৪৪১ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -২০ তম পর্ব )
( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে উস্কে দেয় )
গত সংখ্যায় যা আছে --
“তাই মহাভারত শেষ পর্যন্ত হস্তিনাপুরের ইতিহাস নয়। এটি মানুষের নিজের ভিতরের হস্তিনাপুর।“আর সেই কারণেই তার প্রবেশদ্বার সবার জন্য উন্মুক্ত, কিন্তু বেরোনোর পথটি কেউ খুঁজে পায় না।”
২০ তম পর্বের শুরু -
কালকে যে পথের সূচনা হয়েছিল বলেই বহু সময়কে অতিক্রম করে আজ সে হস্তিনাপুরে এসে মিশেছে। সব পথেরই সূচনা আছে যখন, তখন মনে হতে পারে তার লক্ষ্য বস্তুও স্থির করা আছে। কিন্তু বাস্তবে কেউই সেই ধরাবাঁধা পথে হাঁটেনা। অনুসন্ধিৎসা যদি থাকে তবে একবার সময়ের দড়ি ধরে নিচ থেকে উপরে ওঠো আবার তাকে ফিরে দেখতে গেলে সেই দড়ি ধরে নিচে নামো।
অনেক না-বলা কথা বাকি রয়ে গেল, তাই ফিরতে হবে সেই বৈদিক যুগে। সেখানে সাহিত্যের সাথে ইতিহাস মিলে মিশে ঘর করছে। যদি ইতিহাস খুঁজতে যাই, তবে সযত্নে সাহিত্য থেকে ইতিহাসকে আলগা করে নিতে হবে আর সাহিত্যকে তো সবার বোঝা কাঁধে নিয়ে বেড়ানোর অভ্যাস আছে।
বর্ষণ সিক্ত ভোররাতে, যখন আকাশে বিদ্যুতের ঘনঘটা, পুকুরে ব্যাঙের একনাগাড়ে ডাক, চারপাশে দুর্ভেদ্য অরণ্য, সেখান থেকে মাঝে মাঝে হিংস্র পশুর গর্জন, ইতস্ততঃ সাপ ও বিছার ভ্রমণ, এমন এক পরিবেশে বৈদিক যুগের ঋষি একান্তে বেদমন্ত্র পাঠ করে যাচ্ছেন।
এতসব বিরূপতাকে নিয়ে সেদিনের মানুষ কার কাছে প্রতিকারের জন্য যাবে। তাই নিজেদের সেই ব্যথা, প্রকৃতির বিস্ময়, আর বিপদসংকুল পরিবেশ থেকে রক্ষা করার জন্য কল্পিত সর্বশক্তিমানের কাছে নিবেদন করা প্রার্থনাগুলিকে কেন্দ্র করে উৎসারিত শ্লোকগুলিকে নিয়ে সংকলিত মৌখিক মন্ত্রগুলি পরিচিত হল ঋগ্বেদ নামে।
একে একটা দলিল বললেও অত্যুক্তি হবে না। কেননা, এখানে রয়েছে প্রাচীন মানুষের প্রকৃতির সাথে একাত্মতা হবার বাসনা, ধর্মীয় কল্পনা, সামাজিক জীবন ও রাজনৈতিক সংঘাত, ভাষা, কবিতা, দার্শনিক অনুসন্ধান এবং বিশ্বসৃষ্টির অনুসন্ধান। আজকের মানুষ যেমন শান্তির কামনায়, কল্পিত ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানায়, এই পরম্পরাটা তারা ঋগ্বেদের যুগের মানুষের কাছ থেকে পেয়েছিলো। ঋক বা স্তোত্ৰগুলি রচিত হয়েছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কল্পিত দেবতাদের উদ্দেশ্য। মানুষের দ্বারা অসাধ্য সমস্যাকে সবসময় দেবতাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
ঋগ্বেদের বিশেষত্ব হল, একাধারে প্রকৃতি, শক্তি এবং মহাজাগতিক বিধানগুলিকে দেবত্বের সাথে মিলিয়ে দিয়েছিলো। সেই যুগে প্রধান দেবতার স্থান অলংকৃত করে ইন্দ্র। দেবতাদের সাথে মর্তের মানুষের একমাত্র মাধ্যম ছিল অগ্নি। যজ্ঞে যে সব প্রার্থনা দেবতাদের উদেশ্যে করা হতো অগ্নি দায়িত্ব নিয়ে সেগুলি পৌঁছে দিতো, আগুনের ধোঁয়াটা সব সময় উর্দ্ধমুখী আর দেবতাদের বাস সেই উচ্চতায় যেখানে আমাদের দৃষ্টি পৌছায়না।
বীরভোগ্য বসুন্ধরা, আর ইন্দ্র ছিলেন বীর, যোদ্ধা এবং বজ্রধারী, তাই তিনি নমস্য। ক্ষনিকের জন্য দুঃখকে ভুলিয়ে আনন্দের সাগরে নিয়ে যাবার ক্ষেত্রে 'সোম' নামক একটা পানীয়র বিশেষ ভূমিকা ছিল, তাই সেদিনের মানুষ তাকে দেবত্ব প্রদান করেছিল।
আজকে পূজিত হয়না, কিন্তু সে যুগে বরুন যুক্ত ছিল ঋত'র সাথে অর্থাৎ মহাজাগতিক ও নৈতিক শৃঙ্খলার ধারণার সাথে।
উষা পূজিত হতো, আজও হয় ভোরের দেবী হিসাবে।
ঋগ্বেদ শুধুমাত্র থেমে ছিল না দেবতার বন্দনায়, সে অনবরত প্রশ্ন করে গেছে এই দৃশ্যমান বিশ্ব কিভাবে সৃষ্টি হলো ? সৃষ্টির আগে কি ছিল ? কেউ কি সত্যিই সেটা জানে ?- এরকম অসঙ্খ্য প্রশ্ন।
ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে যেটি অনন্য প্রশ্ন সেটি ঋগ্বেদে উচ্চারিত হয়েছে - যিনি আকাশের ওপারে আছেন, তিনিও কি সত্যিই জানেন সৃষ্টির রহস্য ?
ঋগ্বেদের ১০ম মন্ডলের ৯০তম সূক্তকে বলা হয় পুরুষসূক্ত। এখানে মহাবিশ্বকে মহাপুরুষের প্রতীকী দেহের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই সুক্তেই চার বর্ণের উল্লেখ পাওয়া যায়। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র।
এইখানেই বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। এই পুরুষসূক্তের উল্লেখ দেখিয়ে বলা যায় না যে, ঋগ্বেদের প্রথম দিন থেকে ভারতীয় সমাজে কঠোর জাতিভেদ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ছিল।
ঋগ্বেদে তাহলে কি প্রক্ষিপ্ত অংশ আছে ?
এর সত্যতা সম্পর্কে সরাসরি কোন উত্তর গবেষকরা দেন নি। ঋগ্বেদ একটা দীর্ঘকালীন মৌখিক সাহিত্য হিসাবে ছিল। সংরক্ষিত হয়েছিল তার অনেক পরে।
ঋগ্বেদের প্রকৃত মূল্য কিভাবে নির্ধারিত হয়েছিল - এই প্রশ্নটি মনে আসে।
ঋগ্বেদ শুধুমাত্র একটা কবিতার বই ছিল না। একই সাথে কবিতা,ধর্ম, প্রকৃতি চিন্তা, সামাজিক ভাবনা, রাজনীতি ও যুদ্ধের স্মৃতি, ভাষার প্রাচীন নিদর্শন, মানুষের অস্তিত্ব নিয়ে এবং বিশ্বসৃষ্টির রহস্য নিয়ে অনুসন্ধান।
ক্রমশঃ
কলমে - রবীন মজুমদার
৩০/০৮/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।
বি: দ্রঃ "রবীন উজানের" নিজস্ব ওয়েব সাইটের মাধ্যমে খুব শীঘ্রই আসতে চলছে তিনটি পৃথক সংস্করণ। ১) পড়ার বদলে শুনতে পারা ( অডিও) , ২) কাহিনীর উপর ইলাস্ট্রেশন অডিও এবং ৩) প্রত্যেকটি ব্লগের উপর ভিডিও কার্টুন। আপনাদের মতামত জানাবেন .
মন্তব্যসমূহ