৪২৬ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -দশম পর্ব )

 ৪২৬ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -দশম  পর্ব ) 


( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে  উস্কে দেয় )    

গত সংখ্যায় যা আছে --

এবার আমরা  ইতিহাসের উপাদান সংগ্রহ করতে করতে  এখন পৌঁছে যাব আজ থেকে প্রায় ৩৫০০ হাজার বছর পূর্বে। সেই সব সাহিত্য সম্ভারের মধ্যে ঋগ্বেদকে সর্বাপেক্ষা প্রাচীন গ্রন্থ বলে ঐতিহাসিকরা মেনে নিয়েছে আর সেখান থেকে সংগ্রহ করব বৈদিক যুগের সাহিত্যের মধ্যে  থেকে ইতিহাসের নির্যাসকে।   

দশম  পর্ব

 সাহিত্য সমাজের দর্পন। সেই হিসাবে ঋগ্বেদ (Rigveda) সর্বপ্রাচীন এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত। মতভেদ থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ ইতিহাসবিদরা   এর রচনাকাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০–১২০০ অব্দের মধ্যে রচিত হয়েছে বলে মনে করেন।  এটি কেবল হিন্দুধর্মের প্রাচীনতম ধর্মগ্রন্থই নয়; বরং প্রাচীন ইন্দো-আর্য সমাজ, ধর্ম, অর্থনীতি, রাজনীতি, দর্শন এবং সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক উৎস।

সেই যুগের ঋষিরা স্তোত্রের মধ্যে অকৃপণভাবে ঢেলে সাজিয়েছেন সেই যুগের মানুষের জীবন চিন্তা ও বিশ্বাসকে। তাই ইতিহাসবিদ, নৃতত্ত্ববিদ, ভাষাবিজ্ঞানী এবং ধর্মতত্ত্ববিদদের কাছে ঋগ্বেদ এক অমূল্য দলিল।

মানব ইতিহাসে গোড়ার দিক থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ভক্তির উৎসের সন্ধানে যাত্রা করা যায়, তাহলে সেখানে শক্তির একটা বিশাল ভূমিকা আছে। ঋগ্বেদীয় ধর্মের ক্ষেত্রে তার কোন ব্যতিক্রম ঘটেনি। 
জ্ঞানের দরজা দিয়ে প্রকৃতির যে রহস্যঃ মানুষের কাছে উন্মোচিত হয় নি সেই সমস্ত "ডার্ক ম্যাটার"কে সে যুগের মানুষেরা দেব জ্ঞানে পূজা করতো। 
কাল্পনিক ক্যাবিনেটের ভাবনা তাদের  মনে উদয় হয়েছিল, সেখান থেকেই তারা আটজন দেবতাদের অভিষিক্ত করেছিল ভিন্ন ভিন্ন ডিপার্টমেন্টে। একটি জিনিস ভীষণ লক্ষণীয় এই আটজন দেবতাদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সর্বোচ্চ পদের ভাবনা ছিল কিন্তু পদটা সৃষ্টি করা হয় নি। কেননা সেদিন সেটা ছিল তাদের ধারণার বাইরে। আবার মানুষের দ্বারা যখন দেবতারা প্রয়োজন ভিত্তিক  নির্বাচিত হয়েছিল, আবার প্রয়োজন মিটেগেলে সেই পদটাই শূন্য হয়ে গেছে।  
যে সুরে প্রথম দিকে ঋগ্বেদ একই সাথে বহু দেবতাকে অর্ঘ্য নিবেদন করে একটা সর্বোচ্চ  স্থানে কাউকে অভিষেক করতে পারেন নি। কিন্তু ঋগ্বেদের শেষদিকের মণ্ডলগুলিতে ধর্মীয় চিন্তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। বহুদেবতার মধ্যেও এক পরম সত্যের ধারণা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অর্থাৎ সেই শূন্য পদের অধিকারী সম্পর্কে একটা আবছা ধারণার জন্ম হয়েছিল। 

এই ধারণাই পরবর্তীকালে উপনিষদীয় ব্রহ্মতত্ত্ব এবং অদ্বৈত দর্শনের ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

যে আচার আচরণ আজও পালিত হয়, সেই আচরণগুলির জন্মদাতার বিবরণ এই ঋগ্বেদ থেকেই সংগৃহিত হয়েছিল, তা আমাদের সন্দেহাতীত। সেদিনের ধর্ম শুধুমাত্র বিশ্বাসবোধের উপর নির্ভর করে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানে বিজ্ঞান ছিল অনুপস্থিত। তাই সে অন্ধ সংস্কারমুক্ত হতে পারেনি। 

 ঋগ্বেদীয় ধর্মের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল যজ্ঞ ও মন্ত্র । মূলত এগুলি ছিল একটা মাধ্যম যাকে অবলম্বন করে দেবতাদের সন্তুষ্ট করা হতো, বৃষ্টির প্রার্থনা করা, পশুধন বৃদ্ধি ,শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয় কামনা, দীর্ঘায়ু ও সমৃদ্ধি অর্জন করা ইত্যাদি। 

অগ্নিকে দেবতাদের দূত হিসেবে বিবেচনা করা হতো, কারণ অগ্নির মাধ্যমেই মানুষের নিবেদন দেবলোকে পৌঁছাতো , এটাই তাদের বিশ্বাস ছিল।

 ঋগ্বেদের অন্যতম মৌলিক দার্শনিক ধারণা হলো ঋত।  ঋত বলতে বোঝায়—একাধারে প্রকৃতির নিয়ম, নৈতিক সত্য,মহাজাগতিক শৃঙ্খলা ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ভারসাম্য। 

স্তব্ধ হল বাইরের গুঞ্জন, নেই কোন বারবার স্থান পরিবর্তনের ঝঞ্ঝাট, নেই সেখানে খাদ্যে সংগ্রহের চঞ্চলতা আর বাইরের শত্রুর আক্রমন ভীতি। তাই এবার মন চলে যায়  নিজ নিকেতনে। সেখানে গিয়ে দেখে আর বলে "আমি আছি , এই জগৎ আছে  আর আছে আরেকটি সত্ত্বা " আর এই সত্ত্বাই ভিন্ন ভিন্ন ভাবে পরিভাষিত হয়েছে। কেউবা ঈশ্বর, কেউবা আল্লা ,কেউবা আলমাইটি গড ইত্যাদি।  

"প্রশ্ন " শব্দটি এই পৃথিবীতে বহু না জানা ঘটনাকে সামনে যেমন নিয়ে এসেছে, তেমনি সক্রেটিস শহীদ হয়েছে  প্রশ্ন করার কারণে; আজও রাজপথে কতনা ছাত্র থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের বলি হয়েছে শুধু এই প্রশ্ন করার কারণে। গোপনীয়তা আছে বলেই তো অনুসন্ধান। এই গোপনীয়তার অর্থ না জানা। ঋগ্বেদের দশম মন্ডলের নাসাদীয় সূক্ত বিখ্যাত হয়েছে প্রাচীনতম দার্শনিক রচনা হিসাবে। কতনা প্রশ্নমালা অলঙ্কৃত করেছিল এই সুক্তকে। প্রশ্নের মধ্যে ছিল -সৃষ্টি রহস্যের সুচারু অনুসন্ধান - সৃষ্টি কিভাবে হলো ? কে সৃষ্টি করল? কে জানে এই রহস্যটি ? এই সংশয়বাদী দৃষ্টিভঙ্গি মানবচিন্তার ইতিহাসে এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত।

ঋগ্বেদ থেকে ইতিহাস ও সমাজ সম্পর্কে ধারণা।  তার প্রথম পর্য্যায়ে আসে ভৌগলিক বিবরণ। আজকের এই সিন্ধু ,সরস্বতী, শতদ্রু,  বিপাশা ,রাভি, অসিক্নী, ঝিলম নদীর সাথে পরিচিত হয়েছি ঋগ্বেদের মাধ্যমে। এসব তথ্য থেকে বোঝা যায় যে ঋগ্বেদীয় জনগোষ্ঠীর প্রধান আবাস ছিল সপ্তসিন্ধু অঞ্চলে। 

বিচিত্র এই মানব সংসার। এ যেন আরেক বৈচিত্রের মেলবন্ধনের জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত, যাকে আমরা সমাজ বলে জেনে থাকি। সমাজ নামক সৌধটি রচনা করার জন্য যাদের অবদান স্বীকৃত, তারা কেউ সম-পারদর্শিতায়  বেড়ে ওঠেনি অথচ সবার ঠাঁই কিন্তু সেই এক তরীতে। তাই সেখানে এক অদ্ভুত ভার সংকুলান মঞ্চ গঠিত হয়েছে। সেখানে আছে শারীরিক পরিশ্রমী মানুষ, কেউবা মেধা সম্পন্ন আবার কেউবা দক্ষ মানব সম্পদ।  সমাজের চাহিদা মেটানোর জন্য কেউ বা উৎপাদনের সাথে যুক্ত, কেউবা  বন্টনের কাজে যুক্ত আরেকদল  বিনিময় ব্যাবস্থার সাথে যুক্ত আবার কেউ জ্ঞান চর্চ্চা করে। 

যেখানে সবার লক্ষ্য সমান, সেখানেই পারস্পরিক সহযোগিতা ও নির্ভরতার ভিত্তিতে যে আত্মিক বন্ধন গড়ে ওঠে সেটাই ছিল সে যুগের সমাজ। সেই সমাজে বহু ছোট ছোট বিভাগ আছে, তার মধ্যে শক্তিশালী বিভাগটা হলো পরিবার। 

এই পরিবারের কেন্দ্রে ছিলেন পিতা। তাই তাকে পিতৃতান্ত্রিক পরিবার বলা হতো, যা এখনোও বিদ্যমান। এই পরিবারগুলি ছিল মূলত গোত্রকেন্দ্রিক। সামাজিক বেশ কিছু সংগঠন ছিল, যেমন, কুল,গ্রাম, বিষ ও জন। নারীরা শিক্ষালাভ, যজ্ঞে অংশগ্রহণ এবং স্তোত্র রচনার সুযোগ পেতেন। লোপামুদ্রা, ঘোষা ও আপালার মতো নারী ঋষির উল্লেখ ঋগ্বেদে পাওয়া যায়।

দশম মণ্ডলের পুরুষসূক্তে প্রথমবার চার বর্ণের উল্লেখ পাওয়া যায়—ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র। 

তবে বহু গবেষকের মতে, পুরুষসূক্ত সম্ভবত ঋগ্বেদের অপেক্ষাকৃত পরবর্তী সংযোজন। সাহিত্যের অঙ্গনে প্রবেশ করে  ব্রাহ্মণ্যবাদের ধ্বজাধারীরা ইতিহাসকে বিকৃতি করার অপচেষ্টা করে।  তাই তখনই পূর্ণাঙ্গ জন্মভিত্তিক বর্ণব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ছিল—এমন সিদ্ধান্ত সতর্কতার সঙ্গে গ্রহণ করা উচিত।

ঋগ্বেদীয় অর্থনীতি প্রধানত পশুপালননির্ভর ছিল। সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ ছিল— গরু, ঘোড়া , ভেড়া ও ছাগল। 'গো' শব্দের বহুল ব্যবহার থেকে গবাদিপশুর গুরুত্ব স্পষ্ট হয়। কৃষিকাজেরও প্রচলন ছিল। যব (বার্লি) চাষের উল্লেখ পাওয়া যায়। পাশাপাশি ধাতুশিল্প, বয়ন, রথ নির্মাণ ও কুমোরশিল্পের অস্তিত্বও দেখা যায়।

সেদিনের রাজনৈতিক ক্ষমতা কারোর একক ছিলনা, তার পরিবর্তে প্রতিটি জন বা গোত্রের প্রধানকে ক্ষমতা প্রদান করে সমিতিকে পরামর্শদাতা হিসাবে মনোনীত করা হয়েছিল। 

যেখানে সম্পত্তির সম বন্টনব্যবস্থা নেই , বহুধা বিভক্ত জনজাতি ও উপজাতিরা আছে  সেখানে  যুদ্ধ তো অনিবার্য। ঋগ্বেদে বহু যুদ্ধের উল্লেখ রয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো দশরাজ্ঞ যুদ্ধ, যেখানে বিভিন্ন উপজাতির মধ্যে সংঘর্ষের বিবরণ পাওয়া যায়।

 সেদিনের মানুষ   গৃহ নির্মাণ করত,  রথ ছিল প্রধান যানবাহন , সঙ্গীত ও কবিতার চর্চা উন্নত ছিল , নৃত্য ও উৎসব প্রচলিত ছিল, অতিথিকে অত্যন্ত সম্মান করা হতো,  গবাদিপশু সামাজিক মর্যাদার গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড ছিল। 

ঋগ্বেদ কেবল একটি ধর্মগ্রন্থ নয়; এটি প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার মানসিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক অনন্য দলিল। এর মাধ্যমে আমরা প্রাচীন মানুষের ধর্মবিশ্বাস, প্রকৃতিচেতনা, রাজনৈতিক সংগঠন, অর্থনৈতিক জীবন, সামাজিক কাঠামো এবং দার্শনিক অনুসন্ধানের একটি জীবন্ত চিত্র পাই। একই সঙ্গে ঋগ্বেদ দেখায় কীভাবে বহুদেবতাবাদ থেকে এক পরম সত্যের ধারণা, যজ্ঞকেন্দ্রিক ধর্ম থেকে দার্শনিক অনুসন্ধান এবং উপজাতীয় সমাজ থেকে সংগঠিত সামাজিক কাঠামোর দিকে ভারতীয় সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল।

  

ক্রমশঃ 

কলমে - রবীন মজুমদার 
০৬/০৮/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 

মন্তব্যসমূহ

নামহীন বলেছেন…
ঋকবেদের চমৎকার বিশ্লেষণ। বেদ আমার খুব প্ৰিয় বই। আপনি পাঠাতে থাকুন।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)