৪৪৫ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -২৪ তম পর্ব )
৪৪৫ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -২৪ তম পর্ব )
( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে উস্কে দেয় )
গত সংখ্যায় যা আছে --যারা কোনও ব্যবস্থাকে প্রশ্নহীনভাবে দীর্ঘজীবী করতে চায়, তারা স্বভাবতই ইতিহাসের অনুসন্ধানকে ভয় পায়। কারণ ইতিহাস প্রশ্ন করে। আর প্রশ্নই হল অন্ধ বিশ্বাসের প্রথম শত্রু।
২৩ তম পর্ব ........
প্রশ্ন যেখানে ইতিহাসকে কিভাবে জানবো, যেহেতু পড়া আর জানা এক নয়, তাই তাকে জানার অদম্য ইচ্ছা থেকে এই বিশ্লেষণ।
ইতিহাস এক সীমাহীন ক্ষেত্র যে যুগের পর যুগ ধরে তার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া চিত্রনাট্যের নীরব সাক্ষী। যে দৃশ্যপট কোন কথা বলেনা কিন্তু তার ক্যানভাসে কতনা মানুষের উত্থান-পতন, জয়-পরাজয়, সৃষ্টি-স্থিতি-বিনাশ, স্বপ্ন ও ব্যর্থতার কত যে কাহিনী তুলির আঁচড়ে ফুটে আছে তার ইয়ত্তা নেই। কেউ তাকে দেখতে পারে আবার কারোর নজর এড়িয়ে যায়। ইতিহাস যেন সেই চিরন্তন মঞ্চ, আর কাল তার নেপথ্যের পরিচালক—যে কখনো দৃশ্যপট পরিবর্তন করে, কখনো চরিত্র বদলে দেয়, আবার কখনো একই চরিত্রকে নতুন ভূমিকায় অবতীর্ণ করে।
কালরূপী ক্ষেত্রজ্ঞ কখনো নাটকের নটদের অভূতপূর্ব কলাকুশলতার জন্য তাদের কালজয়ীর শিরোপা দিচ্ছেন আবার অকৃতকার্য্যের জন্য সময় তাকে বিস্মৃতির অতলে ঠাঁই করে দিচ্ছে। মানুষই কালের প্রতিনিধি; তার কর্মের মধ্য দিয়েই কাল দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, আর তার সৃষ্টির মধ্য দিয়েই ইতিহাস তার ভাষা খুঁজে পায়।
ইতিহাস যখন এক দিগন্ত বিস্তৃত ক্ষেত্র তখন মানুষ সেই জলবায়ুতে বেড়ে ওঠা অতীব ক্ষুদ্র এক তৃণ। শৈশব থেকে পরিণত বয়স পর্য্যন্ত এই দীর্ঘ পথের একমাত্র সাক্ষী এই মানুষ। এখানে কৌতূহলের রকমফের যেমন আছে ঠিক তেমন চাহিদা যোগানের জটিলতার অন্তর্দ্বন্দের সাক্ষরও হৃদয়কে বহন করবার অভিজ্ঞতাও আছে।
বৈচিত্রতা জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। প্রাকৃতিক নিয়মে জীবনের পরিবর্তন সৃষ্টির নিয়ম রীতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কি অদ্ভুত, এক পরিবর্তনের অন্তরালে লুকিয়ে থাকে অন্য কোনো ঘটনা; একটি ঘটনার অভিঘাত জন্ম দেয় পরবর্তী ঘটনার। অর্থাৎ পরিবর্তন এখানে আপেক্ষিক—একটি কারণের সঙ্গে অন্য একটি ফলের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। কখনো সেই কারণ ব্যক্তিগত, কখনো সামাজিক, কখনো অর্থনৈতিক, কখনো রাজনৈতিক, আবার কখনো প্রকৃতির অমোঘ নিয়মের ফল।
দেখতে ভীষণ ক্ষুদ্র কিন্তু যখন সে প্রকাশিত হয়, তখন নিজের অজান্তে জীবনের গতিপথ সম্পূর্ণ পাল্টে দেয়। একটি সিদ্ধান্তের ফল বহু বছর পরে এসে প্রকাশিত হয়; একটি আবিষ্কার বদলে দেয় একটি সমাজের জীবনযাত্রা; একটি যুদ্ধ বদলে দেয় রাষ্ট্রের সীমানা; একটি চিন্তা বদলে দেয় মানুষের বিশ্বাসের ভিত। ফলে ইতিহাসের কোনো ঘটনাই যেন একা দাঁড়িয়ে থাকে না—প্রতিটি ঘটনা তার পূর্ববর্তী কোনো ঘটনার সন্তান এবং পরবর্তী কোনো ঘটনার জনক।
এই কারণেই ইতিহাস কেবল অতীতের ঘটনাপঞ্জি নয়। ইতিহাস আসলে পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা—কারণ ও ফলের এক অন্তহীন শৃঙ্খল। এখানে অতীত কখনো সম্পূর্ণ মৃত নয়; তার ছায়া বর্তমানের উপর এসে পড়ে, আর বর্তমানের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের ইতিহাসের বীজ বপন করে।
মানুষ তাই শুধু ইতিহাসের দর্শক নয়, সে একই সঙ্গে তার নির্মাতা এবং ইতিহাসের দ্বারা নির্মিতও। সে ইতিহাস সৃষ্টি করে, আবার সেই ইতিহাসই তার চিন্তা, সমাজ, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎকে নির্মাণ করে। এই পারস্পরিক নির্মাণের মধ্যেই মানুষ এবং কালের সম্পর্কটি সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে।
কালের যাত্রাপথে এক গভীর শৃঙ্খলা আছে। কিছু উগ্র আত্মবিশ্বাসী মানুষ সেই শৃঙ্খলাকে অস্বীকার করে এগোতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পরে কালের গহ্বরে হারিয়ে যায়। এটা কালের বিরুদ্ধে মানুষের বিদ্রোহ নয় বরং অজ্ঞানতা বলা ভালো। ইতিহাস শুধু মাত্র এদের জায়গা দিয়েছে যাতে আগামী জানতে পারে, তাদের জীবনের পরিনতিটা কেমন হয়েছিল। তা বলে, আগুনে হাত পুড়তে পারে জেনেও মানুষ হাত দেয় না ? এখনও তাতে হাত দেয় এবং হাত পোড়ায়।
মানুষ কালের এক ক্ষণস্থায়ী যাত্রী। সে যদি ইতিহাসের প্রোটোকলকে মেনে এগিয়ে যেতে পারলে ইতিহাস তার খাতায় অবলীলায় তার নাম তুলে দেয়। তা যদি না হয়, তাহলে কালের অসীম স্রোতে বিলীন হয়ে যায়।
অতএব, মানুষ যদি সত্যিই কালের প্রতিনিধি হয়, তবে তার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব কালের সঙ্গে যুদ্ধ করা নয়, বরং তার ক্ষণিক অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলা। কারণ কাল আমাদের কারও জন্য থামবে না; কিন্তু আমরা কালের পথে এমন কিছু রেখে যেতে পারি, যার কাছে একদিন কাল নিজেই থমকে দাঁড়াবে।
আর সেই দিনই হয়তো ইতিহাস মৃদু হেসে বলবে—
“নাটক শেষ হয়নি; শুধু তোমার দৃশ্যটি শেষ হয়েছে।”
চলবে ০০০০০০০০০০
মন্তব্যসমূহ