৪২৩ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -সপ্তম পর্ব )
৪২৩ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -সপ্তম পর্ব )
( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে উস্কে দেয় )
গত সংখ্যায় যা আছে --
একই ধরনের দেবতার প্রতি সার্বজনীন ভক্তির থেকে সমগ্র সমাজের মধ্যে এক কালেকটিভ বিলিফ সিস্টেম গড়ে উঠে, যেটা একটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে সাহায্য করে। সিন্ধু সভ্যতার মানুষদের সময় সেটা শিখিয়েছিলো কি ভাবে মনস্তাত্ত্বিক কবচ পরিধান করতে হয় বেঁচে থাকতে গেলে। এই যৌথ আবশ্যিকতা থেকে সমাজ চারণ করতে শেখে যে পদ্ধতিকে -সেটাই ছিল সেযুগের ধর্ম।
আজ ইতিহাস প্রাচীন সংস্কৃতির চর্চার মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখেনি বরং বৃহত্তর অঙ্গনে প্রবেশ করে সে এখন সামাজিক বিজ্ঞানের এক অবিছেদ্দ অঙ্গ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
এক্ষেত্রে, স্বভাবতই প্রশ্ন আসতে পারে কেন ইতিহাস এই তকমার অধিকারী হলো ? - এর উত্তরে বলা যেতে পারে, যে ঘটনাবলী সামাজিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে, সে অবশ্যিই সামাজিক বিজ্ঞান না হবার কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই।
তাছাড়া, যে কোন বস্তু হোক কিংবা কোন মতবাদকে আজকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে গেলে, তার পিছনে যুক্তিগ্রাহ্য কারণ এবং প্রমান কি আছে, তাকে প্রথমেই সেই স্থানটিতে উত্তীর্ণ হতে হয়।
কেন এই জানার প্রয়োজনীয়তা ?
বহু প্রশ্নের উত্তরের পৰ্য্যালোচনা করতে গিয়ে এর অসামান্য ঐতিহাসিক গুরুত্বগুলি আজ মানুষ অনুধাবন করেছেন। একের পর এক রাজবংশগুলির উত্থান-পতন ঘটেছে। শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, তার সাথে জড়িয়ে আছে একটি জাতির সাংস্কৃতিক পরিবর্তনও।
কি ভাবে তারা ছিল তার কথা বলবে এই প্রামাণ্য ঐতিহাসিক দলিল। পরিবর্তন শুধু রাজনৈতিক হয় না, তার প্রভাব পরে অর্থনৈতিক কাঠামোতে আর এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাব পরিলক্ষিত হয় নাগরিকের সমাজ জীবনে।
সাথে সাথে একটা প্রশ্ন উদয় হয় যে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতের মানুষ কোথাও তাদের কোন ভাবনাকে যেমন গ্রহণ করেছে এবং পাশাপাশি বর্জনও করেছে আবার কোথাও পরিমার্জন করেছেন। ইতিহাস আলোচনার ক্ষেত্রে এই ইন্ট্রিগ্রেটিকে অস্বীকার করা যাবে না।
ল্যাবরেটরিতে যেমন কয়েক ফোটা রক্ত পরীক্ষা করে জানতে পারা যায় যে দেহটিতে কোন ব্যাধির আগ্রাসন হয়েছে। সময়কালটা ছিল আনুমানিক ২৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে কিছু নমুনা উদ্ধার হয়েছিল মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পা নামক দুটি শহর থেকে আর সেই নমুনা থেকে এই উপমহাদেশের সভ্যতার একটি চিত্র নির্মিত হয়েছিল , যা আজকে সিন্ধু সভ্যতা নামে খ্যাত।
এবার আসা যাক, ভারতীয়দের ঔদার্য্যতার নজির স্বরূপ অবলীলায় পারসিকদের উচ্চারণের অসঙ্গতিতে "স"এর স্থানে "হ"কে বসিয়ে "সিন্ধু" কখন যে "হিন্দু " হয়ে উঠল এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেই অনাঙ্খিত উচ্চারণকে পরিবর্তন না করে আঁকড়ে নিয়ে বসে আছে। এটা অবশ্যিই মানতে হবে 'হিন্দু' শব্দটা ভারতীয়দের ধর্মীয় পরিচয় নয় বরং ভৌগলিক পরিচয় বলাই যুক্তিসঙ্গত। কেননা, সিন্ধু নদটি ভারতের উল্লেখযোগ্য সাতটি নদীর মধ্যে একটি অন্যতম নদী।
আবার ফিরে আসি, সেই পুরোনো কথায়, সাধারণভাবে যেসব ধর্ম বেদকে অস্বীকার করে তারা সনাতন ধর্ম নয়। আসলে এই কথার ভিত্তি কতটা তথ্য ভিত্তিক কিংবা অনুমান ভিত্তিক তার অনুসন্ধান করতে হবে ইতিহাসের আলোকে।
'সনাতনের' শব্দগত অর্থ, তার দার্শনিক অর্থ ও শাস্ত্রীয় অর্থকে না আলোচনা করলে গোটা ব্যাপারটা অসম্পূর্ন থেকে যাবে।
সংস্কৃত শব্দভাণ্ডার থেকে চয়ন করে যে অর্থ নির্মিত হয় সেই আলোকে তাকে বলা হয় 'চিরন্তন', শাশ্বত, যার কোন শুরু নেই অর্থাৎ অনাদি আবার যার কোন শেষ নেই অর্থাৎ অনন্ত, যার কোন মৃত্যু নেই অর্থাৎ অবিনশ্বর।
সময় যাকে বেঁধে রাখতে পারেনা, অস্তিত্ব কখন সময় দ্বারা সীমাবদ্ধ নয় তাকেই সনাতন বলা হয়।
দার্শনিক অর্থে - উপনিষদ,গীতা, বেদান্তে এই চিরন্তন সত্যের ধারণা গুরত্ব সহকারে বিশ্লেষিত হয়েছে। অন্তর্নিহিত ভাব বিশ্লেষণ করলে আত্মাকে "সনাতন " আখ্যায় ভূষিত করা যায়।
তাহলে, সনাতন শব্দটিকে কোন বিশেষ সম্প্রদায়ের মধ্যে বেঁধে রাখাটা কি এই শব্দটির প্রতি যথেষ্ট অবিচার করা হবে না তো ? তার সাথে ধর্ম নামটি জুড়ে দিলে, সে তো বন্ধন মুক্ত হয়ে বিশ্ববিধানের হাত ধরে অনন্তের পথে যাত্রা করবে। তাকে তো আর বাধা যাবে না।
তবুও "সনাতন ধর্ম" শব্দটি ভারতীয় বৈদিক, পৌরাণিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের একটি আত্মপরিচয় হিসাবে সুসজ্জিত করার চেষ্টা চলে আসছে। যদি ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়, তবে 'হিন্দুধর্ম' অপেক্ষা 'সনাতন'শব্দটি অধিক প্রাচীন এবং তার ব্যাপকতা অনুমানের অতীত।
বেদে সনাতন ধারণা -ঋগ্বেদে "সনাতন" শব্দটি বর্তমান অর্থে ধর্মীয় পরিচয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি। তবে ঋত —অর্থাৎ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের শাশ্বত নিয়ম—ধারণাটি সনাতন ভাবনার ভিত্তি। সূর্যের উদয়-অস্ত, ঋতুচক্র, প্রকৃতির নিয়ম এবং নৈতিক শৃঙ্খলাকে এক চিরন্তন বিধান হিসেবে দেখা হয়েছে।
মানুষ তার নিজের প্রয়োজনে ধর্মকে বারবার ব্যবহার করেছে, কখনো পরিবর্ধন আবার কখনো বা পরিমার্জন করেছে তার বহু নিদর্শন ইতিহাসের পাতায় জ্বল জ্বল করছে। সময়ে সময়ে প্রাসঙ্গিগতার ভিত্তিতে উল্লেখ করলে বোধগম্য হতে বিলম্ব লাগবে না।
মানুষ যদি নিজের প্রয়োজনে ধর্মকে ব্যবহার করে তাহলে ধর্ম অবশ্যিই একটা গতিশীল বস্তু হিসাবে ধরে নিতে হবে। যে বস্তু পরিবর্তনশীল সে বস্তু কখনই সত্যনিষ্ঠ বস্তু হতে পারে না অর্থাৎ সে সনাতন পর্যায়ভুক্ত নয়। এখানে মনে রাখা প্রয়োজন যে প্রকৃত ধর্ম কিন্তু অবিকৃত থাকে। পুরোহিত সম্প্রদায় ও শাসকের যৌথ প্রযোজনায় রচিত এই ধর্মের মুখোশটা সমাজকে চারণ করতে হয় বলেই সেই অর্থে সে ধর্মের তকমা পায়। নীতির সাথে ধর্মের সম্পর্ক নিবিড় কিন্তু প্রয়োজন বিশেষে ধর্ম নীতির হাত ছেড়ে খানিকটা স্বাধীন পথে হাটতে শুরু করে এবং পথভ্রষ্ট হয়।
তাহলে, বোঝা যায় যে ধর্মের কাঠামোকে অক্ষুন্ন রেখে বিভিন্ন সময় বিশেষে সমাজের দন্ডমুন্ডের কর্তারা যুগে যুগে এই কাজটি শাসকের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে সাধারণ মানুষের উপর চাপিয়ে দিয়েছে, মূলত নিজ স্বার্থ সিদ্ধির জন্য। তখন অবশ্যিই সেই ধর্ম 'সনাতন' কথাটির প্রতি যথাযথ মর্যাদা পালন করতে পারে না, তখন গোটা ব্যাপারটাই একটা প্রহসনে পরিণত হয়। এই প্রহসনের যাত্রাপালায় যখন সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সংগঠিত হয় তখন সাধারণ মানুষ অজ্ঞতার কারণে কতকটা না বুঝে, কিংবা শাসকের ভয়ে-ভক্তিতে সেটা পালন করতে থাকে। মেকী সংস্কারের প্রতি অন্ধ আনুগত্য এক্ষেত্রে যোগ্য সঙ্গত করে থাকে। শাসকের মূলধন সেখানে হয় প্রজাদের অজ্ঞতা। এই অজ্ঞতাকে জিইয়ে রাখার জন্য শিক্ষার উপর অনবরত তাদের নজরদারির দরকার হয়ে পরে। ইতিহাস বিকৃতি এই পৰ্য্যায় থেকে আবির্ভূত হয়ে পাঠ্যক্রমের মধ্যে দিয়ে ছাত্রদের শাসকের অবৈজ্ঞানিক শিক্ষার মাধ্যমে আগামী প্রজন্মের নড়বড়ে বুনিয়াদ গঠন করতে উদ্দত হয়।
একদিন এই ভারতবর্ষ বহু মনীষীদের আবির্ভাবে সমৃদ্ধ হয়েছিল কিন্তু আজ নতুন করে কেউ আর আসছেন না। বড় বড় যাঁরা ইতিহাসবিদ বলে থাকেন, যাঁরা মানবজাতিকে নিয়ে চিন্তন করেছেন , তাঁরা বলেছেন, মানুষের যদি খাওয়া পড়ার ব্যাপারটি একপ্রকার নিশ্চিন্ত আর অনবরত ঘরে-বাইরের থেকে শত্রুর আক্রমণের আশঙ্কা না থাকে, তখন মানুষের মন ধীরে ধীরে অন্তরমুখী হতে শুরু করে আর সেখান থেকে জন্ম নেয় শিল্প, সাহিত্য,কবিতা, দর্শন ইত্যাদি। পাশাপাশি যে জাতি ক্রমান্বয়ে যুদ্ধ-বিগ্রহে জড়িয়ে পরে, খাওয়ায়-পড়ার অভাব থাকে, সেই সব জাতি খুব হিংস্র প্রকৃতির হয়।
প্রাচীন ভারতের দিকে তাকলে দেখা যায়, সেদিন মানুষের যাত্রা ছিল অন্তর্মুখী, তাই শিক্ষা ও সংস্কৃতি খুবই উন্নত ছিল। গোটা সমাজটা মূল্যবোধের উপর দাঁড়িয়ে ছিল। বিবিধ কারণে ক্রমবর্ধমান সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে আজ সমাজে মূল্যবোধের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। শাসকের সাথে একজোট হয়ে কিছু স্বার্থন্বেষী মানুষ সাধারণ মানুষের মনে পারস্পরিক বিদ্বেষের বীজ ক্রমান্বয়ে বপন করে চলছে, তার ফলস্বরূপ, ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিক সমাজ নিমজ্জিত হচ্ছে এক বর্বরদের সমাজে, যেখানে সামাজিক মূল্যবোধ সুদূর পরাহত। কারণ, প্রকৃত শিক্ষার ক্ষেত্রটাকে ক্রমান্বয়ে সংকুচিত করা তোলা।
ইতিহাসকে পড়া নয়, জানার জন্য ইতিহাসের গবেষকগণ যুক্ত করতে চাইছেন প্রত্যেকটি ঘটনার কারণ ও উদ্দেশ্যকে তুলে ধরার, যাতে করে অতিরঞ্জন, প্রক্ষেপন ও বিকৃতিপনার দূষণ থেকে ইতিহাস মুক্ত হয়।
ক্রমশঃ
মন্তব্যসমূহ