25 মহাভারতের রাজনীতি ও নারীদের নীরব বলিদান -দ্বিতীয় পর্ব

 মহাভারতের রাজনীতি ও  নারীদের নীরব বলিদান  -দ্বিতীয়  পর্ব 

 কাব্য যখন বহু  বাধা বিঘ্নকে অতিক্রম করে এক  সামাজিক দর্পনের চেহারা নেয় , তখন সে পায়  মহাকাব্যের শিরোপা । অর্থশাস্ত্র, ধর্মশাস্ত্র ,কামশাস্ত্র ও মোক্ষশাস্ত্রের  মেল  বন্ধন মহাভারতকে দেশ,  সময়, কালকে অতিক্রম করে সাহিত্যের  আঙ্গিনায়  শ্রেষ্ঠতার  আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে । গতানুগতিক রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় পূর্বসূরির অবর্তমানে উত্তরসূরিই  রাজ সিংহাসনের দাবিদার হয়।  সবই ঠিক মতো চলছিল। মহারাজ শান্তুনুর অবর্তমানে এবং  ভীষ্মের সিংহাসনে না বসার প্রতিজ্ঞায়, সত্যবতীর জেষ্ঠ্যপুত্র চিত্রাঙ্গদ হস্তিনাপুরের সিংহাসনে আসীন হয়ে ছিলেন।


 ভাগ্যের কি নিদারুন পরিহাস শান্তনুর বিধবা স্ত্রী  সত্যবতীর একে একে সব পুত্র চলে গেলেন প্রথমে  জ্যেষ্ঠ পুত্র  চিত্রাঙ্গদ গন্ধর্বদের সাথে যুদ্ধে নিহত হলেন। হস্তিনাপুর রাজ সিংহাসনে উপবিষ্ট হলেন কনিষ্ঠ্যপুত্র  বিচিত্রবীর্য্য। ধুমধাম করে বিচিত্রবীর্যের বিবাহ দিলেন ভীষ্ম কাশীরাজ  কন্যা অম্বিকা এবং অম্বালিকার সাথে।  বিবাহিত জীবন খুব অল্পসময় অতিবাহিত  করে   যক্ষা রোগে নিঃসন্তান অবস্থ্যায়  বিচিত্রবীর্য্যের মৃত্যু হোল। 


একাধারে ভীষ্মের সিংহাসনে না বসার প্রতিজ্ঞা আর আরেকদিকে সিংহাসনে পরবর্তী উত্তরাধিকারী  না পাওয়ায়  রাজনৈতিক  সংকট। এই খানেই মহাভারতে এক অভূতপূর্ব দ্বান্দিকতার জন্ম দিল। একদিকে ধর্ম আরেকদিকে বাস্তবতা অর্থাৎ প্রয়োজন।


অন্তঃপুর থেকে রাজনীতির অঙ্গনে নেমে এলেন রাজমাতা সত্যবতী।  মনের  অভিলাষকে  গোপনে রেখে তিনি মন্ত্রী পারিষদ ,  ঋষি-মুনি, কুলগুরু এবং ভীষ্মের সাথে আগামীদিনের বংশ  রক্ষার  পরিকল্পনায় প্রতক্ষ্য ভাবে অংশ গ্রহণ করলেন। বহু কৃত্তিম অনুরোধ উপরোধে যখন ভীষ্মকে রাজী করানো গেলনা , অম্বিকা ও অম্বালিকার গর্ভে বংশধর উৎপাদনের জন্য ,  তখন একপ্রকার বাধ্য হয়ে সত্যবতী তার গোপন ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করার জন্য  ঋষি পরাশর ও সত্যবতীর কুমারী অবস্থ্যার একমাত্র পুত্র কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসদেবকে আহবান করলেন। 


শ্রেণী চেতনা বারবার সত্যবতীর মনকে নাড়া দিত । সে আর অন্য কোন রানীদের  মতো   বংশ মর্যাদা নিয়ে কুরু বংশে প্রবেশ করেন নি। অনার্য্যের প্রতি আর্য এবং ব্রাম্মণদের শোষনের এক দীর্ঘ পরম্পরা আছে। তার মধ্যে অনার্য্য নারীরা তাদের ভীষণ সহজ লক্ষ্যবস্তু। পুরুবংশের রাজা উপরিচরবসুর  যৌন লালসার শিকারে অনার্য্য  রমণী অদ্রিকার গর্ভে সত্যবতীর জন্ম। জন্মলগ্ন থেকে পালকপিতা মৎসরাজ দাসের গৃহে প্রতিপালিত হয়েছে।


সত্যবতী একান্তে ভাবছেন , জীবনটা ভাঙ্গা আর গড়ার খেলা। সেই তো সেদিন, তার কৃষ্ণ অঙ্গে যৌবনের জোয়ার এসেছে।  কত মানুষ যে সেই জোয়ারে নিজেকে অবগাহন করতে চায় , সেটা সদ্য প্রস্ফূটিত কুঁড়ি সত্যবতী ,  তাদের চোখের ভাষায় পড়ে  নিতে পারতো । অবশেষে এলো সেই ভয়ংকর দিন, একটা মস্ত মৌমাছি এসে এতো দিন যত্ন করে রক্ষিত সেই  অধরা ফুলের সব মধু নিংড়ে শুষে গেল আর পুঁতে দিয়ে গেল আরেক প্রজাতির সৃষ্টির বীজ। ঋষি পরাশরের সেই আবেদন তাকে হঠাৎই নারী করে তুলেছিল।  সেই বীজ-ই অঙ্কুরিত হয়ে এই বিশ্ব সংসারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসদেব নামে। 
 
ক্রমশঃ   

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)