৪৪৪ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -২৩ তম পর্ব )
৪৪৪ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -২৩ তম পর্ব )
( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে উস্কে দেয় )
গত সংখ্যায় যা আছে --কারণ ইতিহাসের যুদ্ধ সবসময় তরোয়াল দিয়ে হয় না। কখনও যুদ্ধ হয় কে জানবে আর কে জানবে না—এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে। আর যে দিন থেকে জ্ঞানের দরজায় প্রহরী বসে, সেই দিন থেকেই ইতিহাসের লাগামও কারও না কারও হাতে চলে যায়।
২৩ তম পর্ব ........
প্রয়োজন, কৌতূহল, সমস্যার সুচারু সমাধানের আকাঙ্ক্ষা—আর সবকিছুর অভিমুখ, নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার নিরন্তর প্রয়াস। যখন তার সঙ্গে যখন যুক্ত হয় অজানাকে জানার অদম্য ইচ্ছা, তখন এই দুই প্রবাহের এক অপূর্ব মেলবন্ধন থেকেই জন্ম নেয় আবিষ্কার।
মানুষ যখন প্রথম আকাশের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চাইল—সূর্য কেন ওঠে, আকাশে চাঁদের বাড়া-কমার খেলা, ঋতু কেন ফিরে আসে, বৃষ্টি আসে-যায় —তখন তার কৌতূহল আর নিছক কৌতূহল রইল না; এই রহস্যকে ভেদ করে মানব জীবনে কিভাবে এই পরিবর্তনকে কাজে লাগাতে যায় , সেটাই ছিল আগামী দিনের লক্ষ্য। সময়কে মাপা, প্রকৃতির ছন্দকে বোঝা এবং সেই ছন্দের সঙ্গে নিজেদের জীবনকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলার প্রয়োজন থেকেই প্রাচীন সভ্যতাগুলিতে জ্যোতির্বিদ্যা ও বর্ষপঞ্জির বিকাশ ঘটেছিল।
ভারতীয় সমাজেও দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানসঞ্চয়ের ভিত্তিতে বৈদিক যুগের জ্ঞানীরা ঋতুচক্র ও সময়ের হিসাবকে একটি সুসংবদ্ধ কাঠামোর মধ্যে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেই জ্ঞানের ব্যবহারিক সুফল পেয়েছিল সমাজের বহু স্তর—বিশেষত কৃষিজীবী মানুষ এবং নৌ-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত মানুষ। কখন বীজ বোনা হবে, কখন ফসল কাটা হবে, কখন নদী বা সমুদ্রযাত্রা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ—এসব প্রশ্নের উত্তর জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল।
কিন্তু মানুষের জিজ্ঞাসা কখনও কেবল ব্যবহারিক জগতের সীমানায় থেমে থাকে না।
অচেনাকে জানার এবং অজানাকে চেনার দীর্ঘদিনের সঞ্চিত বাসনা একসময় তাকে আরেকটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—এই দৃশ্যমান জগতের অন্তরালে কি আরও কোনও অদৃশ্য জগত আছে? প্রকৃতির নিয়মকে বোঝার পর মানুষ জানতে চাইল, এই নিয়মের নিয়ামক কে? জীবন কোথা থেকে এল? মৃত্যুর পরে কী? দেবতা কারা? মানুষ ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সম্পর্কই বা কী?
এই প্রশ্ন থেকেই ব্যবহারিক জ্ঞান ধীরে ধীরে আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের দিকে যাত্রা শুরু করল।
আশ্চর্যের বিষয়, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতায় প্রায় একই সময়ে মানুষের এই মানসিক অভিযাত্রার নানা রূপ দেখা যায়। সুদূর দক্ষিণ আমেরিকার মায়া সভ্যতা থেকে শুরু করে মিশরীয়, ব্যাবিলনীয় ও ইহুদি ধর্মীয় ঐতিহ্যের পুরোহিতসমাজ—সর্বত্রই প্রকৃতি, সময়, দেবতা ও সৃষ্টির রহস্যকে বোঝার চেষ্টা মানুষের চিন্তাকে একটি বিশেষ শ্রেণির হাতে কেন্দ্রীভূত করেছিল।
প্রকৃতি যেমন তার নিজস্ব নিয়মে পরিচালিত হয়, তেমনই প্রাচীন মানুষের চোখে বস্তুজগতের অদৃশ্য নিয়মগুলির সঙ্গে দেবতাদের একটি গভীর সম্পর্ক ছিল। আর দেবতাদের সঙ্গে যোগাযোগের অধিকার যাঁরা নিজেদের হাতে রেখেছিলেন, তাঁরাই ক্রমশ হয়ে উঠলেন নিয়মের নিয়ামক।
এখানেই জ্ঞানের সঙ্গে ক্ষমতার এক অদৃশ্য সেতু তৈরি হল।
যিনি জানেন, তিনি কেবল জ্ঞানী নন—অনেক সময় তিনিই হয়ে ওঠেন ক্ষমতার অধিকারী। আর যে সমাজ জানে না, সে স্বাভাবিকভাবেই জ্ঞানীর ব্যাখ্যার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে পুরোহিত কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পরিচালক রইলেন না; তিনি হয়ে উঠলেন দেবতা, প্রকৃতি, রাজা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যবর্তী এক অপরিহার্য মধ্যস্থতাকারী।
এই কারণেই বহু প্রাচীন সমাজে পুরোহিতদের মর্যাদা রাজাদের কাছাকাছি, কখনও বা তারও ঊর্ধ্বে উঠে গিয়েছিল।
মানুষের ইতিহাসে ক্ষমতার এই স্বভাব নতুন নয়। প্রথমে যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কোনও জ্ঞান অর্জন করে, পরবর্তী সময়ে সে সেই জ্ঞানকে নিজের সামাজিক অবস্থান সুদৃঢ় করার কাজে ব্যবহার করতে চায়। ভারতীয় সমাজেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। বৈদিক পরবর্তী ব্রাহ্মণ সাহিত্যে এমন বহু আখ্যান পাওয়া যায় যেখানে রাজশক্তির সঙ্গে ব্রাহ্মণশক্তির সম্পর্ক, সংঘাত এবং পারস্পরিক নির্ভরতার চিত্র ফুটে উঠেছে। কোথাও পুরোহিত রাজাকে নিয়ন্ত্রণ করছেন, কোথাও রাজা পুরোহিতের স্বীকৃতির উপর নির্ভর করছেন—অর্থাৎ রাজনৈতিক ক্ষমতা ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব একে অপরকে প্রভাবিত করছে।
মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই মানুষ প্রতিকূল প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে নিজের অস্তিত্বকে রক্ষা করেছে। এই সংগ্রামের বড় একটি অংশ ছিল জ্ঞান ও অজ্ঞানের মধ্যবর্তী অন্ধকারে পথ খোঁজা। সমাজের অপেক্ষাকৃত শিক্ষিত মানুষ সেই অন্ধকারকে অন্যদের তুলনায় গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু জ্ঞান যখন সমাজের সম্পদ না হয়ে কোনও বিশেষ গোষ্ঠীর একচেটিয়া সম্পদ হয়ে ওঠে, তখন তার চরিত্রও ধীরে ধীরে বদলে যেতে পারে।
মানুষের আকাঙ্ক্ষা ছিল সহজ—সন্তান, খাদ্য, বৃষ্টি, ফসল, স্বাস্থ্য, সমৃদ্ধি। রাজার আকাঙ্ক্ষা ছিল আরও বড়—বিজয়, দীর্ঘস্থায়ী রাজ্য, শত্রুর বিনাশ, প্রজার উপর কর্তৃত্ব এবং নিজের ক্ষমতার স্থায়িত্ব।
পুরোহিতেরা মানুষের এই অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষাকে খুব সূক্ষ্মভাবে লক্ষ্য করেছিলেন।
সেখান থেকেই শুরু হল এক নতুন পরিকল্পনা।
ধর্মের হৃদয়ে যে নৈতিকতা, আত্মসংযম এবং সত্যের অনুসন্ধান থাকার কথা, তার পাশাপাশি ক্রমশ গুরুত্ব পেল কামনা পূরণের আচার। যজ্ঞ হয়ে উঠল সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। কিন্তু যজ্ঞ যত জটিল হল, তার সঙ্গে যুক্ত হল তত বেশি মন্ত্র, বিধি, নিষেধ, উপাচার এবং বিশেষজ্ঞ পুরোহিতের প্রয়োজন।
একটি সাধারণ আচার ধীরে ধীরে হয়ে উঠল এক বিশাল ধর্মীয় অনুষ্ঠান।
যজ্ঞের আকার যত বড় হল, পুরোহিতের প্রয়োজনও তত অপরিহার্য হয়ে উঠল।
এ যেন জ্ঞানের এমন এক স্থাপত্য, যার দরজার চাবিটি কেবলমাত্র কয়েকজনের হাতে।
প্রকৃতিও সেই বিশ্বাসকে অনেক সময় আপাতভাবে সমর্থন করত। কৃষকের কামনা—কম পরিশ্রমে অধিক ফসল। বৃষ্টি এল, জমি উর্বর হল, ফসল ফলল। তখন প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের পরিবর্তে সেই সাফল্যের কৃতিত্ব দেওয়া হল যজ্ঞকে। আর যজ্ঞের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত যিনি—তিনি পুরোহিত।
ফলে প্রকৃতির নিয়ম, মানুষের শ্রম এবং পুরোহিতের আচার—এই তিনটি পৃথক সত্য একসময় মানুষের চেতনায় একাকার হয়ে গেল।
অজ্ঞতার অন্ধকার পথ ধরে যুগে যুগে অলৌকিকতার প্রবেশ ঘটেছে। মানুষ কখনও তাকে বুঝে, কখনও না বুঝেই গ্রহণ করেছে। রহস্যের মধ্যে মানুষের এক ধরনের স্বাভাবিক আকর্ষণ আছে। যুক্তি যেখানে ধীরে ধীরে এগোয়, রহস্য সেখানে এক লাফে উত্তর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।
আর সেই প্রতিশ্রুতির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে তার মাদকতা।
একটি গল্পের শুরু নেই, শেষ নেই—তবু তার সঙ্গে যদি 'কথিত', 'শাস্ত্রে আছে', 'প্রাচীনরা বলেছেন' কিংবা 'দেবতারা করেছিলেন'—এই ধরনের শব্দ জুড়ে দেওয়া যায়, তবে তার অবাস্তবতাও অনেক সময় মানুষের চোখে বাস্তবতার পোশাক পরে নেয়।
এইভাবেই বাতাসে ভেসে বেড়াতে শুরু করল নানা অলৌকিক কাহিনি।
যেমন—যজ্ঞই সেই মাধ্যম, যার দ্বারা দেবতারা স্বর্গে গমন করেছিলেন; এমনকি মানুষও যথাযথ যজ্ঞের মাধ্যমে স্বর্গ লাভ করতে পারে।
তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ(১: ৬: ৫: ২৭)-এর একটি অংশে যজ্ঞের মাধ্যমে স্বর্গলাভের ধারণার উল্লেখ পাওয়া যায়। এই ধরনের বিশ্বাস মানুষের পার্থিব আকাঙ্ক্ষাকে একটি পরলোকগত প্রতিশ্রুতির সঙ্গে যুক্ত করেছিল। ফলে যজ্ঞ আর কেবল বৃষ্টি বা ফসলের জন্য করা একটি আচার রইল না; তা হয়ে উঠল মানুষের মৃত্যুর পরবর্তী ভাগ্য নির্ধারণের সম্ভাব্য মাধ্যম।
তার সঙ্গে যুক্ত হল ব্রত।
খাদ্যাভ্যাস, উপবাস, আচরণ এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা বিধিনিষেধকে ধর্মীয় আচারের সঙ্গে যুক্ত করা হল। একটি বিশ্বাসকে যখন নিয়মের মাধ্যমে প্রতিদিনের জীবনে প্রবেশ করানো যায়, তখন সেই বিশ্বাস আর কেবল একটি গল্প থাকে না—তা হয়ে ওঠে অভ্যাস।
আর অভ্যাস যখন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে, তখন একসময় মানুষ তার উৎসের কথা ভুলে যায়; শুধু নিয়মটিকে সত্য বলে মেনে নেয়।
এইখানেই ইতিহাসের প্রয়োজন।
কারণ ইতিহাস কেবল অতীতের ঘটনাগুলির তালিকা নয়। ইতিহাস মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়—কেন এই বিশ্বাস তৈরি হয়েছিল? কার প্রয়োজন ছিল? কে এর দ্বারা উপকৃত হয়েছিল? কীভাবে একটি আচার সামাজিক নিয়মে পরিণত হল? আর কখন একটি জ্ঞান মানুষের মুক্তির পথ থেকে তার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অস্ত্রে পরিণত হল?
যে সমাজ তার অতীতকে জানতে চায় না, সে ধীরে ধীরে নিজের বিশ্বাসের উৎসও ভুলে যায়। আর যে সমাজ তার ইতিহাস ভুলে যায়, তার কাছে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া প্রতিটি প্রথাই একসময় চিরন্তন সত্য বলে মনে হতে পারে।
তাই যারা কোনও ব্যবস্থাকে প্রশ্নহীনভাবে দীর্ঘজীবী করতে চায়, তারা স্বভাবতই ইতিহাসের অনুসন্ধানকে ভয় পায়।
কারণ ইতিহাস প্রশ্ন করে।
আর প্রশ্নই হল অন্ধ বিশ্বাসের প্রথম শত্রু।
মন্তব্যসমূহ