৪৪৩ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -২২ তম পর্ব )
৪৪৩ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -২২ তম পর্ব )
( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে উস্কে দেয় )
গত সংখ্যায় যা আছে --রাজারা যখন যুদ্ধ বৃত্তিতে মগ্ন তখন পুরোহিতরা নিত্য নতুন যজ্ঞের পরিকল্পনায় বিভোর। যুদ্ধে জয়ী হলে রাজার সম্পদ বৃদ্ধি হতো, সেই সঙ্গে উপার্জিত সম্পদ থেকে খানিকটা অংশ বেশ বুদ্ধি খাটিয়ে পুরোহিতরা যজ্ঞনুষ্ঠানের নামে নিজেদের হিত সাধন করতো।
যজুর্বেদে এর বহু উদাহরণ পাওয়া যায়। জাতিভেদ ও ধর্মচারণ এই দুইয়ের সম্মিলিত মেলবন্ধনে পরবর্তী বৈদিক যুগে ধর্মচারণ এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
২২ তম পর্ব ........
সামাজিক স্মৃতিই ইতিহাসের প্রথম খাতা। সেখানে কালি দিয়ে লেখা থাকে না মানুষের জীবন; লেখা থাকে মানুষের মনে। এক প্রজন্মের দেখা, আর-এক প্রজন্মের শোনা, তার পরের প্রজন্মের বিশ্বাস—এইভাবেই স্মৃতির শরীর বদলাতে বদলাতে একদিন তার নাম হয় ইতিহাস।
বৈদিক সমাজের আনাচে-কানাচে ঘটে যাওয়া কত ঘটনার ছায়া যেন পরবর্তী কালের মহাভারতের সমাজে এসে পড়েছে। আবার মহাভারতের সেই সমাজের কত প্রতিধ্বনি আজকের সমাজের অলিগলিতেও শোনা যায়। মানুষ বদলায়, পোশাক বদলায়, অস্ত্র বদলায়, রাজদণ্ড বদলায়—কিন্তু ক্ষমতার চরিত্রটি আশ্চর্য রকমের স্থির। এইভাবেই ইতিহাস কাল থেকে কালান্তরে বীরদর্পে এগিয়ে চলে; কখনও রথে চড়ে, কখনও ঘোড়ার পিঠে, আবার কখনও মানুষের মনের ভিতর দিয়ে।
তরোয়ালের ধার দিয়ে রাজ্য জয় করা যায়, কিন্তু মানুষের মন জয়—অথবা বলা ভালো, মানুষের মন নিয়ন্ত্রণ—করতে তরোয়ালের চেয়েও ধারালো অস্ত্রের প্রয়োজন। সেই অস্ত্রটি হল বিদ্যা।
ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলে এসে সেই বিদ্যার ব্যবহার যেন আরও সচেতন হয়ে উঠতে দেখা যায়। মন্ত্র কেবল দেবতার উদ্দেশে উচ্চারিত শব্দ নয়; শব্দের মধ্যেই তখন তৈরি হতে থাকে সমাজ, ক্ষমতা, মর্যাদা এবং শ্রেষ্ঠত্বের এক অদৃশ্য স্থাপত্য।
যাই হোক, এবার আমাদের একটু ঢুকে পড়তে হবে সেই বৈদিক সমাজের অন্দরে—যেখানে যজ্ঞের ধোঁয়ার আড়ালে শুধু দেবতার উদ্দেশে আহুতি দেওয়া হচ্ছিল না, সমাজের কাঠামোটিও ধীরে ধীরে গড়ে উঠছিল।
খবরের উপর খবরদারি করার একটা পুরোনো ঐতিহ্য আছে মানুষের সমাজে। কে কী জানবে, কে কী বলবে, কার কথা সত্য বলে গণ্য হবে—এসবের উপর যার নিয়ন্ত্রণ, তার হাতেই আসলে ইতিহাসের কলমটি থাকে। বৈদিক সমাজেও এই জ্ঞানের দরজার চাবি সকলের হাতে ছিল না। অধিক ক্ষমতাশালী ব্রাহ্মণদের একটি অংশ সেই চাবিটি নিজেদের কাছেই রাখতে চেয়েছিলেন।
কারণ ক্ষমতাবান মানুষ শুধু বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না; সে অতীতকেও নিজের পছন্দমতো সাজাতে চায়। ইতিহাসের লাগামটা তাই সে নিজের হাতেই রাখতে চায়।
এবার ফিরে আসা যাক ঋগ্বেদের ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলির কথায়। এগুলিকে এক অর্থে ঋগ্বেদ বোঝার সহায়িকা বলা যেতে পারে। ঋগ্বেদের মন্ত্রগুলি কী অর্থ বহন করে, কোন যজ্ঞে কীভাবে সেগুলি প্রয়োগ করতে হবে, কোন মন্ত্রের পরে কোন আচার, পুরোহিতের ভূমিকা কী—এই সমস্ত কিছুর বিস্তৃত ব্যাখ্যা আমরা ব্রাহ্মণ সাহিত্যে দেখতে পাই।
অর্থাৎ মন্ত্র উচ্চারণ করলেন একজন, কিন্তু সেই মন্ত্রের অর্থ কী—তা বোঝানোর অধিকার অন্য একজনের হাতে।
এই জায়গাটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ জ্ঞান শুধু জানার বিষয় নয়; জ্ঞানকে ব্যাখ্যা করার অধিকারও এক ধরনের ক্ষমতা।
সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে সমাজের সর্বোচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে শুধু শক্তি দিয়ে হয় না। তার জন্য প্রয়োজন একটি বিশ্বাসের কাঠামো। প্রয়োজন এমন এক সামাজিক গল্প, যেখানে বলা হবে—এই শ্রেষ্ঠত্ব স্বাভাবিক, এই মর্যাদা প্রাপ্য, এই অবস্থান প্রশ্নাতীত।
ব্রাহ্মণ সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ভূমিকা এখানেই খুঁজে পাওয়া যায়। ব্রাহ্মণদের আচারগত ও ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বকে একটি স্বীকৃত সামাজিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রবণতা সেখানে স্পষ্ট। সেই সঙ্গে তাদের উপর কিছু সামাজিক দায়িত্বও আরোপিত হয়েছিল।
এখানে ইতিহাসের গল্পটা একটু অন্যরকম।
সমাজ যখন একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে কায়িক পরিশ্রমের অনেকটাই থেকে মুক্তি দেয়, তখন তার বিনিময়ে সেই গোষ্ঠীর উপর একটি সামাজিক ঋণও বর্তায়। আর সেই ঋণ শোধ করার সবচেয়ে বড় পথ হতে পারত—জ্ঞানকে মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া।
কিন্তু জ্ঞান যদি সবার সম্পত্তি না হয়ে কয়েকজনের গচ্ছিত ধন হয়ে যায়, তখন জ্ঞান আর শুধু আলো থাকে না; সে হয়ে ওঠে ক্ষমতার প্রদীপ।
সমাজ এক থাকলে তাকে স্তরে স্তরে ভাগ করা কঠিন। তাই মানুষের মধ্যে প্রথমে তৈরি হল বিভাজনের রেখা—বর্ণের রেখা। একসময়ের বৃহৎ সমাজ ধীরে ধীরে নানা পরিচয়ে খণ্ডিত হল। আর সেই বিভাজিত কাঠামোর শীর্ষে বসানো হল শিক্ষার কারবারিদের।
ব্রাহ্মণ হয়ে উঠলেন জ্ঞানের প্রহরী।
কিন্তু প্রহরীর হাতে যদি থাকে দরজার চাবি, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—দরজাটি কার জন্য খোলা থাকবে?
মানবজীবনে পরনির্ভরশীলতা এক অদ্ভুত অভিশাপ। দুর্বল নির্ভর করে শক্তিমানের উপর, সম্পদহীন নির্ভর করে সম্পদবানের উপর, আর অশিক্ষিত নির্ভর করে শিক্ষিতের উপর। কিন্তু এদের মধ্যে সবচেয়ে গভীর নির্ভরশীলতা হল জ্ঞানের ক্ষেত্রে।
কারণ সম্পদ হারালে মানুষ আবার সম্পদ অর্জন করতে পারে, শক্তি হারালে শক্তি ফিরে পেতে পারে; কিন্তু যে মানুষকে জ্ঞান থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, তার সামনে নিজের পৃথিবীটাকেই চিনে নেওয়ার দরজাটি বন্ধ হয়ে যায়।
সমস্যাটা এখানেই।
সমাজপতিরা যদি শিক্ষার আলো সবার মধ্যে সমানভাবে ছড়িয়ে না দেন, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই একটি অন্ধকারের জন্ম হয়। আর অন্ধকারে থাকা মানুষের সংখ্যাই যখন বেশি হয়, তখন সেই অন্ধকারই একদিন সমাজের স্বাভাবিক আলো বলে মনে হতে শুরু করে।
মন্তব্যসমূহ