৪২৯ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -ত্রয়োদশ পর্ব )
৪২৯ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -ত্রয়োদশ পর্ব )
( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে উস্কে দেয় )
গত সংখ্যায় যা আছে --
মহাভারত খুব দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেছে কর্মফল ও নিয়তির উপস্থিতিকে। প্রতিটি কাজেরই একটি অনিবার্য পরিণতি আছে। কোন চরিত্রকে মহাভারত এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে দেয়নি। একদিকে যেমন, কৌরবরা তাদের লোভ, অহংকার ও হিংসা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি, অন্যদিকে পাণ্ডবরাও এই যুদ্ধের ধ্বংসলীলা ও ভুল ভ্রান্তির যোগ্য শাস্তি পেয়েছে। নিয়তির এই বিধান থেকে এমনকি শ্রীকৃষ্ণও রেহাই পান নি, গান্ধারীর অভিশাপ সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে।
ত্রয়োদশ পর্ব
আমরা আজ মূলত খুঁজতে এসেছি মহাভারতের পিছনের দর্শনটা কি ছিল ? তার সাথে এটাও আমাদের প্রশ্ন কেন মহাভারত বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে সময়কে অতিক্রম করে প্রাসঙ্গিক ? যতক্ষন আমাদের জানার সন্তুষ্টির ভান্ডার পূর্ণ হবেনা, ততক্ষণ আমাদের অনুসন্ধান এখানে ওখানে চলতেই থাকবে।
বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু গ্রন্থ আমাদের ভাবনা চিন্তা করতে শিখায়, যেগুলি সাহিত্যের দেহকে অতিক্রম করে বহুমুখী মনন দিয়ে উদ্ভাসিত করেছে মানবসভ্যতার বৌদ্ধিক, নৈতিক ও দার্শনিক বিকাশের ভিত্তিস্তম্ভকে তাই সে আজও সমাদৃত।
হোমারের ইলিয়াড ও ওডিসি বা বাইবেল—এসব গ্রন্থ মানবসমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু ভারতীয় সভ্যতার পরিপ্রেক্ষিতে এমন একটি গ্রন্থ আছে, যা একই সঙ্গে ইতিহাস, পুরাণ, নীতিশাস্ত্র, দর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব এবং আধ্যাত্মিকতার এক বিশাল ভাণ্ডার। সেই গ্রন্থটি হলো মহাভারত।
প্রচলিত ধারণায় মহাভারতকে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ইতিহাস বলা হয়। কিন্তু এই ব্যাখ্যা মহাভারতের প্রকৃত বিস্তৃতি ও গভীরতার তুলনায় অত্যন্ত সীমিত। যুদ্ধ এখানে একটি উপলক্ষ মাত্র; প্রকৃত বিষয় হলো মানুষ—তার আকাঙ্ক্ষা, দ্বন্দ্ব, দুর্বলতা, কর্তব্য, নৈতিকতা এবং আত্ম-অনুসন্ধান।
মহর্ষি ব্যাসদেব এই গ্রন্থকে এমনভাবে নির্মাণ করেছেন, যাতে মানুষের জীবনের প্রায় প্রতিটি প্রশ্নের প্রতিফলন দেখা যায়। পরিবার, রাষ্ট্র, ক্ষমতা, প্রেম, বন্ধুত্ব, প্রতিশোধ, ক্ষমা, ন্যায়, অন্যায়, মৃত্যু, মুক্তি—কোনো বিষয়ই এর বাইরে নয়। তাই ভারতীয় ঐতিহ্যে একটি সুপরিচিত উক্তি প্রচলিত—
আসলে মহাভারতে আছে, তা পৃথিবীর অন্যত্রও থাকতে পারে; কিন্তু যা মহাভারতে নেই, তা কোথাও নেই।
এটি কোনো অতিরঞ্জিত প্রশংসা নয়; বরং মহাভারতের বিষয়বস্তুর ব্যাপকতার এক প্রতীকী স্বীকৃতি। মানুষের মহাকাব্য যুদ্ধের আবরনে মোরা আর সেখানে আসল যুদ্ধ ছিল এক অন্তর্জগতের গভীর একটা দ্বান্দ্বিক ক্যানভাস।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষ হতে মাত্র আঠারো দিন লেগেছিল। কিন্তু সেই যুদ্ধের পেছনে ছিল বহু প্রজন্মের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, পারিবারিক জটিলতা, অহংকার, প্রতিজ্ঞা, অভিমান, অন্যায়, নৈতিক ব্যর্থতা এবং ভাগ্যের জটিল বুনন।
যদি যুদ্ধই মহাভারতের মূল বিষয় হতো, তাহলে গ্রন্থটির অধিকাংশ অংশ যুদ্ধবর্ণনায় পূর্ণ থাকত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, মহাভারতের বিপুল অংশ জুড়ে রয়েছে—নৈতিকপ্রশ্ন, রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি, রাজধর্ম, আপৎকালীন ধর্ম , মোক্ষধর্ম, জীবনের অর্থ, জ্ঞান ও আত্মার প্রকৃতি, সমাজব্যবস্থা, শিক্ষার উদ্দেশ্য, নারী ও পুরুষের সম্পর্ক, ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব।
এখানে যুদ্ধক্ষেত্র হচ্ছে যেন একটা আধুনিক পরীক্ষাগার যেখানে একে একে মানবচরিত্রগুলি প্রবেশ করছে, যুদ্ধান্তে তাদের শংসা পত্র আপামর জনসাধারণের সম্মুখে উন্মুক্ত হচ্ছে।
প্রশ্ন উঠতেই পারে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগের একটি গ্রন্থ আজকের প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে কেন মহাভারত আজও প্রাসঙ্গিক? বাইরের পরিবর্তনটা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য কিন্তু যাকে দেখা যায় না সেই মানুষের অন্তর্জগতের সত্যিই বিশেষ কিছু পরিবর্তন সাধিত হয়েছে ? উত্তর হবে- তেমনটি হয়নি।
বরং উদাহরণ সহকারে বলা যায়, সেই ট্রেডিশন সমানে চলেছে। আজও মানুষ—ক্ষমতার জন্য লড়াই করে , সম্পদের জন্য আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট করে, নৈতিক সংকটে পড়ে , সত্য ও সুবিধার মধ্যে দোলাচলে থাকে, কর্তব্য ও ব্যক্তিগত স্বার্থের সংঘাতে সিদ্ধান্তহীন হয়ে পড়ে, ভালোবাসা, ঈর্ষা, অহংকার, ভয় এবং লোভের দ্বারা পরিচালিত হয়।
এই প্রতিটি অভিজ্ঞতার প্রতিফলন মহাভারতে রয়েছে। অর্থাৎ মহাভারত অতীতের নয়; সে যে মানুষের চিরকালীন। যতদিন মানুষ থাকবে, ততদিন মহাভারতও প্রাসঙ্গিক থাকবে।
মহাভারতের দর্শনের মৌলিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে যদি আলোচনা করতে হয় , তাহলে বলতে হয় তার অনন্য দার্শনিক উদারতা। এখানে কোনো প্রশ্ন নিষিদ্ধ নয়। বরং প্রতিটি সত্য প্রশ্নের মধ্য দিয়েই সেটি উদ্ভাসিত হয়েছে।
এই প্রশ্নমুখরতা ভারতীয় দার্শনিক ঐতিহ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
মন্তব্যসমূহ