার, জন্তর মন্তরের এই জনসমুদ্রই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
এই ধরনের অহিংস আন্দোলন সফল করার জন্য নেতারা সাধারণত কী কী কৌশল (Tactics) অবলম্বন করেন? চেনোওয়েথের মতে এর ধাপগুলো কী?
প্রফেসর এরিকা চেনোওয়েথ এবং জেন শার্প (Gene Sharp)-এর মতো গবেষকদের মতে, অহিংস আন্দোলন কোনোভাবেই "নিষ্ক্রিয়" (Passive) কিছু নয়; বরং এটি হলো অস্ত্রহীন এক সুপরিকল্পিত যুদ্ধ। একটি সফল অহিংস আন্দোলন আবেগের চেয়ে কৌশলের ওপর বেশি নির্ভর করে।
গবেষণায় অহিংস আন্দোলনের কৌশলগুলোকে প্রধানত তিনটি বড় ভাগে ভাগ করা হয়েছে এবং এটি সফল করার জন্য নির্দিষ্ট কিছু ধাপ বা নীতি অনুসরণ করা হয়।
অহিংস আন্দোলনের প্রধান ৩টি কৌশল (Tactics)
নেতারা পরিস্থিতি অনুযায়ী এই তিন ধরনের কৌশলের মিশ্রণ ঘটিয়ে থাকেন:
১. প্রতিবাদ ও প্ররোচনা (Protest and Persuasion) এটি মূলত আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়। এর মূল লক্ষ্য হলো মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং দাবিগুলো সবার সামনে তুলে ধরা।
- উদাহরণ: মিছিল, সমাবেশ, প্ল্যাকার্ড বা ব্যানার প্রদর্শন, পিটিশন বা গণস্বাক্ষর সংগ্রহ, মোমবাতি প্রজ্বলন এবং প্রকাশ্যে বক্তৃতা।
- সীমাবদ্ধতা: এটি সরকারকে সরাসরি অচল করে না, তবে জনমত গঠনে সাহায্য করে।
- অর্থনৈতিক অসহযোগ: শ্রমিকদের ধর্মঘট (Strikes), নির্দিষ্ট পণ্য বয়কট, ট্যাক্স বা কর দিতে অস্বীকৃতি।
- সামাজিক ও রাজনৈতিক অসহযোগ: সরকারি অনুষ্ঠান বর্জন, স্কুল-কলেজে না যাওয়া, এবং সরকারি কর্মকর্তাদের নির্দেশ অমান্য করা।
- উদাহরণ: রাস্তা বা রেললাইন অবরোধ, সরকারি ভবনের সামনে অবস্থান ধর্মঘট (Sit-ins), অনশন, এবং বিকল্প বা সমান্তরাল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
- যেমন, যদি সরকার রাস্তায় জমায়েত নিষিদ্ধ করে এবং দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেয়, তখন নেতারা "মিছিল" বাতিল করে "স্টে-অ্যাট-হোম ধর্মঘট" (সবাই নিজ নিজ ঘরে অবস্থান করবে, কাজে যাবে না) ডাক দেন। এতে কেউ রাস্তায় না নামলেও পুরো শহর অচল হয়ে যায় এবং পুলিশ চাইলেও ঘরে ঢুকে গুলি চালাতে পারে না।
- ধর্মঘট ও বয়কট: মানুষ রাস্তায় না নেমে যদি ঘরে বসে থাকে (Stay-at-home strike), কারখানায় কাজ বন্ধ করে দেয়, বা ট্যাক্স দেওয়া বন্ধ করে দেয়—তবে সরকারের কিছুই করার থাকে না।
- অদৃশ্য অসহযোগ: পুলিশ বা সেনাবাহিনী ফাঁকা রাস্তায় বা মানুষের ঘরের ভেতর ঢুকে গুলি চালাতে পারে না। অর্থাৎ, আন্দোলনকারীরা তখন এমন কৌশল বেছে নেয় যা দমন করার জন্য বন্দুক বা লাঠি একেবারেই অকার্যকর।
- বিদ্রোহ ও অবাধ্যতা: চরম দমন-পীড়ন চালাতে গিয়ে বাহিনীর অনেক সদস্য মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তারা বুঝতে পারেন যে তারা কোনো বিদেশি শত্রুর বিরুদ্ধে নয়, বরং নিজেদেরই দেশবাসীর বিরুদ্ধে লড়ছেন। ফলস্বরূপ, বাহিনীর ভেতরেই অবাধ্যতা শুরু হয় এবং তারা সরকারের নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানায় বা বিদ্রোহ করে।
- নিষেধাজ্ঞা ও বিচ্ছিন্নতা: মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে বিদেশি মিত্ররা মুখ ফিরিয়ে নেয়, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয় এবং বিদেশি সাহায্য বা ঋণ বন্ধ হয়ে যায়। একটি স্বৈরতান্ত্রিক সরকার যখন আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং দেশের ভেতরেও মানুষের অসহযোগিতার শিকার হয়, তখন অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে এবং সরকারের টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে ওঠে।
- কিন্তু শত উস্কানি ও হত্যার পরেও যদি আন্দোলনকারীরা কঠোর অহিংস শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারে, তবে সরকারের সহিংসতার কোনো আইনি বা নৈতিক বৈধতা থাকে না। এই শৃঙ্খলাই সরকারের শেষ অস্ত্রটিকে পুরোপুরি ভোঁতা করে দেয়।
২. অসহযোগ - চেনোওয়েথের গবেষণায় এটিকে সবচেয়ে শক্তিশালী এবং কার্যকর কৌশল হিসেবে ধরা হয়। সমাজ ও রাষ্ট্র মূলত সাধারণ মানুষের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে চলে। মানুষ যদি সহযোগিতা করা বন্ধ করে দেয়, তবে সরকারের ক্ষমতা পঙ্গু হয়ে যায়।
৩. অহিংস হস্তক্ষেপ - এটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল, যেখানে আন্দোলনকারীরা সরাসরি সরকারি কার্যক্রমে শারীরিক বা কাঠামোগত বাধা সৃষ্টি করে।
সফলতার ধাপ বা কৌশলগত নীতি
চেনোওয়েথের মতে, একটি অহিংস আন্দোলন কেবল রাস্তায় মানুষ নামালেই সফল হয় না। একে চূড়ান্ত রূপ দিতে নেতারা মূলত ৪টি ধাপ বা নীতি অবলম্বন করেন:
ধাপ ১: ব্যাপক ও বৈচিত্র্যময় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা
আন্দোলনের প্রথম কাজ হলো ৩.৫% মানুষের সমর্থন আদায়ের দিকে এগিয়ে যাওয়া। নেতারা এমন ইস্যু বেছে নেন যা শুধু নির্দিষ্ট একটি দলের নয়, বরং সমাজের বৃহত্তর অংশের (নারী, বয়স্ক, ছাত্র, শ্রমিক, ব্যবসায়ী) স্বার্থের সাথে জড়িত। বৈচিত্র্যময় অংশগ্রহণই আন্দোলনকে লেজিটিমেসি বা বৈধতা দেয়।
ধাপ ২: কঠোর অহিংস শৃঙ্খলা বজায় রাখা
নেতাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আন্দোলনকে শান্তিপূর্ণ রাখা। সরকার প্রায়ই এজেন্ট বা উস্কানিদাতা পাঠিয়ে আন্দোলনকে সহিংস করার চেষ্টা করে, যাতে তারা দমন-পীড়নের আইনি বৈধতা পায়। নেতারা কড়া নির্দেশ দেন এবং নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী তৈরি করেন, যাতে কেউ কোনোভাবেই পাল্টা আক্রমণ না করে। অহিংস শৃঙ্খলা বজায় থাকলে সরকারের বলপ্রয়োগ উল্টো সরকারের জন্যই বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়।
ধাপ ৩: কৌশলের ধারাবাহিকতা পরিবর্তন
সরকার যখন এক ধরনের কৌশল দমন করতে শিখে যায়, নেতাদের তখন কৌশল পাল্টাতে হয়।
ধাপ ৪: ক্ষমতার খুঁটিগুলোর আনুগত্য পরিবর্তন
যেকোনো সরকার বা স্বৈরশাসক টিকে থাকে মূলত কয়েকটি খুঁটির ওপর—নিরাপত্তা বাহিনী (পুলিশ/সেনাবাহিনী), ব্যবসায়ী বা এলিট শ্রেণি, আমলাতন্ত্র এবং রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম। আন্দোলনের চূড়ান্ত ধাপে নেতারা এই খুঁটিগুলোকে সরকারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করেন। অহিংস আচরণ এবং ব্যাপক জনসমর্থন দেখে ব্যবসায়ী শ্রেণি ভয় পায় যে অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, আর সেনাবাহিনী বুঝতে পারে তারা নিজেদের আত্মীয়-স্বজন বা দেশের সাধারণ মানুষের ওপর আর গুলি চালাতে পারবে না। যখন এই খুঁটিগুলো সরকারের পাশ থেকে সরে দাঁড়ায় বা নিরপেক্ষ হয়ে যায়, তখনই স্বৈরশাসনের পতন ঘটে।
সরকার চরম দমন-পীড়ন চালালে কী হয়?
যদি সরকার অহিংস আন্দোলনকারীদের ওপর চরম মাত্রায় বলপ্রয়োগ বা গুলি চালায়, তখন চেনোওয়েথের থিওরি অনুযায়ী আন্দোলন কীভাবে টিকে থাকে?
অহিংস আন্দোলনের সবচেয়ে কঠিন এবং চূড়ান্ত পরীক্ষাটি তখনই হয়, যখন স্বৈরাচারী সরকার তাদের শেষ অস্ত্র—চরম বলপ্রয়োগ বা গুলি—ব্যবহার করে। সাধারণ দৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে বন্দুকের নলের সামনে অহিংস আন্দোলন হয়তো টিকতে পারবে না। কিন্তু প্রফেসর এরিকা চেনোওয়েথ এবং অন্যান্য গবেষকদের (যেমন জিন শার্প) তত্ত্ব অনুযায়ী, চরম দমন-পীড়ন আন্দোলনকে ধ্বংস করার বদলে অনেক সময় সরকারের পতনকেই ত্বরান্বিত করে।
সরকারের চরম সহিংসতার মুখে অহিংস আন্দোলন কীভাবে টিকে থাকে এবং জয়ী হয়, তার প্রধান কয়েকটি কারণ নিচে দেওয়া হলো:
১. পলিটিক্যাল জিউ-জুৎসু বা ব্যাকফায়ার ইফেক্ট
মার্শাল আর্ট 'জিউ-জুৎসু'-তে যেমন প্রতিপক্ষের শক্তিকেই তার নিজের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়, অহিংস আন্দোলনেও ঠিক তাই ঘটে। নিরস্ত্র ও শান্তিকামী মানুষের ওপর যখন সরকার নির্মমভাবে গুলি চালায়, তখন সেটি সরকারের জন্যই 'ব্যাকফায়ার' (Backfire) বা বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়।
নিরীহ মানুষের রক্তপাত সাধারণ জনগণের মনে প্রবল ক্ষোভ ও নৈতিক ঘৃণার জন্ম দেয়। যেসব মানুষ এতদিন নিরপেক্ষ ছিল বা ভয় পেয়ে চুপ ছিল, তারাও সরকারের এই নির্মমতায় ক্ষুব্ধ হয়ে আন্দোলনে যোগ দেয়। সরকারের এই বলপ্রয়োগ উল্টো আন্দোলনের পক্ষে জনসমর্থন ও অংশগ্রহণ আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
২. কৌশলগত বিকেন্দ্রীকরণ
যখন সরকার রাস্তায় জমায়েত বা মিছিলের ওপর সরাসরি গুলি চালায়, তখন সফল আন্দোলনের নেতারা জমায়েতের কৌশল থেকে সরে এসে বিকেন্দ্রীভূত কৌশলে চলে যান।
৩. নিরাপত্তা বাহিনীর ভেতরে দ্রুত ভাঙন
চেনোওয়েথের গবেষণার একটি বড় অংশ জুড়ে আছে এই বিষয়টি। যখন নিরাপত্তা বাহিনীকে (পুলিশ বা সেনাবাহিনী) বারবার নিরস্ত্র, পরিচিত এবং সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়, তখন তাদের মধ্যে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।
৪. আন্তর্জাতিক বৈধতা হারানো
অহিংস আন্দোলনকারীদের ওপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালালে সরকার খুব দ্রুত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন হারায়।
৫. অহিংস শৃঙ্খলা ধরে রাখার অসীম শক্তি
সরকার মূলত চায় আন্দোলনকারীরা যেন অন্তত পাল্টা একটা গুলি বা বোমা ছোঁড়ে। কারণ তাহলে সরকার দেশি-বিদেশি মিডিয়ার কাছে প্রচার করতে পারে যে আন্দোলনকারীরা "সন্ত্রাসী", এবং তাদের দমন করার জন্য গুলি চালানোটা "আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে বৈধ"।
সরকারের চরম বলপ্রয়োগ অহিংস আন্দোলনকে শেষ করতে পারে না, যদি আন্দোলনকারীরা কৌশল পরিবর্তন করতে পারে। বলপ্রয়োগ তখন আন্দোলনের জন্য 'ক্যাটালিস্ট' বা প্রভাবক হিসেবে কাজ করে, যা সরকারের নিষ্ঠুর রূপ উন্মোচন করে দেয়, নিরাপত্তা বাহিনীর আনুগত্য নষ্ট করে এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে চূড়ান্ত অসহযোগিতার দিকে ঠেলে দিয়ে ক্ষমতার পতন নিশ্চিত করে।
এই আন্দোলন একটি সুচারু বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের নিপুন প্রয়োগ মাত্র, গল্প বানানোর দরকার নেই।
মন্তব্যসমূহ