৪২২ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -ষষ্ঠ পর্ব )

৪২২ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -ষষ্ঠ  পর্ব )

( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে  উস্কে দেয় )    

গত সংখ্যায় যা আছে --

যে স্থূল প্রক্রিয়ায় একটি মানুষ শৈশব থেকে অবশেষে এক জন পরিণত মানুষে পরিবর্তিত হয়, সেরকম সুক্ষ প্রক্রিয়ায়  মাধ্যমে নিজেকে জানার জন্য অবিরাম সামনের দিকে এগিয়ে যায়।  এই ক্ষুদ্র থেকে বৃহত্তর সত্যের দিকে  মানুষের চেতনার যে নিরন্তর বিস্তার, সেই যাত্রার পথই হলো প্রকৃত ধর্ম। এই আলোকধারায় চলতে চলতে সামনের বিশাল আলোকবর্তিকা মুছে দেয় সবধরনের সংকীর্ণতা, সে তখন বিশ্বজনীন প্রেমের দিকে ধাবিত হয়ে এক অনন্ত প্রবাহের রূপ নেয়।  তার এই আত্মিক বন্ধনের পিপাসা  তাকে পৌঁছে দেয় সেই  জগতের সেই অনন্তের কাছে।  এর পর ০০০০০০০০০০

অস্বচ্ছ ধারণা বড্ড পীড়ার কারণ,  সেটি যদি ধর্ম সংক্রান্ত অসত্য ভাষণ হয়।  তাই  সময় বহুদিন ধরে দাবি করছে বেশ কিছু প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা থেকে ভারতের ধর্মের পরম্পরাকে মুক্ত করার প্রয়োজনীয়তাকে।  তাই ভারতবর্ষের ধর্মের বিবর্তনতাকে সঠিকভাবে না জানলে অন্ধ অনুরাগ দেহ-মনকে আচ্ছন্ন করতে পারে। যুক্তি বিহ্বলতার আশ্রয় নিতে পারে। 

প্রশান্ত নরেনকে বলল, অডিওটা ওন করতে। কারণ পরে যদি কোন জায়গার সংযোজন অথবা পরিবর্তন করতে হয় এবং তার রেফারেন্স টানতে হয়, তার জন্য বলে যাওয়া কথা গুলি পুনরায় শোনার প্রয়োজনীয়তা আছে। যেখানে আমার বলার উদেশ্য যেন প্রশ্নহীন নির্ভুল ইতিবৃত্তের অবতারণা করে। যাকে সম্বল করে  ইতিহাসের অসুস্থতার  সাথে বোঝাপড়া করা যাবে। 

আমাদের আলোচনা এখন স্পর্শ করবে  সেই পাঁচহাজার বছর পূর্বে মানুষের স্বাধীন ধর্ম চর্চার আসরে। সঙ্গে সঙ্গে বিভাস প্রশ্ন করলো হরপ্পার আগেও তো মানুষ  ধর্ম চর্চা নিশ্চয় করতো, সেখান থেকে আলোচনাটিকে শুরু করলে, কেমন হয় ?

প্রশান্ত বেশ উল্লাসিত হয়ে উঠলো এই প্রশ্নটি শুনে, কেননা সবাই এই প্রশ্নটি উল্লেখ করে না। বেশ তবে আরম্ভ হোক। অধুনা পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের কাচ্চি একটি সমভূমি অঞ্চল যাকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল সেই মেহেরগড়  সভ্যতা।  ছিলনা কোন লিপি কিংবা ধর্মগ্রন্থ তাই ঐতিহাসিকদের সম্বল ছিল কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল পোড়ামাটির মূর্তি, সমাধি ও গুহাচিত্র।এর উপর ভিত্তি করে সেদিনের মানুষের অভ্যাস গুলির কিছু আভাস আমরা পাই।   

ধারণাগুলোকে সমৃদ্ধ করেছিল প্রচুর নারীমূর্তি উদ্ধারের প্রাচুর্যতা থেকে । কার্য্য দৃশ্যমান  আর তাকে নিয়ে অনুমান আর সেখানে থেকে কারণের উৎপত্তি। তাই এই নারী মূর্তি  সৃষ্টির পিছনের কারণ অনুসন্ধান ও আনুসাঙ্গিক তদানীন্তন  সামগ্রিক পরিবেশকে বিশ্লেষণ করে এবং পরবর্তী সময়ে  ঋগ্বেদের শ্লোকগুলি সহায়ক হয়েছিল একটা বিশ্বাসযোগ্য সিদ্ধান্তে আসতে। 

দীর্ঘ বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে তদানীন্তন মানুষ পশু শিকারভিত্তিক জীবন ও জীবিকা  থেকে উন্নীত হলো  প্রকৃতি নির্ভর চাষ-আবাদের উপর।  যুগে যুগে  প্রাথমিকভাবে মানুষ তার দেহধারণের উপায়ের সন্ধান করে গেছে। সম্ভবত তার অনেক পরে এসেছে মনকে নিয়ে চর্চা। মানুষ তার জ্ঞান হবার সময় থেকে দেখেছে একমাত্র মাতাই  যত্ন করে মুখে অন্নের যোগান দিয়েছে।  আজ যখন মাতার স্থানটি দখল  করেছে সেই মাটি বা পৃথিবী, তখন স্বভাবিকভাবেই এই পৃথিবী হয়ে  উঠলো মা'র আরেকটি রূপ। যে ঐশ্বরিক শক্তির প্রাদুর্ভাবে মানুষের  মঙ্গল সাধিত হয়, তার কাছে পরাজিত হয় মানুষের অহংকারের,  তখন সেই শক্তিপূজিত হয় মানবসমাজে দেবজ্ঞানে।  

যেই শক্তিকে বুদ্ধির দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় না, যে থাকে জ্ঞানের ওপারে কিন্তু  সে যখন মানুষের ভালো-মন্দের নির্ণায়ক হয়ে উঠে, তখন সেই অসহায়তা থেকে মানুষ তাদের  স্থান দেয় শ্রদ্ধার আসনে।  এ যেন শক্তের প্রতি ভক্তির নিবেদন।  

অবচেতন মনে সেই শক্তিদের  নিঃশব্দ পদচারণা ফুলে-ফলে প্রস্ফুটিত হয়ে  ওঠে কখন গুহাচিত্রের মাধ্যমে আবার কখনো বা বিমূর্ত  ভঙ্গিতে। বহুদিন পরে একদল অত্যুৎসাহী মানুষ তার খোঁজ পেয়ে বিশ্লেষণে বসেন, তারা কেমনটি ছিলেন। কারণ হচ্ছে, এই আজকের আমরা বিগত দিনে কেমনটি ছিলাম। উত্তরাধিকার সূত্রে কতটা পেলাম আর কতটা ফেলে এলাম তার যুক্তি সঙ্গত কারণ খুঁজতে।  

মেহেরগড়ের  সমাধিতে যে সব মৃতদেহের ও তার সাথে ব্যবহৃত জিনিসপত্র ইঙ্গিত করে সে যুগের মানুষেরা পরজন্মে বিশ্বাসী ছিল। 

জ্ঞান যেখানে পাড়ি দিতে পারে না সেখানে তো অজ্ঞানই বাস  করে - এটা  যেমন ভীষণ সত্যি, সেরকম জ্ঞান আর অজ্ঞানের মাঝখানের শূন্যতাকে ভরিয়ে দেয় বিভিন্ন সংস্কার, অবৈজ্ঞানিক আচার অনুষ্ঠান। যেমন, মৃত ব্যক্তির আত্মাকে  সন্তুষ্ট রাখার জন্য আদিম রীতিনীতি প্রচলিত ছিল, তেমনি, অসুখ-বিসুখ , বন্যজন্তুর আক্রমণ বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতেও এই অনুষ্ঠানের প্রচলন ছিল। 

আসলে হরপ্পার আগে আমরা যাকে ধর্ম বলে সম্বোধন করে থাকি, তার উপস্থিতি ছিল না কিন্তু তৎকালীন সমাজ চারণ করতো প্রকৃতির প্রতি ভক্তি নিবেদনের রীতি ছিল একান্ত উর্বরতার কারণে, পরলৌকিক বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা  কিছু আদিম রীতিনীতির ব্যঞ্জনার অভিব্যক্তি। এই গতানুগতিকতা  পরবর্তী কালে হরপ্পার সভ্যতার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়। আজও যে নেই   সে কথাও বলা যায় না। 

    আজ থেকে পাঁচহাজার বছর আগে ভারতবর্ষের ধর্ম কি ছিল জানতে গেলে সিন্ধু বা হরপ্পার সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার উপর বিশেষ জোর দিতে হবে। হরপ্পার লিপির পাঠোদ্ধার এখনো সম্ভব হয়ে ওঠেনি। কারণ,  কোন দ্বিভাষিক লিপি খুঁজে পাওয়া যায় নি। এই দ্বিভাষিক লিপির মাধ্যমে মিশরীয় হায়ারোগ্লিফিক লিপি পড়া সম্ভব হয়েছিল কারণ প্রাচীন গ্রিক ভাষার সাথে তার একটি তুলনামূলক ফলক পাওয়া গিয়েছিল।  সিন্ধু সভ্যতার যে সিলমোহর, তামার পাত ও মাটির পাত্রে যে অতীব ক্ষুদ্র লিপি পাওয়া গেছে, সেখান থেকে তথ্য উদ্ধার করার মতো অবস্থায় নেই।     

ধর্ম সম্পর্কে যে ধারণা পাওয়া যায় তার সূত্র হচ্ছে বিভিন্ন সিলমোহর, পোড়ামাটির মূর্তি এবং ধংসাবশেষ। এসব থেকে ধর্ম ভাবনা সম্পর্কে একটা ধারণা  দেওয়া যেতে পারে। ধর্মের মূল দর্শন ছিল প্রকৃতির সাথে একাত্মতা এবং  সৃষ্টির শক্তির আরাধনা। সিন্ধু সভ্যতার ভগ্নাবশের মধ্যে  অসংখ্য নারীমূর্তি পাওয়া গেছে। যে কোন সৃষ্টির প্রারম্ভটা শুরু হয়, মানুষ কোন ছবিটিকে তার হৃদয়ে স্থান দিয়েছে, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে। 

 মানুষ নিজেকে ভীষণ ভালোবাসে, সেকারণে তাদের অস্তিত্বকে রক্ষার ক্ষেত্রে যাদের  ভূমিকা ছিল সবথেকে বেশি, তারাই নমস্য বলে পূজিত হয়েছে। এই দেহ ধারণের জন্য প্রাথমিক প্রয়োজন ছিল খাদ্যের আর তার যোগান দিতে পারে শস্য উৎপাদন এবং তার জন্য চাই মাটির উর্বরতা। মাতৃকুলের সাথে সৃষ্টির নিবিড় সখ্যতা, অন্যভাবে  বলতে গেলে সৃষ্টির অপর নাম মাতা। তাই সেদিন সেই মাতৃদেবীর  আরাধনা ছিল সমগ্র অন্তর জুড়ে। তার নিদর্শন হরপ্পার সভ্যতার আনাচে-কানাচে লক্ষ্য করা যায়। 

খাদ্য ও জীবনের নিরাপত্তা  ছিল মানুষের জীবনের একমাত্র কাম্য। আজও সেই নিয়মের কোন ব্যতিক্রম হয় নি। অর্থাৎ যে মানুষকে খাদ্য ও নিরাপত্তা দেবে, তাকেই মানুষ মাথায় তুলে রাখবে এবং দেবতার আসনে প্রতিষ্ঠিত করবে। আবার সেটা না পেলে নতুন দেবতার খোঁজ শুরু হয়ে যাবে। তাই সেই হরপ্পার যুগে মানুষের জীবনের অস্তিত্বের সাথে যারা যারা জড়িত ছিল, তারাই ছিল পূজনীয়।  সেই মান্যতার প্রশ্নে প্রকৃতি ও বৃক্ষ পূজার প্রচলন ছিল। কথায় আছে জীব মাত্রই শক্তের ভক্ত। প্রবল শক্তিশালী পশুদের পূজা করার রেওয়াজ ছিল।  তারা ভাবতো ঐশ্বরিক  শক্তিতে পশুরা  বলীয়ান, তাই তাদের মধ্যে সেই সত্তাটাকে তারা উপলদ্ধি করতে চাইতো।   

 ভারতের ধর্মের  মূল সুরটি সাধারণ মানুষের জীবনযাপন পদ্ধতির সাথে একাত্ম হয়ে ছিল। তারপরে এলো আর্যরা, শুরু হলো বৈদিক যুগ।  আজও আমরা হিন্দু ধর্মের রীতিনীতির মধ্যে সেই শিবকে খুঁজে পাই, মাতৃদেবীর  ও বৃক্ষের বন্দনা সূচিত হয়। এসবই হরপ্পা আর বৈদিক সভ্যতার মিশ্র প্রকাশ। 

স্বভাবতই  এই প্রশ্নটি সবার মনে ঘুরপাক খাবে, কেন সিন্ধু সভ্যতার  যুগে  দেব-দেবী ও বৃক্ষের বন্দনা  করা হতো ? কার্য্য ও কারণের নিয়ম অনুসারে আমরা যদি কারণ অনুসন্ধান করি, তাহলে দেখতে পাব এর পিছনে মানুষের অত্যন্ত গভীর কিছু  মনস্তাত্ত্বিক কারণও  কাজ করেছিল। যেমন বিবর্তনের পিছনে এক ধরণের মনস্তত্ত্ব কাজ করে। সেই আদিম মানুষের চিন্তাধারা বিশ্লেষেণ করলে তারই প্রতিধ্বনি শুনতে পাই। 

চেনা জগতের বাইরে ঘটে যাওয়া ঘটনা প্রবাহকে সে যুগের মানুষ তাদের জানার সীমাব্ধতার কারণে জড় বস্তুর মধ্যে সচেতন সত্ত্বাকে খুঁজে পেতো , সেখান থেকেই দেব-দেবীর কল্পনাটা তাদের মানসপটে ভেসে উঠতো। অসহায় মানুষ প্রকৃতির রুদ্র মূর্তির কাছে নতজানু হয়ে জীবন ভিক্ষা চাইতো, পূজা অর্চনা ছিল তারই বহিঃপ্রকাশ। 

প্রকৃতির প্রতি চরম নির্ভরতা কালে কালে সেটা মানবিক সম্পর্কে পর্যবসিত হলো। স্নেহ-মায়ার বন্ধনে মা যেমন শিশুকে ধীরে ধীরে বড় করে তোলে, সেরকম  প্রকৃতির জগতে মাটি, ফসল উৎপাদন করে সেই প্রাচীন মানুষের  মুখে অন্ন তুলে তার অস্তিত্বকে অটুট রাখে, এ যেন মায়েরই প্রতিমূর্তি। 

ভয়ের সাথে ভক্তির এক গভীর সম্পর্ক আছে। যেখানে ভয়কে অতিক্রম করার শক্তি নেই, সেখানে আছে আত্মসমর্পন। প্রকৃতির জগতে অতিপ্রাকৃতিক আচরণের কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ছিল না তাই তারা ভয়ের উৎসের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে জানাতে তারা  কখন যে  তাদের আরাধ্য দেবতা হয়ে যায়, সেটা নিজেরাই জানেনা। 

একই ধরনের দেবতার প্রতি সার্বজনীন ভক্তির থেকে সমগ্র সমাজের মধ্যে  এক কালেকটিভ বিলিফ সিস্টেম গড়ে উঠে, যেটা একটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ  করতে সাহায্য করে। সিন্ধু সভ্যতার মানুষদের সময় সেটা শিখিয়েছিলো  কি ভাবে মনস্তাত্ত্বিক কবচ পরিধান করতে হয় বেঁচে থাকতে গেলে। এই যৌথ আবশ্যিকতা থেকে সমাজ চারণ করতে শেখে যে পদ্ধতিকে -সেটাই ছিল সেযুগের ধর্ম। 

ক্রমশঃ 

কলমে - রবীন মজুমদার 
২৭/০৭/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 


 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)