49 আমি মহাভারতের পৃথা -নবম পর্ব

 আমি মহাভারতের পৃথা -নবম পর্ব 



( গত পর্বে পান্ডুর মৃতদেহ নিয়ে পৃথা হস্তিনাপুরে এসে উপস্থিত হলেন পৃথার  তিন পুত্র এবং মাদ্রীর দুই পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে ) 

কালের আহ্বানে  পৃথার হস্তিনাপুরে আগমন। এই তো সেদিন শতশৃঙ্গ পর্বতে ঋষি মুনিদের আশ্রমে তাদের জীবনের অভিমুখ হয়ে উঠেছিল  নিজেকে   অনুসন্ধানের লক্ষ্যে ।  হঠাৎ এক ঝড়ে  সব ভাবনা চিন্তাকে এক লহমায়  লন্ডভন্ড করে পার্থিব জটিল ভাবনার জগতে অনভিজ্ঞা পৃথাকে ফেলে দিল। পান্ডুর মৃত্যুতে পৃথার চিন্তার জগতে একটা লম্বা ছেদ পরে গেল।  এ পথের গন্তব্যস্থল মহাকালের দ্বারা  পূর্ব নির্ধারিত, তিনি যেন তার  যান্ত্রিক বাহক মাত্র।  


পান্ডুর মৃত্যুর পরবর্তী অভিজ্ঞতা  পৃথাকে একজন দায়িত্বশীল মাতা হিসাবে পরিগণিত  করেছিল । জীবনের উদ্দেশ্যের সাথে বাস্তবের  কিভাবে মেল বন্ধন ঘটাতে হয়,  তা জীবন যুদ্ধে অবতীর্ন হয়ে  সেই বিরল সংকেতকে প্রজ্ঞা নারী পৃথা অনুভব করেছিলেন। অরণ্যের জীবনের সাথে গাহস্থ্য জীবনের বিশাল ব্যবধান।  যাইহোক, যথেষ্ট রাজকীয়ভাবে   পান্ডু এবং মাদ্রীর সৎকার সম্পন্ন হলো। 


হস্তিনাপুরের জমিতে পান্ডু পুত্ররা এক অনাহুত চারা। তার আগেই ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের সাথে রাজবাড়ীর মাটির একটা সখ্যতা জমে উঠেছিলো । মাটি আর চারার মধ্যে সংযোগ ঘটাতে  না পারলে কোনদিন তারা বেড়ে  উঠতে পারবে না, এটা পৃথা মনে মনে অনুভব করেছিলেন। মাটির সাথে চারার সম্পর্কটা অনেকটা খাদ্য আর খাদকের সম্পর্কের মতো। জীব জগতের সংকীর্ণ মানসিকতায় অভ্যস্ত প্রাণীদের আচরণের  শর্ত অনুযায়ী  কৌরবদের জ্যেষ্ঠ্য পুত্র দুর্যোধন নতুনের আগমনটি ভালো চোখে দেখলেন না। মহাভারতের পাতায় পাতায় দুর্য্যোধন যত পাঁক ছড়ালেন পান্ডবদের প্রতি, ততই যেন  পাণ্ডবেরা সুন্দর থেকে সুন্দরতম পদ্মফুল হিসাবে প্রস্ফুটিত হতে লাগলো। 


জঙ্গলের নিয়ম অনুসারে প্রত্যেক প্রাণী যেমন খাদ্য সংগ্রহ এবং সংরক্ষণের প্রশ্নে নিজেদের মধ্যে গোষ্ঠীতে আবদ্ধ হয়ে সংগ্রাম করে  বেঁচে থাকে , সেখানে অনাহূতের মতো অন্য কোন গোষ্ঠীর পশুদের আগমনে তারা সেই পশুদের আক্রমণ করে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখে।  তাদের সেই ভাবনার  পশ্চাতে থাকে অন্তর্নির্মিত(inbuild) সীমিত চিন্তা  আর জমি হারানোর ভয় কাজ করে। 

দুর্যোধন এবং তার সাকরেদরা এই পশুচিত ভাবনা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারেনি। দুর্যোধন  কখন ভাবতে পারেনি এই বৃহৎ পৃথিবীতে পান্ডব আর কৌরবদের মেল বন্ধনে  ভরতবংশকে এক দৃষ্টান্তমূলক শক্তি রূপে ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে প্রতিষ্ঠিত করা  যেতে পারতো কিন্তু  তার পরিবর্তে হস্তিনাপুরের মাটিতে প্রোথিত হল বিষবৃক্ষের চারা।  ক্রমেই সেই  চারা মহাভারতের আঙিনায়  আগামী মহীরুহ হয়ে আত্মপ্রকাশ করলো । 


সাহিত্যে ধনাত্মক আর ঋণাত্মক ঘটনা সমান্তরাল ভাবে না বাড়লে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেনা, ঠিক তেমনি মহাভারতের কবি বেদের মূল ভাব পুরুষার্থের সাথে সাধারণ মানুষের পরিচয় সারা মহাভারত জুড়ে দৃষ্টান্ত  সহকারে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়েছেন  এবং তার পরিণতিকে শিল্পের পর্য্যায়ে নিয়ে গিয়ে তার ব্যাখ্যাও  করেছেন।  


ধুপ কাঠির সুরভী  যেমন তার গন্ধকে  লুকিয়ে রাখতে পারেনা, ঠিক তেমনি পৃথার বুদ্ধির দীপ্তি, ভীমের বাহুর শক্তিমত্তা, অর্জুনের তীরকে নিয়ে হেলাফেলায় প্রচ্ছন্ন লক্ষ্যভেদ করার  একাগ্রতা  আর তার সঙ্গে যুধিষ্ঠিরের ধর্মাচারীতা,  সূর্যের পূর্ণ কিরণের ন্যায় হস্তিনাপুরের আকাশে যখন  উদ্ভাসিত  হল তা কৌরবদের কাছে প্রশংসিত হবার পরিবর্তে আশঙ্কার মেঘরূপে প্রতীয়মান হল। কৌরবদের ঝুলি থেকে আস্তে আস্তে প্রকাশিত হোল তাদের  বর্ব্বরতার নগ্ন রূপ আর তার  বিচ্ছুরণ ঘটলো  বারানাবতের ঘটনায় । 


ক্রমশঃ 
ব্লগার - রবীন মজুমদার 
বিঃদ্রঃ ভালো লাগলে শেয়ার করুন আর খারাপ লাগলে মন্তব্য করুন ।।


মন্তব্যসমূহ

kumar roy বলেছেন…
সত্যিই কি সম্ভব ছিল ভরত বংশের একত্রে থাকা এবং কাজ করা । বোধহয় না , কারণ দুর্য্যোধনের মধ্যে বিষ বৃক্ষের বিজ তো রোপণ করেন ধৃতরাষ্ট্র ।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)