৪২৭ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -একাদশ পর্ব )
৪২৭ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -একাদশ পর্ব )
( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে উস্কে দেয় )
গত সংখ্যায় যা আছে --
ঋগ্বেদ কেবল একটি ধর্মগ্রন্থ নয়; এটি প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার মানসিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক অনন্য দলিল। এর মাধ্যমে আমরা প্রাচীন মানুষের ধর্মবিশ্বাস, প্রকৃতিচেতনা, রাজনৈতিক সংগঠন, অর্থনৈতিক জীবন, সামাজিক কাঠামো এবং দার্শনিক অনুসন্ধানের একটি জীবন্ত চিত্র পাই। একই সঙ্গে ঋগ্বেদ দেখায় কীভাবে বহুদেবতাবাদ থেকে এক পরম সত্যের ধারণা, যজ্ঞকেন্দ্রিক ধর্ম থেকে দার্শনিক অনুসন্ধান এবং উপজাতীয় সমাজ থেকে সংগঠিত সামাজিক কাঠামোর দিকে ভারতীয় সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল।
একাদশ পর্ব
এই পৃথিবীর বুকের উপর দিয়ে ঝড় বয়ে যায়, বন্যা হয় , ভূকম্পন হয় তারপর তার রেশ বেশ কিছু দিন ধরে মানুষের স্মৃতিতে রয়ে যায়। যদি তার কোন প্রভাবকে স্মরণীয় করে রাখতে হয়, সেখানে মানুষ আশ্রয় নেয় ঘটনাবলীকে আগামীর জন্য রেখে লিখে রাখার উদ্দেশ্য তৎকালীন উপস্থিত মাধ্যমের সাহায্যে নেয় , সেই-ই কালে কালে একদিন ইতিহাসের মর্যাদা পেয়ে থাকে। আর ভারতীয় সভ্যতার বিকাশে আর্য্য সংস্কৃতির প্রভাবের বর্ণনা থাকবেনা, এতো হতে পারেনা। এর মধ্যে দিয়ে আজকে ভারতীয়দের আচার-সংস্কৃতি ও ধর্মচর্চার পদধ্বনি শুনতে পাব। যেটাই আমাদের আলোচনার উপজীব্য বিষয়।
ইতিহাসের সত্যতা যাচাই করা ঐতিহাসিকদের প্রাথমিক কর্তব্য। এই পারফেকশনের জন্য আজও অনুসন্ধান অব্যাহত আছে এবং আগামীতে থাকবে বলে আমাদের ধারণা।
আজকের আলোচনার সূত্রটা কিন্তু সেই অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষে ও ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ঐতিহাসিক উপাদানের এক নতুন দ্বার উন্মোচিত হল এবং যার সাথে প্রাচীন উপাদানের সাথে বিস্তর ফারাক। ভাষাবিজ্ঞান এক অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক উপাদান যা নতুন করে সাক্ষ্য প্রমাণকে আমাদের সামনে নিয়ে এলো। ইউরোপ থেকে শুরু করে বেশ কিছু স্থানে ভাষা বিজ্ঞানের প্রসার লাভ করে। সে এক অসাধারন অভিজ্ঞতা, ইউরোপীয় পন্ডিতরা সংস্কৃত ভাষার গঠন ও ধরণের সাথে গ্রীক ও ল্যাটিন ভাষার অনবদ্য মিল খুঁজে পেলেন। অতীতের সব ধারণার অবসানে উন্মুক্ত হলো সেই তত্ত্ব, যার মাধ্যমে জানা গেল আর্যভাষা ব্যবহারকারীদের পূর্বসূরিরা যে ভাষা ব্যবহার করতো সেই ভাষা ছিল ইন্দো-ইউরোপীয় জাতির মূল ভাষা।
জীবন ধারণের টানে পিছনে ফেলে এলো ক্যাস্পিয়ান সাগর ও দক্ষিণ রাশিয়ার স্তেপ অঞ্চল, শুধু একটু পশু চারণ ভূমির সন্ধানে, কেননা সেটাই ছিল তাদের অস্তিত্ব রক্ষার শেষ পুঁজি। সারা বিশ্ব ক্রমেই জানলো, সে এক ভারতবর্ষ বলে এইটা দেশ আছে যে তাদের জীবনকে ফুলে-ফলে ভরিয়ে দিতে পারে। পরখ করতে গিয়ে তারা চলতি পথের বাধা-বিঘ্নকে অবলীলায় উড়িয়ে দিয়ে কেউবা গ্রীসদেশ থেকে , কেউবা এশিয়া মাইনর থেকে আবার কিছু মানুষ সুদূর ইরান থেকে এসে উপস্থিত হলো এই সুজলাং সুফলাং এই ভারতভূমিতে।
মানুষ্য সৃষ্ট একের সাথে আরেককে আলাদা করে চিহ্নিত করার একমাত্র ভূষণ হলো নাম আর রূপ। তারা হলো আর্য্য নামের অধিকারী আর এই বৈদিক সাহিত্য তাদেরই সৃষ্টি।
প্রশান্ত আবার বলল - আমি পূর্বেও বলেছি, আবার বলছি বাহ্যিক জগতের চঞ্চলতা থেকে মন যখন মুক্ত হয়, তখনি মানুষ মনের গভীর অন্দরে প্রবেশ করার চাবিকাঠিটি খুঁজে পায়। যুগে যুগে অমানবিক শাসকরা ইচ্ছা করে একটা কৃত্তিম পরিবেশ সৃষ্টি করে, যেখানে মনের অন্দরে প্রবেশের দ্বারে দাঁড়িয়ে থাকে অভাব, মানুষের মানুষে বিভেদ, অস্থির অর্থনৈতিক , রাজনৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের দানবরূপী এক বিশাল পাহারাদার। তাদের অতিক্রম করে মনের গভীরে আর প্রবেশ করা হয়ে ওঠে না। তাই আজ সৃষ্টিধর্মী কাজের বড়োই অভাব, যার জন্ম মনের অন্দরমহলে।
যাদের হাত শক্ত করে ধরে আমরা অতীতের গহ্বরে প্রবেশ করি, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো প্রত্নতাত্তিক উপাদান, ঐতিহাসিক সূত্র এবং বৈদিক সাহিত্য। যদিও বৈদিক সাহিত্যের বেশ পরে পুরাণের সৃষ্টি, বহু ঐতিহাসিক অসঙ্গতি থাকা সত্বেও, তার মধ্যে এক ধারাবাহিকতা আছে , যা আমাদের দিনপঞ্জি অনুযায়ী রাজ-রাজাদের কাহিনী সম্পর্কে অবগত হই।
খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ শতাব্দীর আশেপাশে পুরাণের কাহিনীগুলি সংগৃহিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এই পুরাণকে বেশ কিছু অংশে সংশোধন করে সম্পাদনা করা হয়ে ছিল। কারণ হিসাবে বলা যায়, ভারতীয়দের ধর্ম বিশ্বাস প্রায় অন্ধত্বের পর্য্যায়ে, সেক্ষেত্রে পুরাণের কাহিনীগুলির ভূমিকা একটা বড় স্থান অধিকার করে বসে আছে।
১০২৮টি শ্লোক বিশিষ্ট ঋগ্বেদ রচিত হয়েছিল আর্য্য দেবতাদের বন্দনা করার উদ্দেশে। এর পাশাপাশি আর্যদের জীবন ধারার পরিচয়ও পেয়ে থাকি। মজার ব্যাপার হলো ঐতিহাসিকভাবে ঋগ্বেদের সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায় কিন্তু পুরাণ এবং রামায়ন ও মহাভারতের ক্ষেত্রে এখনো নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সাক্ষ্যপ্রমানের অভাব রয়ে গেছে।
দর্শনের অধ্যাপক বিভাস এতক্ষন চুপচাপ ছিল। হঠাৎ সে বলল, ভারতবর্ষকে চেনার মাপকাঠি শুধু ইতিহাস দিয়ে হবে না, তার পিছনে এক গভীর দর্শন আছে। সেই দর্শনটাকে আমাদের জানতে হবে। বেদ কিন্তু সেই দর্শনের কথাই বলে। এই বলে সে বলতে শুরু করলো -
"আজি কোন সুরে বাঁধিব" -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই পরমপিতাকে কোন সুরের দ্বারা বাঁধবেন, তাকেই খুঁজে বেড়াচ্ছেন, সেখানে স্বামীজীও খুঁজে বেড়াচ্ছেন ভারতের জাতীয় সুরকে, অবশেষে তিনি বলেছেন নিবেদিতাকে, সে আর কেউ নয়, সে হচ্ছে 'বেদ' যাকে প্রথমে শঙ্করাচার্য খুঁজে পেয়েছিলেন।
প্রত্যেকটি কর্মের পশ্চাতে একটা মূল সুরের অন্বেষণ চলে, আর যেই না মানুষ তাকে উদ্ধার করে, তখন বাকি গুলি সহজ হয়ে উঠে।
জাতীয় সুরের দেখা , সেই মহামানবরাই পেয়ে থাকে যারা সর্বস্তরের সুরগুলিকে একই সুতোয় বেঁধে ফেলতে পারেন। সেগুলি অবশ্যিই যাঁরা একটা দেশকে অধ্যাত্বিকতা , নৈতিকতা, ধার্মিকতা, সামাজিকতা, রাজনীতিকতাকে সার্বিকভাবে এক সূত্রে বেঁধে ফেলতে পারেন, তারই সেই পর্য্যায়ে যাবার অধীকারী হন।
কোরান কিংবা বাইবেলের সাথে বেদের ব্যবধান হচ্ছে তাদের যেমন দ্রষ্টা এক কিন্তু বেদের দ্রষ্টা অনেকে। মনকে অতিক্রম করে যে গহীন প্রদেশে উপস্থিত হয়ে যা প্রত্যক্ষ করেছেন, তার বাইরে আর কিছুই বেদে নেই।
জ্ঞানেরই সাবেকি নাম 'বেদ', প্রাচীন হিন্দু ধর্মের একটি প্রামাণ্য ধর্মীয় গ্রন্থমালা। হিন্দুরা বিশ্বাস করেন, যেহেতু প্রাচীন ঋষিরা ধ্যানের গভীরে অর্থাৎ অবচেতন স্তরে পৌঁছে যেখানে ইন্দ্রিয়ের আনাগোনার বাইরে তাই সেটি অপৌরুষেয়, যার অর্থ মানুষের দ্বারা নয়। এক একটি শব্দকে নিয়ে ঋষিরা মনের গভীরে প্রবেশ করেন। শব্দের প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করে তপস্যা ভঙ্গ করে বেরিয়ে আসেন এবং তাকে শিষ্যদের মাঝে শোনানো হয় আর এই শ্রুতির পরম্পরা আছে। বৈদিক সাহিত্যের বিশালতা অন্যান্য গ্রন্থ থেকে অনেক বেশি।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মৌখিকভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে পরম সত্যকে জানা, যাঁকে নামরূপে ভূষিত করেছে 'ব্রহ্ম' নামে। অন্তর্নিহিত সত্তাকে বলা হচ্ছে আত্মা নামে। জ্ঞান ছাড়া সেই চরম সত্যের মুখোমুখি হবার কোন রাস্তা নেই, যা কর্ম ছাড়া কিছুতেই পূর্ণ হবার নয়। এই মৌলিক ধারণার কথা বেদ বলে থাকে।
একটা বড় বটবৃক্ষের মতো ডালপালা বিস্তার করে আছে যার প্রভাবে প্রভাবিত উপনিষদের দর্শন, বেদান্ত, যোগ, মীমাংসা দর্শন, ন্যায় দর্শন, সুপ্রাচীন সাংখ্য দর্শন,ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত , সংস্কৃত সাহিত্য, ধর্মীয় আচার ,দর্শন ও আধ্যাত্মিক চিন্তা। কখন প্রত্যক্ষ আবার কখন পরোক্ষ ভাবে কাজ করে আসছে।
আধুনিক গবেষণায় বেদকে শুধুমাত্র ধর্মীয় সাহিত্যের আবরণে বেঁধে রাখেনি বরং তাকে এক ঐতিহাসিক দলিল বলে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
ক্রমশঃ
কলমে - রবীন মজুমদার
০৭/০৮/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।
মন্তব্যসমূহ