৪৩০ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -১৪তম পর্ব )
৪৩০ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -১৪তম পর্ব )
( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে উস্কে দেয় )
গত সংখ্যায় যা আছে --
এই প্রশ্নমুখরতা ভারতীয় দার্শনিক ঐতিহ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
১৪তম পর্বের শুরু -
চারিদিক শুধুই অন্ধকার। হঠাৎ দূরে কোথাও বাতির ক্ষীণ একটু ছটা দেখা যায়। মুহূর্তেই মনোযোগের সমস্ত আকর্ষণ যেন তাকে ঘিরে আবর্তিত হতে থাকে। অন্ধকারের মধ্যে আলো যত ক্ষীণই হোক, তার অস্তিত্বই তখন আশার একমাত্র চিহ্ন। অন্ধকার থেকে উত্তরণের পথ একমাত্র আলোই দেখাতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতির এই ঘনঘটা যেন অন্ধকারেরই অন্য নাম। আলো সেখানে সুদূরপরাহত। দীর্ঘ দিনের পর দিন দিগন্তে দিনমণি তার আলো ছড়িয়ে পৃথিবীকে আলোকিত করে, তারপর সন্ধ্যার কাছে নিজেকে সঁপে দিয়ে ঘরে ফিরে যায়। আবার আসে রাত, আবার তার বুক চিরে ভোরের জন্ম হয়। দিন-রাতের এই চক্র বিশ্বপ্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু এই দৃশ্যমান দিন-রাত্রির আড়ালেও জীবনের আর-একটি সূক্ষ্ম আলো-অন্ধকারের খেলা চলতে থাকে—যাকে চোখে দেখা যায় না, অথচ অন্তর দিয়ে অনুভব করা যায়।
অন্ধকার আছে বলেই তো আলোর সন্ধান। প্রশ্ন আছে বলেই উত্তরের প্রয়োজন। সংশয় আছে বলেই সত্যের অনুসন্ধান। আর সেই অনুসন্ধানের পথেই যুগে যুগে আলোকবর্তিকা হাতে একদল দিশারী দাঁড়িয়ে থেকেছেন। তাঁদের কেউ দার্শনিক, কেউ ঋষি, কেউ কবি, কেউ বিপ্লবী, কেউ বা নিঃশব্দে মানুষের বিবেককে জাগিয়ে যাওয়া এক অজ্ঞাত পথিক।
সেই পথ একরৈখিক নয়। তার রং বহু, তার অভিজ্ঞতা বহুমাত্রিক। কোথাও সেখানে ইতিহাসের ধুলো, কোথাও পুরাণের প্রতীক, কোথাও দর্শনের প্রশ্ন, কোথাও মানুষের রক্ত-মাংসের জীবন। সেই পথে চলতে গেলে চড়াইয়ের নুড়ি কুড়িয়ে নিতে হয়। একটি নুড়ি হাতে নিয়েই যদি মনে হয় পথের সমস্ত সত্য পাওয়া হয়ে গেছে, তবে অনুসন্ধান অসম্পূর্ণই থেকে যায়। ঝুড়ি পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কুড়িয়ে যেতে হয়—একটির পর একটি অভিজ্ঞতা, একটি প্রশ্নের পর আর-একটি প্রশ্ন, একটি সত্যের পর আরও গভীরতর সত্যের সন্ধান। তবেই হয়তো পূর্ণতার কাছাকাছি পৌঁছনো যায়।
মানুষের মনের কালো রঙের আধিপত্যের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আলোর সুলুকসন্ধান। কারণ অন্ধকারকে অনুভব না করলে আলোর প্রয়োজনীয়তা বোঝা যায় না। দৃশ্যমানকে অবলম্বন করেই অদৃশ্যের সন্ধানে মানুষের যাত্রা। সৃষ্টির আদিম মুহূর্ত থেকে এই যাত্রা শুরু হয়েছিল; আজও তার সমাপ্তি হয়নি।
মানুষ বাইরে যতটা পৃথিবীকে জয় করেছে, নিজের ভিতরের অন্ধকারকে ততটা জয় করতে পারেনি। বরং সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব আরও জটিল হয়েছে। ক্ষমতা বেড়েছে, জ্ঞান বেড়েছে, প্রযুক্তি বেড়েছে; কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে অহংকার, লোভ, ঈর্ষা, ভয় এবং নিজের কাছে নিজের পরাজয়ের সম্ভাবনাও।
ক্ষমতার অলিন্দে বসে থাকা একদল রাজপুরুষের দিকে তাকালেই সেই সত্যটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আপাতদৃষ্টিতে তাঁরা পার্থিব ক্ষমতার অনন্য অধিকারী। তাঁদের হাতে রাজদণ্ড, তাঁদের চারপাশে অনুগত সভাসদ, তাঁদের কথাতেই নির্ধারিত হয় মানুষের ভাগ্য। অথচ সেই ক্ষমতার আবরণ সরিয়ে ভিতরের মানুষটির দিকে তাকালে দেখা যায় অন্য এক ছবি—দুঃসহ যন্ত্রণায় কাতর এক হৃদয়।
ভালো-মন্দের পার্থক্য বোঝার মতো জ্ঞান তাঁদের আছে, ন্যায়-অন্যায়ের সীমারেখা চিনে নেওয়ার মতো বুদ্ধিও আছে। কিন্তু জ্ঞান থাকা আর সেই জ্ঞানকে জীবনে প্রয়োগ করতে পারা—এই দুইয়ের মধ্যে যে বিপুল ব্যবধান, সেখানেই তাঁদের ট্র্যাজেডি।
ইন্দ্রিয়ের আকাঙ্ক্ষা, ক্ষমতার মোহ, অহংকারের আবরণ এবং স্বার্থের অদৃশ্য শিকল তাঁদের মনের বাইরে বেরিয়ে আসতে দেয় না। তাঁরা জানেন, তবু করেন না। তাঁরা বোঝেন, তবু স্বীকার করেন না। তাঁরা বলতে চান, কিন্তু বলতে পারেন না। আর সেই না-বলা কথাগুলোই ধীরে ধীরে মনের ভিতরে জমতে থাকে।
একটি কথার উপর আর-একটি কথা, একটি অভিমানকে ঢেকে আর-একটি অভিমান, একটি অপূর্ণতার পাশে আর-একটি অপূর্ণতা—এইভাবে মনের ভিতরে তৈরি হয় কথার পাহাড়। সেই পাহাড়ের ভিতরে চাপা পড়ে যায় বিবেকের কণ্ঠস্বর।
যেমন কোনো নগরে দীর্ঘদিন কর্পোরেশনের ময়লা পরিষ্কারের গাড়ি না এলে রাস্তার পাশে আবর্জনা জমে ওঠে, বাতাস ভারী হয়ে ওঠে দুর্গন্ধে, তেমনি মানুষের মন থেকেও যদি দীর্ঘদিন অনুচ্চারিত বেদনা, অপরাধবোধ, ঈর্ষা, হিংসা ও অহংকারের আবর্জনা সরানো না হয়, তবে একসময় সেই মনই দুর্গন্ধময় হয়ে ওঠে।
হস্তিনাপুরের রাজপুরুষদের অন্তরে ঠিক সেই দুর্গন্ধ জমে উঠেছিল।
কোথাও না-পাওয়ার বেদনা, কোথাও না-বলতে পারার বেদনা; কোথাও হিংসার চাপা গর্জন, কোথাও অহংকারের গুমরে গুমরে কান্না। কোথাও ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা, কোথাও স্বীকৃতি পাওয়ার ক্ষুধা, কোথাও নিজের অক্ষমতাকে ঢেকে রাখার মরিয়া চেষ্টা। বাইরে রাজপ্রাসাদ যতই জাঁকজমকপূর্ণ হোক, ভিতরে ভিতরে তাদের মন যেন অন্ধকারের এক বিশাল কুঠুরি।
আর সেই অন্ধকারেই জন্ম নেয় মহাভারতের প্রকৃত সংকট।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ আসলে শুধু দুই পক্ষের সৈন্যসমাবেশের সংঘর্ষ নয়; তার অনেক আগে থেকেই যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল মানুষের অন্তরে। বাইরে অস্ত্র উঠেছিল পরে, ভিতরে অস্ত্র উঠে গিয়েছিল অনেক আগেই। কুরুক্ষেত্র তাই একটি যুদ্ধক্ষেত্র যেমন, তেমনি মানুষের মনোজগতেরও এক প্রতীকী ভূখণ্ড।
এই কারণেই মহাভারত আজও আমাদের কাছে প্রাসঙ্গিক।
কারণ হস্তিনাপুর কেবল অতীতের কোনো রাজ্য নয়। তার অন্ধকার আজও মানুষের মধ্যে আছে, ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে আছে, রাজনীতির অলিন্দে আছে, পরিবারে আছে, সমাজে আছে—এমনকি আমাদের নিজেদের মনেও আছে।
প্রশ্ন একটাই—সেই অন্ধকারের মধ্যে আলো কোথায়?
সম্ভবত আলো বাইরে কোথাও পড়ে নেই। তাকে খুঁজে নিতে হয় নিজের ভিতরেই। আর সেই অনুসন্ধানই মানুষের চিরন্তন যাত্রা—দৃশ্যমান থেকে অদৃশ্যের দিকে, অন্ধকার থেকে আলোর দিকে, অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানের দিকে, এবং শেষ পর্যন্ত নিজের ভিতরের মানুষটির কাছে ফিরে আসার দিকে।
মন্তব্যসমূহ